

তিনটি ছোট দেশ ফিলিপাইন, বাংলাদেশ ও নিকারাগুয়া। তিন নারী, তিন ঘর, তিনটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। এ যেন এক অদৃশ্য হাতে তিনটি দরজায় মৃত্যুর কড়া নাড়া। ইতিহাস তিন দেশের তিন গৃহবধূকে টেনে এনেছে একই বৃত্তে। তারা হলেন—কোরাজন অ্যাকুইনো কোরি, বেগম খালেদা জিয়া এবং ভায়োলেটা চামোরো। স্বামী হারানো শোক তাদের স্তব্ধ করেছিল, কিন্তু সেই নৈঃশব্দ্য থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল গগনবিদারী স্লোগান। তিনজনই স্বামী হারানোর বেদনা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করেছেন। শান্তি, গণতন্ত্র ও মানুষের মর্যাদাকে রেখেছেন নিজের সংগ্রামের কেন্দ্রে। অরাজনৈতিক জীবনের প্রান্ত থেকে হয়েছেন দেশনেত্রী। তারা প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি কেবল ঠান্ডা কৌশলের খেলা নয়; কখনো কখনো এটি শোকের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়ানো এক হৃদয়ের গল্প। তারা দেখিয়েছেন, অন্ধকার যতই গভীর হোক, কেউ যদি আলো হাতে পথ দেখায়, পুরো দেশ সেই আলোকে অনুসরণ করে।
১৯৮৩ সালের ২১ আগস্ট। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে কোরাজন অ্যাকুইনোর স্বামী বেনিগনো অ্যাকুইনো নিনয় খুন হয়েছেন। তিন বছর আমেরিকায় নির্বাসিত থাকার পর ফিলিপাইনের স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে তিনি এদিন দেশে ফিরেছিলেন। তার বিমানটি ম্যানিলা বন্দরে অবতরণ করার পরই একদল সেনাসদস্য বিমানের মধ্যে প্রবেশ করে। এরপর তারা নিনয়কে বাইরে নিয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড পরেই গুলির শব্দ শোনা যায় এবং টারমাকে নিনয়ের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। হত্যার দশ দিন পর তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়, এতে অংশ নেয় প্রায় ১০ লাখ মানুষ। শেষকৃত্য অনুষ্ঠান রূপান্তরিত হয় ফিলিপাইনের ইতিহাসে বৃহত্তর রাজনৈতিক শোক মিছিলে। নিনয় হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন হত্যার সঙ্গে সরাসরি অংশ নেওয়া সেনাসদস্যরা ছাড়াও সেনাবাহিনীর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করে। কিন্তু মার্কোস নিয়ন্ত্রিত আদালতের বিচারের অভিযুক্ত ২৬ জনই বেকসুর খালাস পায়।
১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাসে কোরাজন কোরি প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেন। নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোরির প্রধান সম্পদ তিনি নিজেই। তার উপস্থিতিতে নির্বাচনী জনসভাগুলো প্রার্থনা সভায় পরিণত হতো। হলুদ পোশাক পরা ছোট্ট মানুষটি যখন জনসমাবেশের সামনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য দাঁড়াতেন, আবেগে তার কণ্ঠস্বর কাঁপত, তার আন্তরিক ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যে মানুষ অভিভূত হয়ে যেত। যেখানে তিনি বক্তব্য দিতেন সেখানেই তার হাজার হাজার ভক্ত হলুদ পোশাকে উপস্থিত হতেন, জনসমাবেশ হলুদ সাগরে পরিণত হতো আর উপস্থিত সবাই কোরি... কোরি... স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত করে তুলত।
নির্বাচনে কারসাজির মাধ্যমে মার্কোস নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করলেও জনরোষের ফলে ২৪ ঘণ্টার বেশি টিকে থাকতে পারেননি। দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ফলে কোরাজন ফিলিপাইনের প্রথম নারী সরকারপ্রধান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। কোরির এ অর্জন সারা বিশ্বের নারীদের জন্য একটি বড় বিজয়। এ বিজয়ের মাধ্যমে সারা বিশ্বের নারী রাজনীতিকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন অনিঃশেষ প্রেরণার উৎস। আর কোরি স্থায়ীভাবে স্থান করে নেন ফিলিপাইনের গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ে, স্বীকৃতি পান ‘জাতির মা’ হিসেবে। ফিলিপাইনের মানুষকে তিনি গণতন্ত্রের পথে যাত্রার সুযোগ করে দেন।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের দ্বিতীয় আর আধুনিক বিশ্বের ১৬তম নারী সরকারপ্রধান তিনি। রাজনীতির প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি ছিলেন চিরায়ত এক গৃহবধূ। স্বামী, সন্তান আর সংসারের মধ্যেই তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। পশুপাখি-প্রিয় মানুষ তিনি। বাড়িতে হাঁস, মুরগি, কবুতর, ছাগল পালতেন। একটি ময়না পাখিসহ নানা ধরনের পাখিও ছিল তার বাড়িতে। এসব নিয়েই নিমগ্ন ছিলেন। নিজেকে রেখেছিলেন রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে। দলীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি তার কোনো মোহ ছিল না। তবে দৃষ্টান্ত ছিল। তার স্বামী জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। আশির দশকের শুরুতে জিয়াউর রহমান নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বিগত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হত্যা, ক্যু, চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির যে ধারা বিদ্যমান ছিল, সেই রক্তাক্ত রাজনীতির পথ ধরেই তিনি রাজনীতিতে এসেছেন। নিয়তি তাকে ঘর থেকে নিয়ে এসেছিল রাজপথে। আর ক্ষমতা খুঁজে নিয়েছিল তাকে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার কিছুদিন পর সরকার এবং দলের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে বিএনপি সরকারের পতন হয় এবং দল ভাঙনের মুখে পড়ে। এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে খালেদা জিয়া নিজেকে পূর্বনির্ধারিত বৃত্তে আবদ্ধ রাখতে পারেননি। নিজ দলের নেতাকর্মীদের অনুরোধ, অপরাপর রাজনৈতিক দলের নেতাদের আহ্বান এবং দেশ ও জাতির প্রয়োজনে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। কর্তব্যবোধের টানে হাল ধরেন স্বামী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিশৃঙ্খল দলকে সংগঠিত করে সামরিক স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হন।
খালেদা জিয়া স্বভাবে ও অবস্থানে বিদ্রোহী নন। তিনি সংবেদনশীল মানুষ, তবে সাহসী। এ সাহসের ওপর ভর করেই তিনি রাজনীতির জটিল পথে এগিয়ে এসেছেন, পেছাননি। খালেদা জিয়া যে শুধু সাহসী তা নয়, পরিশ্রমীও। নিজ রাজনৈতিক দল বিএনপি, সরকার এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নিরন্তর পরিশ্রম করেছেন। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে তিনি দিনভর ছুটে বেড়িয়েছেন পথ থেকে পথে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া অত্যন্ত ধৈর্যশীল, সহিষ্ণু, সংযমী, আপসহীন ও স্পষ্টভাষী। স্বভাবে তিনি শান্ত। তার ব্যক্তিগত চরিত্রের এ দুর্বলতা রাজনৈতিক জীবনে কোনো বাধা হয়নি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতে তিনি কখনো দ্বিধা করেননি। সবরকম বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন অসীম ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে। সবসময়ই ভরসা করতেন সততা ও ন্যায়ের ওপর। কর্তব্যনিষ্ঠা ও দৃঢ়তাই যে পারে সব বৈরিতার গণ্ডিকে অতিক্রম করতে, নেতা হিসেবে তিনি এ উদাহরণ আমাদের সামনে রেখেছেন। বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ তার জীবন। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময়সীমায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেসব ধারা ও প্রবণতা কার্যকর ছিল, অবস্থান ছিল যেসব চড়াই-উতরাইয়ের, উদ্যোগ ও আকাঙ্ক্ষার, এসবের প্রায় সবকিছুই স্পর্শ করেছে তার জীবনকে। বিএনপিকে তিনি চার দশকেরও বেশি সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রায় আট দশক সময়সীমায় উপমহাদেশের রাজনীতিতে যেসব ধারা ও প্রবণতা কার্যকর ছিল, অবস্থান ছিল চড়াই-উতরাইয়ের, উদ্যোগ ও আকাঙ্ক্ষার, এসবের অনেকগুলোই স্পর্শ করেছে তাকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু কখনো দমে যাননি, আত্মসমর্পণ করেননি, রাজনীতির মাঠ ছাড়েননি, কখনোই দলের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বেইমানি করেননি। আশ্রয় নেননি প্রহসনের। পালিয়ে যাননি দেশ থেকে। পলায়নপর মনোভাব তার স্বভাবেই নেই। গণতন্ত্রের প্রতি অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা। দলের সব স্তরের নেতাকর্মীও তাকে সম্বোধন করেন ‘ম্যাডাম’ বলেই।
ভায়োলেটা চামোরো নিকারাগুয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট। তিনি লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত নারী রাষ্ট্রপতি। কোরাজন অ্যাকুইনো এবং খালেদা জিয়ার মতো তিনি রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন তার স্বামীকে হত্যাকাণ্ডের পর। ভায়োলেটা চামোরোর স্বামী পেদ্রো জোয়াকিন চামোরো ছিলেন ‘লা প্রেনসা’ (দ্য প্রেস) পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। বহু বছর ধরে তিনি নিকারাগুয়ার সোমোজা একনায়কতন্ত্রের জন্য মাথাব্যথার কারণ ছিলেন। সোমোজা পরিবারের শাসন ১৯৩৬ সাল থেকে চলছিল। ১৯৫৬ সালে একনায়ক আনাস্তাসিও সোমোজা গার্সিয়া নিহত হওয়ার পর, পেদ্রো জোয়াকিনকে বিদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে অভ্যন্তরীণ নির্বাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কখনোই নিজের ভাগ্য মেনে নেননি। ভায়োলেটাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পালিয়ে যান প্রতিবেশী দেশ কোস্টারিকায়। সেখান থেকে তিনি একটি বিদ্রোহী বাহিনী সংগঠিত করেন, যারা ১৯৫৯ সালে আনাস্তাসিওর ছেলে লুইস সোমোজাকে (তৎকালীন প্রেসিডেন্ট) উৎখাতের চেষ্টা চালায়। সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় আর পেদ্রো জোয়াকিনকে ৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবারও লা প্রেনসা পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে ফিরে আসেন। ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে এসে লুইস সোমোজার জায়গায় তার ভাই আনাস্তাসিও জুনিয়র (যাকে ‘তাচিতো’ নামেও ডাকা হতো) প্রেসিডেন্ট হন, কিন্তু ততদিনে নিকারাগুয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে চলে গিয়েছিল।
১৯৭৫ সালে তাচিতো (আনাস্তাসিও সোমোজা জুনিয়র) নাগরিক অধিকার স্থগিত করেন। পেদ্রো জোয়াকিন শুধু লা প্রেনসা (দ্য প্রেস) পত্রিকার মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে প্রচার চালাননি, বরং তিনি ডেমোক্রেটিক লিবারেশন ইউনিয়ন নামের একটি রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা হিসেবেও সক্রিয় হন। এতে তাচিতো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে তিনি তার বন্দুকধারী ভাড়াটে লোকদের দিয়ে পেদ্রো জোয়াকিনকে অফিসে যাওয়ার পথে গুলি করে হত্যা করান। এ হত্যাকাণ্ডে পুরো নিকারাগুয়া জুড়ে জনরোষ ছড়িয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত দেশব্যাপী গণবিদ্রোহে রূপ নেয়। স্বামী হত্যার পর ভায়োলেটা চামোরো লা প্রেনসা পত্রিকার দায়িত্ব নেন। এর ফলে তিনি হয়ে ওঠেন সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ, যা তার জন্য খুবই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯০ সালের সাধারণে নির্বাচনে সব ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ করে তিনি বিজয়ী হন। নির্বাচনে জয়ের পেছনে তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সৎ ও নির্ভেজাল ভাবমূর্তি। তিনি এমন একটি সময় প্রেসিডেন্ট হন যখন দশ বছরেরও বেশি সময়ের যুদ্ধ ও দীর্ঘ একনায়কতন্ত্রের শাসনে নিকারাগুয়ার অবকাঠামো প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ৪০ শতাংশ মানুষ বেকার, বিদেশি ঋণের বোঝা ছিল ভয়াবহ আর মুদ্রাস্ফীতি পৌঁছেছিল ১৩ হাজার শতাংশে। নিকারাগুয়ার এমন একটি আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ভায়োলেটাই প্রথম শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ ও হস্তান্তর করেছিলেন।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক