সোলায়মান শাওন
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৪০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র কি একা হওয়ার পথে!

যুক্তরাষ্ট্র কি একা হওয়ার পথে!

বিশ্বরাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পথে হাঁটছে, যা তাকে ধীরে ধীরে দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্রদের বিপরীতে দাঁড় করাচ্ছে। কঠোর ভিসানীতি, বাণিজ্য শুল্ক (ট্যারিফ) বৃদ্ধি, একতরফা নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত এবং আগ্রাসী ভূরাজনৈতিক ভাষ্য—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এখন আর শুধু ‘শক্ত নেতৃত্ব’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ক্রমেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য অনিশ্চয়তার উৎসে পরিণত হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর। ট্রাম্প যতই শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করছেন, ততই যেন বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। ট্রাম্প যেন ‘প্রয়োজনে একলা চলো’ নীতি নিয়েছেন; যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মিত্রদের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি করছে।

ভিসা ও অভিবাসন: কূটনীতিতে নতুন দেয়াল

সম্প্রতি ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্রান্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিতের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোরতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রাশিয়া, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল এবং বাংলাদেশের মতো দেশ রয়েছে এ তালিকায়। ভিসানীতি শুধু অভিবাসন ব্যবস্থার অংশ নয়; এটি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আস্থা, শিক্ষা বিনিময়, শ্রমবাজার ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। হঠাৎ নেওয়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কূটনীতিকদের মতে, ভিসাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার বানালে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক হয়।

শুল্ক ও বাণিজ্য যুদ্ধের বিস্তার

কানাডা, ভারত, চীন, রাশিয়াসহ একাধিক দেশের ওপর শুল্ক ও ট্যারিফ বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতিকে আরও সংঘাতমুখী করেছে। মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী—এ বিভাজনকে উপেক্ষা করে আরোপিত শুল্কনীতির ফলে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা প্রকাশ্যেই জানিয়েছে, তারা বিকল্প বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খল জোরদারের দিকে যাচ্ছে। এমনকি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি কানাডার জন্য বিকল্প বাজার ও বিনিয়োগকারীর খোঁজে এক প্রকার বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছেন। এরই মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইলেকট্রিক গাড়ি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমঝোতা চুক্তি করেছেন কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী। এ চুক্তির আওতায় চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি কানাডায় প্রবেশে শুল্ক কমাতে রাজি হয়েছে দেশটি। অন্যদিকে কানাডার বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্য চীনে প্রবেশে শুল্ক কমাবে বেইজিং। ধারণা করা যায়, এ চুক্তির ফলে কানাডায় মার্কিন ইলেকট্রিক গাড়ি যেমন ইলন মাস্কের টেসলার চেয়ে চীনা ব্র্যান্ডগুলো যেমন বিওয়াইডি, শাওমি সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে কানাডিয়ান নাগরিকদের ভিসা-ফ্রি প্রবেশেও বেইজিংকে রাজি করিয়েছেন মার্ক। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যতই নিজেকে সবার ওপরে ‘মোড়ল’ হয়ে থাকতে চায় না কেন, অন্য দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে নতুন সমাধান খুঁজে নিচ্ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিভাজন বাড়বে।

নিরাপত্তা ইস্যুতে মিত্রদের অস্বস্তি

নিরাপত্তা প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোর নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। তবে গ্রিনল্যান্ডসহ আর্কটিক অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশটির পশ্চিমা মিত্রগুলোও এখন ওয়াশিংটনকে সন্দেহের চোখে দেখছে। ডেনমার্ক ইস্যুতে ট্রাম্পের দেওয়া সতর্কবার্তা যে কোনো সময় ‘হুমকি’ এবং সেখান থেকে বাস্তবে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ন্যাটোর বাকি দেশগুলোর মধ্যে এখন স্পষ্ট। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এ অঞ্চলে সম্ভাব্য আগ্রাসনের আশঙ্কায় ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি দেশ আগেভাগেই গ্রিনল্যান্ডে সৈন্য মোতায়েন করেছে। এটি স্পষ্ট করে যে, এখন অনেক মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে আর শুধু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখছে না; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবেও বিবেচনা করছে।

ঐতিহাসিক মিত্রদের দূরত্ব

ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ভারতের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টানাপোড়েন বাড়ছে। ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ বৈঠকগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয়, শুল্কনীতি এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে মতবিরোধ প্রকাশ পাচ্ছে। কানাডা ও ইউরোপীয় দেশগুলো কূটনৈতিকভাবে সতর্ক ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে তারা নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষায় বিকল্প জোট ও অংশীদারত্বে সক্রিয় হচ্ছে। এরই মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন, যা ট্রাম্পের বিপরীত। গত ডিসেম্বরে রাশিয়া ও ভারত নিজেদের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের ২৩ বছর উদযাপন করেছে। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দিল্লি সফর করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং সেখানে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এমন প্রেক্ষাপটেই রাশিয়া থেকে তেল কেনায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ভারতসহ বেশ কিছু দেশের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন। বিলটি পাস হলে এর আওতায় রাশিয়া থেকে তেল ক্রয়কারী দেশের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু ভারতের সঙ্গেও দূরত্ব বাড়তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের।

যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ছে। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত একাধিক আন্তর্জাতিক বৈঠকে ভারত ও চীনের উপস্থিতি বহুপাক্ষিকতার নতুন ইঙ্গিত দিয়েছে। রাশিয়ার মধ্যস্থতায় যদি বেইজিং ও দিল্লি এক কাতারে আসতে পারে, তাহলে পুরো এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। একই সঙ্গে কানাডার সাম্প্রতিক চীন সফর, যা গত আট বছরে কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর—বিশ্বরাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের সামরিক অভিযানকে নিন্দা জানানো হয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও। গ্রিনল্যান্ডকে সমর্থন দেওয়া দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প। এখন ইউরোপে ন্যাটোর দেশগুলো একাট্টা হলে ইউরোপেও কূটনৈতিক শক্তি হারাবে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনকে বুঝতে হবে, বর্তমান বিশ্ব আর একক শক্তিনির্ভর নয়। অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তায় ক্ষমতা বহুকেন্দ্রে বিভক্ত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় একতরফা সিদ্ধান্ত ও আধিপত্যমূলক কৌশল কার্যকর নয়। বরং তা অন্য দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ হতে উৎসাহিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতির বিপরীতে দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্ক জোরদার করছে, যাতে তারা কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল না থাকে।

পরিস্থিতির সার-সংক্ষেপ স্পষ্ট যে, নিজেকে বৈশ্বিক রাজনীতির ‘সুপ্রিম’ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্রদের হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে। একতরফা ভিসা, শুল্ক ও নিরাপত্তা নীতির ফলে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করছে। দেশগুলো বুঝতে শুরু করেছে, ‘শুধু যুক্তরাষ্ট্র’ নির্ভরতা তাদের বিপদে ফেলতে পারে। কিন্তু বিশ্বরাজনীতিতে নেতৃত্ব আসে সহযোগিতা ও আস্থার মাধ্যমে, চাপ ও একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—নেতৃত্ব ধরে রাখা নয়, বরং ক্রমবর্ধমান একাকিত্ব সামাল দেওয়া।

লেখক: সাংবাদিক ও ব্লগার

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আপনি কি জাজমেন্টাল? জেনে নিন

বাংলাদেশিসহ ৫ লাখ অভিবাসীকে বৈধতা দিল স্পেন

বিএনপিতে যোগ দিলেন পাঁচ শতাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বী

নির্বাচনে কতদিনের ছুটি পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা 

আ.লীগের আমরা আগে বন্ধু ছিলাম, এখনো আছি : জাপা প্রার্থী 

বিদেশি বিনিয়োগ আনলে মিলবে নগদ প্রণোদনা

২২ বছর পর আজ ময়মনসিংহে যাচ্ছেন তারেক রহমান

ইন্টারভিউয়ের প্রথম ১০ সেকেন্ডে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন

জামায়াত আমির বরিশাল যাবেন ৬ ফেব্রুয়ারি

পশ্চিমবঙ্গে দুই গুদামে ভয়াবহ আগুন, নিখোঁজ অনেকে

১০

ভৈরবে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, তিন রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ

১১

ঢাকার শীত নিয়ে আবহাওয়া অফিসের বার্তা

১২

‘এমপি সাহেব হিসাব দাও’ কর্মসূচি চালুর ঘোষণা জামায়াত প্রার্থীর

১৩

যেসব খাবারে বাড়তে পারে অ্যাজমার সমস্যা

১৪

বিএনপির এক উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা 

১৫

যুক্তরাষ্ট্রে তুষারঝড়ে ২৯ জনের মৃত্যু, দুর্ভোগে ২০ কোটি মানুষ

১৬

রাজধানীতে আজ কোথায় কী

১৭

পোস্টার-শোডাউন এড়িয়ে যে অভিনব কৌশলে প্রচারণায় নেমেছেন জারা

১৮

ভোটকেন্দ্র দখলের ষড়যন্ত্র রুখে দেবে জনগণ : নাহিদ ইসলাম

১৯

সকালে খালি পেটে যে ৭ অভ্যাস শরীরের ক্ষতির কারণ

২০
X