

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু চলতি মাসেই একাধিক জেলায় রোগটিতে ২১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। খোদ দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে এটি মহামারি আকার নিতে পারে। বলাই বাহুল্য, এ অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগ ও হতাশাব্যঞ্জক।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, সারা দেশেই কমবেশি হাম আছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে বেশি রোগী দেখা যাচ্ছে। জানা যায়, গতকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে তিন ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বর্তমানে শয্যার চেয়ে হামের রোগীর সংখ্যা বেশি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে করিডোর ও হাসপাতালের বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শনিবার সকাল পর্যন্ত হাসপাতালটিতে রোগী ভর্তি ছিল দেড়শর বেশি। তাদের মধ্যে প্রায় ১৩০ জনই হাম আক্রান্ত, যার বড় অংশই শিশু। চিকিৎসাকর্মীরা বলছেন, ঈদের পর থেকে রোগীর চাপ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীর বড় অংশই হামে আক্রান্ত। ফলে তাদের মূল চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাব কেন? এ ক্ষেত্রে যা জানা যাচ্ছে, তা সত্যিকারই অপ্রত্যাশিত ও হতাশার। দেশে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ফলে অতীতে এ সময়টাতে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হলেও গত বছর সেটি হয়নি। ফলে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। অর্থাৎ সময়মতো টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া একটি বড় কারণ। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মধ্যে এখন প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। আগে তারা মায়ের কাছ থেকে কিছু সুরক্ষা পেত, কিন্তু এখন সেই সুরক্ষাও কমে এসেছে। পাশাপাশি টিকার কার্যকারিতা সময়ের সঙ্গে কমে যাওয়ায় সংক্রমণ ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি। কেননা এ বয়সে শিশুদের টিকা নেওয়ার কথা নয়। অথচ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে।
আমরা মনে করি, উদ্ভূত এ পরিস্থিতি কী করে সামাল দেওয়া যেতে পারে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ বা দায়িত্ব। তবে বিগত সরকারের সংশ্লিষ্টরা যথাযথ সময়ে এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় কীভাবে এড়িয়ে যেতে পারল, সেটা বিস্ময়কর এবং নির্দ্বিধায় দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। সংশ্লিষ্টদের এ খামখেয়ালির জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। এখন যে হারে রোগটি ছড়াচ্ছে, তা মোকাবিলা কঠিন হলেও কাজটি সুচারুরূপে করা জরুরি। জনসংখ্যার ঘনত্ব একটি বড় বাধা। ফলে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা কঠিন। কঠিন হলেও এ মুহূর্তে উপজেলা থেকে মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত সব পর্যায়ে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালু জরুরি। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের তরফ থেকে এ নির্দেশসহ বেশকিছু কর্মতৎপরতা হাতে নেওয়া হয়েছে, যা প্রশংসাযোগ্য। তবে মনে রাখতে হবে, এটা যেন শুধু নির্দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে। আমাদের প্রত্যাশা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার সংশ্লিষ্ট দ্রুত সব ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।