

রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নে মাঠপর্যায়ে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক গভীর ও নীরব মানবিক সংকটের বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে। এ উপজেলায় সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই থেকে তিন লাখ নারী কৃষিশ্রমিক প্রতি বছর বোরো ও আমন মৌসুমে ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, চারা তোলা এবং অন্যান্য কৃষিকাজে যুক্ত থাকেন। কৃষি উৎপাদনের একটি বড় অংশই তাদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল হলেও বাস্তবে এ নারীরা ন্যূনতম মানবিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
ধানক্ষেতের আশপাশে নারী কৃষিশ্রমিকদের জন্য কোনো শৌচাগার বা ওয়াশরুমের ব্যবস্থা নেই—এটি প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়। এ বাস্তবতার কারণে অধিকাংশ নারী শ্রমিক সকালে ইচ্ছাকৃতভাবে পানি পান না করেই কাজে যোগ দেন। কারণ, মাঠে কাজের সময় শৌচাগারের প্রয়োজন হলে তা পূরণ করার কোনো নিরাপদ, সম্মানজনক কিংবা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপায় নেই।
দীর্ঘ সময় পানি না খাওয়ার ফলে নারীদের মধ্যে নিয়মিতভাবে ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবজনিত সংক্রমণ, কিডনি সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অনেক নারী জানান, তারা প্রায়ই অসুস্থ বোধ করেন, কিন্তু কাজ না করলে দৈনিক মজুরি হারানোর ভয়ে এসব সমস্যা উপেক্ষা করতে বাধ্য হন। এ পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়; এটি নারীর মৌলিক মানবাধিকার ও মর্যাদার সরাসরি লঙ্ঘন।
পুরুষ কৃষিশ্রমিকদের তুলনায় নারী শ্রমিকদের জন্য এ সমস্যাগুলো আরও জটিল। পুরুষরা তুলনামূলকভাবে সহজেই মাঠের আশপাশে শৌচকার্য সম্পন্ন করতে পারলেও নারীদের জন্য তা সামাজিকভাবে কঠিন ও অপমানজনক। ফলে নারী শ্রমিকরা শারীরিক শ্রমের পাশাপাশি মানসিক চাপ ও লজ্জাবোধের মধ্য দিয়ে কাজ করেন। এ বাস্তবতা গ্রামীণ কৃষিতে বিদ্যমান লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে আরও গভীর করে তোলে এবং নারীর শ্রমকে অদৃশ্য ও অবমূল্যায়িত করে রাখে।
গোদাগাড়ীর নারী কৃষিশ্রমিকদের একটি বড় অংশই মা। অনেকেই ছোট শিশু রেখে অথবা শিশুসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে কাজ করতে বাধ্য হন। কিন্তু মাঠে বা মাঠসংলগ্ন এলাকায় শিশুদের জন্য কোনো ডে-কেয়ার সেন্টার নেই এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য নেই নিরাপদ, ছায়াযুক্ত বা নির্দিষ্ট জায়গা। ফলে অনেক মা সময়মতো সন্তানকে বুকের দুধ দিতে পারেন না। এর ফলে শিশুর পুষ্টি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের খোলা রোদ, ধুলোবালি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রেখে কাজ করতে হয়, যা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। এটি শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লে তাদের শ্রমক্ষমতা কমে যায়, যা সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয়ত, শিশুযত্নের অভাব পুষ্টিহীনতা, অসুস্থতা ও শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তৃতীয়ত, এ অবহেলা গ্রামীণ দারিদ্র্য ও লিঙ্গবৈষম্যের চক্রকে আরও শক্তিশালী করে।
এ সমস্যার সমাধানে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ, এনজিও ও কৃষি প্রকল্পগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। ধান রোপণ ও কাটার মৌসুমে মাঠসংলগ্ন এলাকায় অস্থায়ী বা মোবাইল শৌচাগার স্থাপন করা যেতে পারে। প্রতিটি বড় কৃষিক্ষেত বা শ্রমিক ক্লাস্টারে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, যেমন নলকূপ বা পানির ট্যাংক—নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নারীদের জন্য ছায়াযুক্ত ও পর্দাযুক্ত ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা যেতে পারে। বোরো ও আমন মৌসুমে মৌসুমি কমিউনিটি ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করা হলে শিশু ও মায়েদের জন্য বড় সহায়তা হবে। জাতীয় কৃষিনীতি ও শ্রমনীতিতে নারী কৃষিশ্রমিকদের স্বাস্থ্য, পানি, শৌচাগার ও শিশুযত্ন বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
গোদাগাড়ীর নারী কৃষিশ্রমিকদের এ নীরব সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষিব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না করে টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখনই সময় এ উপেক্ষিত বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে মানবিক, জেন্ডার-সংবেদনশীল ও টেকসই সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন