

তীব্র শীত ও ঘনকুয়াশা বাংলাদেশের রবি মৌসুমে কৃষি খাতে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শীত ও কুয়াশায় বিরূপ প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। কুয়াশা ও শীতের তীব্রতা কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। কৃষি খাতে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রবি মৌসুমে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বোরো বীজতলা, আলু, সরিষা, ডাল এবং শাকসবজির মতো রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। কুয়াশা সূর্যের আলো বাধা দেয়, চারাগাছকে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত করে এবং রোগবালাই এর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, যার ফলে ফলন ব্যাহত হয় ও কৃষকের দুশ্চিন্তা বাড়ে।
শীতে বোরো বীজতলা, আলু, সরিষা, ডাল, শাকসবজির মতো রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি করে। শীতে কোল্ড ইনজুরি ও ছত্রাকজনিত রোগ বাড়ে, চারার বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ফলন কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের ফের বীজতলা তৈরি করতে হয়। এতে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষক।
অতিরিক্ত ঠান্ডায় বোরো ধানের চারা হলুদ হয়ে যায় এবং বৃদ্ধি থমকে দাঁড়ায়, একে বলা হয় কোল্ড ইনজুরি। দীর্ঘ সময় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা ও সূর্যালোকের অভাবে চারার রং ফ্যাকাশে বা লালচে হয়ে যায়, বৃদ্ধি থেমে যায় এবং চারা মারা যায়। চারার ব্যাপক ক্ষতি হলে কৃষককে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হয়, যা সময় ও অর্থ নষ্ট করে। কুয়াশার কারণে চারা পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আলু ধসা আলুর জন্য ক্ষতিকর একটি রোগ। মেঘলা আকাশ ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া আলুর ধসা রোগের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এটি ছড়িয়ে পড়ে পুরো মাঠের ফসল নষ্ট করে দিতে পারে। হোয়াইট মোল্ড বা ছত্রাকজনিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সরিষার পরাগায়ন ব্যাহত হয়। এ ছাড়া ছত্রাকের আক্রমণে সরিষার ফুল ঝরে পড়ে এবং দানা পুষ্ট হয় না। আবার গমের ব্লাস্ট রোগ ও টমেটোসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজিতে ছত্রাকজনিত পচন দেখা দেয়। শিম, লাউ, টমেটো, বেগুনসহ অন্যান্য শীতকালীন সবজির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও ফলন কমে। ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদনও ক্ষতির মুখে পড়ে। আম ও লিচুর মুকুলের ক্ষতি হয়। আগাম জাতের আমের মুকুল তীব্র শীতে ঝরে যায়। আগাম আসা আমের মুকুল কুয়াশার কারণে কালো হয়ে ঝরে পড়ে, যা ফলন কমিয়ে দেয়। ছত্রাকজনিত রোগের বিস্তার ঘটে। উচ্চ আর্দ্রতা ও ঠান্ডায় বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগ বাড়ে। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় জাব পোকা ও অন্যান্য ক্ষতিকারক পোকার বিস্তার বেড়ে যায়, যা কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাটির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। মাটির ভেতরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াও শীতের কারণে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। মাটির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়াও এর নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে পড়ে। ঘন কুয়াশার কারণে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।
তীব্র শীতে জবুথবু হয় প্রাণ-প্রকৃতি। মানুষের পাশাপাশি গবাদি পশু আক্রান্ত হচ্ছে শীতজনিত নানা রোগে। তীব্র শীতে ক্ষুধামান্দ্য, বদহজম, নিউমোনিয়া, খুরা রোগসহ বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয় গবাদি পশু। ভোগান্তিতে পড়েন খামারিসহ প্রান্তিক কৃষক।
কৃষি ক্ষেত্রে প্রকৃতির ভূমিকাই প্রধান। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষির কোনো বিকল্প নেই। দেশের জনগণের একটা বিশাল অংশ তাদের জীবনধারণের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে। শীতের তীব্রতায় বাড়ে কৃষকের ক্ষতি আর দুশ্চিন্তা। তবুও শত প্রতিকূলতার মধ্যে দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিতে মূল দায়িত্ব পালন করেন কৃষকরা। কৃষিবিদরা যথাসম্ভব তাদের সহায়তা করেন। আর এ কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশ ঘোষ বিধান
পাইকগাছা, খুলনা
মন্তব্য করুন