

জ্বালানি তেলের রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার চার দিন পরও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। ঈদের ছুটিতেও রাজধানীর প্রায় সব পাম্পেই তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। পাম্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হলেও তেলের সরবরাহ খুব একটা বাড়েনি।
এদিকে, গণপরিবহনে জ্বালানির কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু পাম্পে সরবরাহ আগের তুলনায় বাড়লেও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাভাবিক হয়নি। কোথাও একেবারেই তেল নেই, আবার কোথাও সীমিত সরবরাহের কারণে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও বাসের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ঈদের ছুটিতে যানবাহনের চাপ কিছুটা কমলেও যেসব পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ভিড় কমেনি।
তেল সংকটের কারণে রাজধানীর শেওড়াপাড়ার দুটি পাম্প এবং তালতলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি পাম্প বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে শেরাটন হোটেলের বিপরীত পাশের পাম্প খোলা থাকলেও সেখানে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
পরীবাগের মেঘনা মডেল পেট্রোল পাম্পের কর্মচারী ইকবাল বলেন, আমাদের দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার লিটার। কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছি ১০ হাজার লিটার। ফলে দৈনিক দুই হাজার লিটার ঘাটতি থাকছে। তিনি জানান, রেশনিং উঠে গেলেও সরবরাহ কিছুটা কম দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, রেশনিং প্রত্যাহার করার পরও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। কম সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সাশ্রয়ী ব্যবহারের কথা বলা হলেও প্রয়োজনীয় তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষ ও পাম্প মালিক—উভয়ই ভোগান্তিতে পড়েছেন।
পাম্পে তেল না পেলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য বলছে, তেলের সরবরাহ বেড়েছে। রেশনিং তুলে নেওয়ার পর প্রথম দিন রোববার জ্বালানি তেলের বিক্রিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। পাশাপাশি স্বাভাবিক সময়ের গড় বিক্রির তুলনায় ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদা বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে বড় বড় কোম্পানির নিজস্ব পাম্প থাকলেও অপেক্ষাকৃত ছোট কোম্পানির বাসগুলোকে বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল নিতে হয়।
ঢাকা-চট্টগ্রামে চলাচলকারী বিলাস পরিবহনের ম্যানেজার বলেন, এখন যাত্রীর চাপ বেশি। তেল না থাকায় বাস রাস্তায় নামাতে পারছি না। আমরা যাত্রাবাড়ীর যে পাম্প থেকে তেল নিই, সেখানে তেলের সংকট।
যাত্রাবাড়ী এলাকার মদিনা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন যানবাহনের চালকরা। ট্রাকচালক আবদুল মালেক বলেন, দূরপাল্লার গাড়ি চালাই। সময়মতো তেল না পেলে সমস্যায় পড়তে হয়। কিন্তু এখন প্রায় সব পাম্পেই লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
এই পাম্পের কর্মচারীরা জানালেন, সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া এবং হঠাৎ ক্রেতার চাপ বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। কয়েক দিনের সংকটের কারণে মানুষ একসঙ্গে তেল নিতে আসছে। ফলে লাইন লম্বা হচ্ছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক গড়ে ডিজেল বিক্রি হয় ১২ হাজার ২৯ টন। রেশনিং চলাকালে বিপিসি দৈনিক ডিজেল সরবরাহ করত ৯ হাজার টন। রেশনিং তুলে নেওয়ার পর প্রথম দিন রোববার বিক্রি হয়েছে ১৬ হাজার ১৬৪ টন; অর্থাৎ গড় বিক্রির তুলনায় প্রায় ৪ হাজার ১৩৫ টন বেশি ডিজেল বিক্রি হয়েছে। একইভাবে অকটেন বিক্রিও বেড়েছে। সাধারণ সময়ে যেখানে দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ২১৭ টন, সেখানে রোববার বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬৯৮ টন। পেট্রোলের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সাধারণ সময়ে এর দৈনিক গড় বিক্রি ১ হাজার ৪২৭ টন, কিন্তু রোববার বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৭১২ টন।
জ্বালানি সংকট নেই, জানালেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী: গণপরিবহনে জ্বালানির কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গতকাল রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
শেখ রবিউল জানান, ১৫ মার্চ রাত ১১টা থেকে গণপরিবহনে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। যমুনা সেতুতে নিয়মিতভাবে যে সংখ্যক গাড়ি চলাচল করে, তার চেয়ে ৩২ হাজার গাড়ি গতকাল বেশি গেছে। তিনি বলেন, তারা তো সব ফুয়েল পেয়েছে। এই যে রাস্তায় দেখছেন লাখ লাখ গাড়ি চলাচল করছে, সবাই তো ফুয়েল পাচ্ছে। আমি এখনো পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ে কোনো অভিযোগ পাচ্ছি না।
মন্ত্রী বলেন, আর যদি কেউ জ্বালানি না পেয়ে থাকেন, অভিযোগ করতে পারেন। ১৬০৭ আমাদের হটলাইন নম্বর আছে, পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করবেন, আমাকেও ফোন করতে পারেন, তারা জ্বালানি পেয়ে যাবেন তাৎক্ষণিকভাবে। গণপরিবহনে জ্বালানির কোনো ঘাটতি, স্বল্পতা নেই।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, সবাই কিন্তু নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছেন। দু-একটি পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে আরও ২০ থেকে ৩০ টাকা কম নিচ্ছে। এখানে পুলিশ ও র্যাবের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, পর্যবেক্ষক দল আছে, সব জায়গায় ভাড়ার তালিকা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ বেশি ভাড়া চাইলে অভিযোগ পাওয়ামাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ-র্যাবের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও পর্যবেক্ষক দল জানিয়েছে খুব একটা অভিযোগ তারা পাননি।
রবিউল আলম বলেন, খুব একটা ব্যত্যয় এখানে ঘটেনি। নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এবং বাসগুলো যথা সময়ে ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীরা কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছে না।
যত্রতত্র বাস কাউন্টার উচ্ছেদে মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, জানতে চাইলে রবিউল বলেন, মালিকদের অনুরোধ করব যত্রতত্র, অলিতে-গলিতে, কোনো আবাসিক এলাকায় অথবা বাণিজ্যিক এলাকার মধ্যে না রেখে, তারা যেন কাউন্টারগুলো সরিয়ে নেন। আমরা তাদের একটা সময় বেঁধে দেব ঈদের পর এবং এটা পরবর্তী সময়ে আমরা খুব শক্তভাবে পর্যবেক্ষণ করব।
লোকাল বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় এ চাপের কারণে অনেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। যেমন গতকাল (মঙ্গলবার) নবীনগর এবং বাইপাইলে দুটি পরিবহন ১০০ টাকা বেশি নেওয়ার চেষ্টা করেছে। যাত্রী অভিযোগ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মোবাইল টিম গিয়ে তাদের ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এটাই যথেষ্ট নয়, ঈদের পরে আমরা আরও বেশি অ্যাকশনে যাব—কেন তারা এই ব্যত্যয় ঘটাতে চাইল।
তিনি বলেন, অভিযোগ যেগুলো পেয়েছি এখন অ্যাকশন নিচ্ছি। যেগুলো এখন অ্যাকশন নিতে পারছি না, ঈদের পরে অ্যাকশন হবে।