

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় পুরো দেশ এখন ঐক্যবদ্ধ! রাজনৈতিক সীমার গণ্ডি পেরিয়ে খালেদা জিয়া এখন সবার আশা-ভরসার স্থল। কিছুদিন ধরে মানুষের আবেগ, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর আহাজারি দেখলেই বোঝা যায় তিনি কতটা জনপ্রিয়। গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সারা দেশের মানুষের কাছে বেগম জিয়া এখন অনন্য এক প্রতীক। তাই তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্য গ্রাম থেকে শহর, মসজিদ থেকে মন্দির বা অন্য কোনো উপাসনালয় সব জায়গায় প্রতিটি মানুষ প্রার্থনা করছে, সারাক্ষণ খোঁজখবর রাখছে, কেউ কেউ দেখা হবে না জেনেও হাসপাতালের সামনে ভিড় করছে তাদের প্রিয় নেত্রীর একটু স্বস্তির খবরের আশায়। খালেদা জিয়ার জন্য সারা দেশের মানুষের এ এক অন্যরকম আবেগ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আর এসব কারণে সরকারও তাকে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির (ভিভিআইপি) মর্যাদা দিয়ে তার যাবতীয় চিকিৎসার খোঁজখবর রাখছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আপসহীন নেতৃত্বের জন্য যে নামটি সর্বজন স্বীকৃত, তিনি হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। দেশনেত্রী বেগম জিয়া শুধু বিএনপির নেতা নন, তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক বিশ্বস্ত প্রতীক। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দুই শিশুসন্তানসহ বন্দিজীবন, এরপর স্বামী হত্যার কঠিন শোক, স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন, তিনবার প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য অসংখ্যবার কারাবাস—সবকিছু মিলিয়ে তার জীবন ঘিরে রয়েছে ঐতিহ্যের ইতিহাস। তার রাজনৈতিক জীবনের নানান বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে, তিনি ক্ষমতার জন্য নয় বরং নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে এ দেশের মানুষের জন্য আপসহীন। আর নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে অবিচল থাকা এবং গণমানুষের অধিকারের জন্য জীবনের শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়াই তাকে সর্বজন স্বীকৃত ‘আপসহীন দেশনেত্রী’তে পরিণত করেছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পড়বে, তখন খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হবে সেসব নেতার কাতারে, যারা ক্ষমতার জন্য নয় বরং নীতির জন্য রাজনীতি করেছেন এবং জনগণের জন্য অবলীলায় উৎসর্গ করেছেন জীবন।
স্বৈরাচার এরশাদ সরকার থেকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার, তিনি কারও কাছেই মাথানত করেননি। বরং সবসময় গণতন্ত্রের পক্ষে জনতার কণ্ঠস্বর হয়েছেন এবং বারবার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন কখনো সামনে আবার কখনো কখনো পেছন থেকেও। তার জীবন শুরু হয়েছিল সাধারণ এক পারিবারিক পরিবেশে। একদিকে তিনি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। অন্যদিকে নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ত্যাগ, সাহস ও আপসহীন অবস্থানের মাধ্যমে তিনি এ দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম না নিলেও ইতিহাসের এক চরম মুহূর্তে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যখন মেজর জিয়া পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তখন খালেদা জিয়া ছিলেন সেনানিবাসে অন্তরীণ। পাকিস্তানি সেনারা তাকে ও তার সন্তানদের বন্দি করে রেখেছিল এবং এ সময়ে তিনি যে মানসিক দুর্ভোগ সহ্য করেছেন, তা অবর্ণনীয়। আর এটি তাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবনে দৃঢ়তা দিয়েছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাতবরণ করলে তার জীবনে নেমে আসে এক মহাবিপর্যয়। শহীদ জিয়ার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি ছাত্র, বৃদ্ধ, যুবক, মহিলা, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি যখন দেশ স্বৈরাচার এরশাদ শাসনের অধীনে তখন খালেদা জিয়া সক্রিয়ভাবে রাজপথে নামেন। একাধিকবার গৃহবন্দি ও কারাবন্দি হওয়া সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন চালিয়ে যান। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার আপসহীন অবস্থান ছিল এমন যে, ক্ষমতার প্রলোভন বা ব্যক্তিগত সুবিধা দিয়ে তাকে দ্বিধান্বিত করা সম্ভব হয়নি।
১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বিজয়ী হয় এবং তিনি গণতান্ত্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এ সময় তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন, মুক্তবাজার অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে না থাকলেও তিনি বিরোধী দলের নেতা হিসেবে সংসদ ও রাজপথে সমানতালে লড়াই চালিয়ে যান।
বিপুল জনসমর্থনে ২০০১ সালে খালেদা জিয়া পুনরায় ক্ষমতায় এসে জঙ্গিবাদ দমন, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পদক্ষেপ নেন। তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রের কারণে তার শাসনামল নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। তবু রাজনীতিতে তার নৈতিক অবস্থান ও আপসহীন চরিত্রের কারণে দলীয় নেতাকর্মী ও আপামরদের কাছে তিনি পরিণত হন এক অনুপ্রেরণার প্রতীকে।
তবে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় আসে ২০০৭ সালের ১/১১-এর ঘটনায়। সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়ার জীবনের আরেকটি কঠিন অধ্যায় শুরু হয়। দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই পুত্রসহ দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা হয় এবং তাকে ও তার সন্তানদের যেতে হয় চরম শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তির ভেতর দিয়ে। এ ছাড়া নিজে বাসায় অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে তিনি হারান। ১৮ বছরের দুঃশাসনেও তিনি ক্ষমতার লোভে বা ব্যক্তিগত মুক্তির বিনিময়ে কোনো রাজনৈতিক আপসে রাজি হননি। গত ১৮ বছরে রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক মামলায় তিনি বারবার গ্রেপ্তার, গৃহবন্দি ও বিদেশগমনের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হন। স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটলেও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতার পথে না গিয়ে তিনি লড়াইয়ের পথ বেছে নেন। এর ফলে তিনি জনগণের কাছে ‘আপসহীন দেশনেত্রী’ হিসেবে স্থায়ী স্বীকৃতি পান।
২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও তার আপসহীন নেতৃত্বের প্রতিফলন। ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা না পেয়ে তিনি নির্বাচন বর্জন করেন; যদিও এটি রাজনৈতিকভাবে বড় ঝুঁকি ছিল। তার কাছে নীতি ও ন্যায়বিচার ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মিথ্যা ও সাজানো মামলায় সাজা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়, যেখানে তার স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি হয়। বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বিদেশ যেতে না পারা এবং উন্নত চিকিৎসা না পাওয়ায় অসহনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন। সরকার বিভিন্ন সময়ে শর্তসাপেক্ষে মুক্তির প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে সম্মত হননি। কারণ, সেই শর্তগুলো তার রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানকে ক্ষুণ্ন ও প্রশ্নবিদ্ধ করত।
আজকের দিনে খালেদা জিয়া শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী নন; তিনি গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের এক অবিচল প্রতীক। তিনি দেখিয়েছেন, আপসহীনতা মানে শুধু বিরোধিতা নয়, বরং নীতির প্রতি অবিচল থেকে জনগণের পাশে দাঁড়ানো। খালেদা জিয়ার এ অবস্থান তাকে সমর্থকদের কাছে যেমন অবিস্মরণীয় মর্যাদা দিয়েছে; তেমনি বিরোধীদের কাছেও একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও অদম্য নেতা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে গভীর সংযোগ। ক্ষমতায় থাকাকালে যেমন, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি জনতার আস্থা হারাননি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে আপসহীন নেতার সংখ্যা হাতেগোনা। মওলানা ভাসানী তার নীতির জন্য, শহীদ জিয়াউর রহমান তার জাতীয়তাবাদের জন্য এবং খালেদা জিয়া তার গণতন্ত্র রক্ষার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার খেলা নয়, রাজনীতি হতে পারে নীতির প্রশ্নে আত্মত্যাগের ক্ষেত্রও। আজ যখন খালেদা জিয়া বার্ধক্য ও অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছেন, তখনো তার রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ়। তার আপসহীনতা তাকে ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে। এই দৃঢ়তা, এই নীরব ত্যাগ তাকে পরিণত করেছে। তিনি তার দল বিএনপি তথা এ দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে একটি সাহস ও অনুপ্রেরণা। আজ তিনি শারীরিক কঠিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়ছেন ঠিকই, কিন্তু তার এ অসুস্থতা শুধু একটি রোগ নয় বরং বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাতে নিজের জীবনের নীরব কোরবানি। তাই এ মহীয়সী নারীকে মহান রাব্বুল আলামিন এ দেশের স্বার্থে আরও কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখুন—এ প্রার্থনাই করছি।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক