সুরাইয়া বিনতে হাসান
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

শীতকালীন বায়ুদূষণ

শীতকালীন বায়ুদূষণ

শীত এলেই চারপাশে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। ভোরের কুয়াশা, ঠান্ডা বাতাস, কম আলো সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন ধীরে চলতে থাকে। কিন্তু এ শান্ত পরিবেশের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে এক ভয়ংকর বাস্তবতা শীতকালীন বায়ুদূষণ। এটি চোখে দেখা যায় না, শব্দ করে না, কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

শীতকালে আমাদের শহরগুলোতে বাতাসের মান যে ভয়াবহভাবে খারাপ হয়ে যায়, তা এখন আর অজানা নয়। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে শীত এলেই শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, চোখ জ্বালা করে, গলা শুকিয়ে যায়। অনেকেই এটাকে সাধারণ শীতকালীন সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ এ উপসর্গগুলোর পেছনে থাকে বায়ুদূষণের সরাসরি প্রভাব।

শীতকালে বায়ুদূষণ বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বাতাসের স্বাভাবিক চলাচল কমে যাওয়া। ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে দূষিত কণা বাতাসে আটকে থাকে, ওপরে উঠতে পারে না। ফলে ধোঁয়া, ধূলিকণা ও ক্ষতিকর গ্যাস দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের চারপাশেই ঘুরপাক খায়। দিনের পর দিন সেই বাতাস শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে, অথচ আমরা অনেক সময় তা বুঝতেই পারি না।

শহরাঞ্চলে এ দূষণের প্রধান উৎস হচ্ছে যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবালু, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং আবর্জনা পোড়ানো। শীতকালে এসব দূষণ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কারণ, কুয়াশার সঙ্গে মিশে গিয়ে দূষিত কণাগুলো বাতাসে বেশি সময় ভেসে থাকে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় মানুষ বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর কণা গ্রহণ করে। এই বায়ুদূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষের ওপর। শিশুদের ফুসফুস পুরোপুরি গড়ে ওঠে না, তাই তারা দূষণের ক্ষতির প্রতি বেশি সংবেদনশীল। বয়স্কদের ক্ষেত্রে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় শীতকালীন বায়ুদূষণ তাদের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অ্যাজমা, হাঁপানি, ব্রংকাইটিসের মতো রোগ শীতকালে বেড়ে যাওয়ার পেছনে এ দূষণের বড় ভূমিকা রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বায়ুদূষণের ক্ষতি অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে ধরা পড়ে না। এটি ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে কাজ করে। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস করলে হৃদরোগ, ফুসফুসের জটিলতা এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। কিন্তু যেহেতু এর প্রভাব নীরব, তাই আমরা অনেক সময় বিষয়টিকে গুরুত্ব দিই না।

গ্রামাঞ্চলে বায়ুদূষণ কম বলে আমরা ধরে নিই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শীতকালে গ্রামেও দূষণের মাত্রা কম নয়। খড়কুটো বা আবর্জনা পোড়ানো, ইটভাটার ধোঁয়া এবং রান্নার চুলার ধোঁয়া গ্রামীণ পরিবেশকেও দূষিত করে তোলে। বিশেষ করে ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণ নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

শীতকালীন বায়ুদূষণ কেবল স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও নীতিগত সমস্যা। কারণ, একজন মানুষ একা চাইলেই দূষিত বাতাস থেকে নিজেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারে না। এটি সামগ্রিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। তাই এ সমস্যার সমাধানও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজে নিয়ম মানা, শিল্প-কারখানার নির্গমন পর্যবেক্ষণ এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। শীত এলেই বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ে এটা জানা থাকা সত্ত্বেও যদি আগাম প্রস্তুতি না নেওয়া হয়, তাহলে ক্ষতি অনিবার্য। একই সঙ্গে নাগরিক সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনে আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ করা, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা এ ধরনের ছোট উদ্যোগও সামগ্রিক দূষণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এসব উদ্যোগ তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে কম নয়। বায়ুদূষণ নিয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, যতদিন এই দূষণ ‘নীরব’ থাকবে, ততদিন মানুষ একে এড়িয়ে যাবে। শীতকাল অদৃশ্য বিপদের সময়ও। বায়ুদূষণ এমন একটি সমস্যা, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শরীরে তার প্রভাব গভীরভাবে অনুভূত হয়। তাই শীত এলেই শুধু গরম কাপড় নয়, আমাদের দরকার পরিষ্কার বাতাসের নিশ্চয়তাও।

সুরাইয়া বিনতে হাসান, শিক্ষার্থী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিদেশি বিনিয়োগ আনলে মিলবে নগদ প্রণোদনা

২২ বছর পর আজ ময়মনসিংহে যাচ্ছেন তারেক রহমান

ইন্টারভিউয়ের প্রথম ১০ সেকেন্ডে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন

জামায়াত আমির বরিশাল যাবেন ৬ ফেব্রুয়ারি

পশ্চিমবঙ্গে দুই গুদামে ভয়াবহ আগুন, নিখোঁজ অনেকে

ভৈরবে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, তিন রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ

ঢাকার শীত নিয়ে আবহাওয়া অফিসের বার্তা

‘এমপি সাহেব হিসাব দাও’ কর্মসূচি চালুর ঘোষণা জামায়াত প্রার্থীর

যেসব খাবারে বাড়তে পারে অ্যাজমার সমস্যা

বিএনপির এক উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা 

১০

যুক্তরাষ্ট্রে তুষারঝড়ে ২৯ জনের মৃত্যু, দুর্ভোগে ২০ কোটি মানুষ

১১

রাজধানীতে আজ কোথায় কী

১২

পোস্টার-শোডাউন এড়িয়ে যে অভিনব কৌশলে প্রচারণায় নেমেছেন জারা

১৩

ভোটকেন্দ্র দখলের ষড়যন্ত্র রুখে দেবে জনগণ : নাহিদ ইসলাম

১৪

সকালে খালি পেটে যে ৭ অভ্যাস শরীরের ক্ষতির কারণ

১৫

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব এলাকার মার্কেট বন্ধ

১৬

ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটে চাকরির সুযোগ

১৭

২৭ জানুয়ারি : আজকের নামাজের সময়সূচি

১৮

বাংলাদেশ সরে দাঁড়ানোয় সুযোগ পাওয়া স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ দল ঘোষণা

১৯

সুপার সিক্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যারা

২০
X