এস আই শরীফ
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ১১:৩০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সাদামাটা কথা

দ্রুত বিচার হতে হবে, তবে...

দ্রুত বিচার হতে হবে, তবে...

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। এমন নৃশংসতা সবাইকে আহত করে। স্বাভাবিকভাবেই সর্বত্র দাবি উচ্চারিত হতে শুরু করে, অপরাধীর দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেই দাবি পূরণে রাষ্ট্রও দৃশ্যত সক্রিয় হয়। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে আলোচিত এই মামলার রায় হয়েছে। রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দেশের বিচারিক ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা। অনেকেই একে বিচার বিভাগের সক্ষমতা ও রাষ্ট্রের সদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবেও দেখছেন। কিন্তু এই দ্রুততার মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন; এটি কি দ্রুত বিচার, নাকি তাড়াহুড়োর বিচার?

বিচার দ্রুত হওয়া অবশ্যই কাম্য। ধর্ষণ, শিশুহত্যা কিংবা আলোচিত অপরাধের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। কিন্তু বিচার দ্রুত করার নামে যদি তদন্ত অসম্পূর্ণ থাকে, চার্জশিটে দুর্বলতা থেকে যায়, যদি সম্ভাব্য অভিযুক্তদের ভূমিকা পরিষ্কারভাবে উঠে না আসে, তাহলে সেই বিচার কতটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। রামিসা হত্যা মামলায় এমন কিছু প্রশ্ন এরই মধ্যে সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, তদন্তে বেশ কিছু ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। চার্জশিটও যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি। ঘটনার সময়ে স্বপ্না আক্তারের ভূমিকা স্পষ্ট করা হয়নি। আবার ঘটনার সঙ্গে তৃতীয় ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে যেসব আলোচনা ও তথ্য সামনে এসেছিল, সেগুলোরও যথাযথ প্রতিফলন চার্জশিটে নেই। ফলে অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন উঠছে, জনমতের চাপে বিচার দ্রুত শেষ করতে গিয়ে তদন্তের গভীরতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না; যার ফলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত হয়েছে।

বিচার দ্রুত হতে পারে; কিন্তু তাড়াহুড়ো করে হওয়া উচিত নয়। একটি হত্যা মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সত্য উদ্ঘাটন এবং অপরাধীর যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা। কারণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সামান্য ভুলও পরবর্তী ধাপে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। উচ্চ আদালতে গিয়ে সেই দুর্বলতা মামলার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। আসামির সাজা কমতে বা খালাস পেতে পারে। সে জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী তদন্ত, নির্ভুল চার্জশিট এবং আইনি প্রক্রিয়ার যথাযথ অনুসরণ।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বহুল আলোচিত ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় মামলার কথা আলোচনায় আনা যায়। ১৯৯০ সালে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে ধনঞ্জয়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৪ সালে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কিন্তু ফাঁসির পরও মামলাটি নিয়ে বিতর্ক থামেনি। মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী এবং গবেষকরা মামলাটির তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় কিছু অসংগতি ও সীমাবদ্ধতা ছিল; যেগুলো আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। পরবর্তী সময় বিতর্ক ও সংশয়কে উপজীব্য করে নির্মিত হয় আলোচিত বাংলা চলচ্চিত্র ‘ধনঞ্জয়’। এতে দেখানো হয়, কীভাবে একটি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় জনরোষ, রাজনৈতিক চাপ এবং গণমাধ্যমের প্রচারণা মিলিতভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগেই সমাজের চোখে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। চলচ্চিত্রটির মূল বার্তা ছিল এমন— যত বড় অপরাধই হোক, যত প্রবল জনচাপই থাকুক, বিচার যেন শুধু আবেগের ভিত্তিতে নয়; বরং নির্ভুল তদন্ত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হয়। কারণ ভুল বিচার শুধু একজন মানুষের নয়, পুরো বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পারে।

বাংলাদেশে দ্রুত বিচারের বেশ কয়েকটি নজির রয়েছে। খুলনার আলোচিত শিশু রাকিব হত্যার বিচার শেষ হয়েছিল মাত্র ১০ কার্যদিবসে। আলোচিত শিশু রাজন হত্যা মামলার বিচার হয়েছিল ১৭ কার্যদিবসে। মাগুরার আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার শেষ হয় মাত্র ১৩ কার্যদিবসে। ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার বিচারও শেষ হয় সাত মাসে। এসব মামলার রায় ঘোষণার সময় জনমনে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল, বিচার বিভাগ দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম। মানুষের মধ্যেও বিশ্বাস জন্মেছিল যে, ভয়াবহ অপরাধ করে কেউ শেষ পর্যন্ত রেহাই পাবে না।

কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথাও বলছে। শিশু রাজন ও রাকিব হত্যার বিচার হওয়ার প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। অথচ এখনো মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। প্রায় নয় বছর ধরে সেগুলো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঝুলে আছে। অধস্তন আদালতের দ্রুত বিচার শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিচারে রূপ নিতে পারেনি। একই অবস্থা নুসরাত হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও। সাত বছর পরও মামলাটি হাইকোর্টেই আটকে আছে। মাগুরার আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাও এখনো উচ্চ আদালতের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। অধস্তন আদালতে দ্রুত রায় ঘোষণার মাধ্যমে যে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রতায় তার অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

হত্যাকাণ্ড বা আলোচিত ঘটনার পরপরই জনমনে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল—সব জায়গায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সরকারও তখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্ষোভ কমতে থাকে। নতুন ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে আড়াল করে। একসময় ভয়াবহ সেই ঘটনার স্মৃতিও ফিকে হয়ে যায়। তখন মামলার গতি কমতে শুরু করে। রাজন ও রাকিব হত্যাকাণ্ডের কথা একসময় দেশের প্রতিটি মানুষ জানত। নুসরাতের জন্য লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। মাগুরার আছিয়া হত্যার ঘটনাও মানুষের মধ্যে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু আজ কতজন মানুষ এসব মামলার অগ্রগতির খোঁজ রাখেন? খুব কম। অথচ নিহতদের পরিবারের জন্য সময় থেমে থাকে না। তারা বছরের পর বছর ধরে চূড়ান্ত বিচারের জন্য অপেক্ষায় বসে আছেন। রামিসা হত্যার ক্ষেত্রেও তাই প্রশ্ন উঠছে—পাঁচ কার্যদিবসে বিচার শেষ হওয়াই কি শেষ কথা? নাকি এখন আসল চ্যালেঞ্জ শুরু? হাইকোর্টে এই মামলার শুনানি কবে শেষ হবে? আপিল বিভাগে পৌঁছাতে কত বছর লাগবে? সর্বোচ্চ আদালতের রায় কবে হবে? মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে তা কার্যকর হতে কত সময় লাগবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজ কারও জানা নেই।

বিচার বিভাগের ওপর মামলার চাপ, বিচারকের স্বল্পতা এবং দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে আলোচনা বহুদিনের। কিন্তু আলোচিত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি সত্যিই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে শুধু বিচারিক আদালতে নয়, উচ্চ আদালতের প্রতিটি ধাপেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে দ্রুত রায় কেবল প্রতীকী সাফল্যে পরিণত হবে। আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা প্রয়োজন। ন্যায়বিচারের দুটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। একদিকে বিচার বিলম্বিত হওয়া চলবে না, অন্যদিকে বিচার তাড়াহুড়ো করেও করা যাবে না। বিচার ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ হলো, ‘Justice delayed is justice denied।’ কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি সত্যও রয়েছে, ‘Justice hurried is justice buried।’ অর্থাৎ বিলম্বিত বিচার যেমন ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করে, তেমনি অতি তাড়াহুড়োর বিচারও ন্যায়বিচারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

রামিসার ঘটনায় দেশবাসীর প্রত্যাশা একটাই—অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হোক। কিন্তু সেই শাস্তি কার্যকর একটি শক্তিশালী, নির্ভুল ও প্রশ্নাতীত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসুক; যাতে ভবিষ্যতে কোনো দুর্বলতা সামনে না আসে এবং কোনো আদালতেই মামলাটি হোঁচট না খায়। কারণ বিচার কেবল দ্রুত হওয়াই যথেষ্ট নয়। বিচার হতে হবে নির্ভুল, বিশ্বাসযোগ্য এবং সর্বোপরি চূড়ান্ত। আর সেই চূড়ান্ত বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রামিসার মতো নিষ্পাপ শিশুদের জন্য সমাজের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি অপূর্ণই থেকে যাবে।

একটা কৌতুক দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। রাশিয়ার একটা ইঁদুর দৌড়ে পালাচ্ছে। পালাতে পালাতে সে পোল্যান্ডে চলে গেল। পোল্যান্ডের ইঁদুর জিজ্ঞেস করল, তুমি দৌড়াচ্ছ কেন? আর বোলো না। আমাদের দেশে সব উট ধরে নিয়ে জেলে পুরছে। তা তোমার ভয় কী? তুমি তো আর উট নও। আরে আমি কেমন করে প্রমাণ করব যে, আমি উট নই।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক কালবেলা

ইমেইল: [email protected]

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে ইসরায়েল : ট্রাম্প

যশোরে আ.লীগ-যুবলীগের তিন নেতা গ্রেফতার

গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগ নেতার পদত্যাগ

নিখোঁজের ৪ দিন পর প্রবাসীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার

ক্যানসার শনাক্তে দেশে প্রথম রোবটিক প্রোস্টেট বায়োপসি হলো স্কয়ারে

আমার কথা বলে তাহেরী হুজুর আলোচনায় থাকতে চান : সামান্তা

অভিষেক ম্যাচেই ৪৭ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন ভারতীয় ক্রিকেটার 

হার্ট ভালো রাখতে প্রতিদিন খাবেন যে পাঁচ খাবার

৩৪ তলার ফ্ল্যাট কেনার পর জানতে পারলেন ভবনটিই ৩২ তলা

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

১০

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

১১

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

১২

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

১৩

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

১৪

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

১৫

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

১৬

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

১৭

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

১৮

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১৯

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

২০
X