সুশোভন অর্ক
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ০২:৫৫ এএম
আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৩, ১১:১৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

মেধাবী শিক্ষার্থীরা কেন আত্মহত্যার মিছিলে

কাউন্সেলিং ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
মেধাবী শিক্ষার্থীরা কেন আত্মহত্যার মিছিলে

ছয় দিনের ব্যবধানে ঘটে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের তিন মেধাবী শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যু। দুর্ঘটনা বা হত্যাকাণ্ড নয়, তারা নিজেরাই নিজেকে শেষ করেছেন, বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ। কেন এই মেধাবীরা আত্মহত্যা করছেন, তা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা নিয়েও উঠেছে বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানা কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। কারণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে না পারলে মেধাবীরা নিভৃতে শেষ হতেই থাকবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, শিক্ষকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যের সেবা বৃদ্ধি করা এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যা করা তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী জয়া কুণ্ডু। ভর্তি পরীক্ষায় একই সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং ঢাকা

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে মানবসেবার ব্রত নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন চিকিৎসাবিদ্যায়। গত ১৬ আগস্ট ডা. আলিম চৌধুরী হোস্টেলের নিজ কক্ষে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবার ও সহপাঠীরা জানান, হতাশা থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।

গত ১৯ আগস্ট কীটনাশক পান করে মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ঋতু কর্মকার। ওই শিক্ষার্থীর মামা উৎপল কর্মকার জানান, দুই ভাইবোনের মধ্যে ঋতু ছিল বড়। সম্প্রতি মাস্টার্স শেষ হলেও এখনো কোনো চাকরিতে যোগ দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, হতাশা থেকে এ কাজ করেছে সে।

গত ২১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয় বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের। তার সহপাঠী ও রুমমেটরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে সে চুপচাপ থাকত। অর্থ সংকটে ছিল, দুবার সেমিস্টার পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। হয়তো হতাশা থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় সে।

তিনটি ঘটনাতেই সহপাঠী ও স্বজনের সঙ্গে কথা বলে এ আত্মহননের পেছনে হতাশার বিষয়টি সামনে এসেছে; কিন্তু শিক্ষার্থীরা কেন হতাশ হচ্ছেন—তা নিয়ে কেউ ভাবেন না। হতাশা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কাউন্সেলিংয়ের বিষয় থাকলেও সেই প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায় অকেজো।

সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, শুধু ২০২২ সালেই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৫৩২ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অন্তত ৮৬ শিক্ষার্থী রয়েছেন। এ ছাড়া ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ১০১ জন, ২০২০ সালে ৪২, ২০১৯ সালে ৫৬ শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই হিসাবে বছরে ৭১ জনের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ইনার ফোর্সের প্রধান নির্বাহী মনোবিজ্ঞানী ফরিদা আকতার বলেন, অনেকেই ভেবে থাকেন, ভালো রেজাল্ট প্রাতিষ্ঠানিক মেধা যাচাইয়ের একমাত্র মানদণ্ড; কিন্তু আসলে তা নয়। এই বিষয়টি নির্ভর করে যৌক্তিক চিন্তা, যে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার যোগ্যতা এবং যে কোনো বিষয় বিশ্লেষণের চেষ্টার ওপর; কিন্তু যেসব শিক্ষার্থীকে এসব যোগ্যতা অর্জন করানো যাবে না, তারা প্রতিকূল পরিবেশে ভেঙে পড়বেই।

এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, আবেগের নেতিবাচক ব্যবহার এবং হতাশার চূড়ান্ত গন্তব্য হলো আত্মহনন। কারণ, তাদের আবেগ সঠিকভাবে বিকশিত হয়নি। এক্ষেত্রে সমাজ এবং পরিবারের দায় সবচেয়ে বেশি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকদের সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসক বা কাউন্সিলরের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

আত্মহত্যার কারণ ও তার প্রতিকারবিষয়ক গবেষক ও ইস্টওয়েস্ট ইউনিভিার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান খান কালবেলাকে বলেন, আত্মহত্যা যে শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে হচ্ছে তা নয়, সব ধরনের মানুষের মধ্যেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। তবে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার বিষয়টি আমাদের মধ্যে খুব আলোড়ন সৃষ্টি করে, কারণ তারা হচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিকীকরণ বলতে যে জিনিসটা রয়েছে, সবার সঙ্গে মেশা, কথা বলা—সেই জিনিসটা প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তারা ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। তাদের মানসিক ব্যাপারগুলো কারও সঙ্গে বলতে পারছে না। জীবনটা তারা শুধুই তাদের কেন্দ্রিক করে ফেলছে। এসব কারণ অভিভাবক, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাবতে হবে।

আত্মহত্যার সঙ্গে বেকারত্বের একটি পুরোনো যোগসূত্র রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জিনিসটা থেকে শিক্ষিত যুব সমাজকে বের করে আনার জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে আরও অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া দরকার।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করা বেসরকারি সংস্থা সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাক্টিভিটিসের (শোভা) নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা বিভাগ খোলার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলেছি। কারণ, শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে দুর্বল হলে নিজেকে একা ভাবতে শুরু করে। তখন নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়। তিনি বলেন, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে; কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে এখনো সচেতন নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক কম।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

টানা ৩০ মিনিটের বেশি বসে থাকলেই বাড়তে পারে ক্যানসারে মৃত্যুঝুঁকি

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের ৮ দিন পর একজনকে জীবিত উদ্ধার

শেষ ষোলোয় রোনালদোদের প্রতিপক্ষ কারা, ফিরছে নেশনস লিগের সেই ফাইনাল

নতুন দায়িত্বে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, ডাক-টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও আইনমন্ত্রী

৩ জুলাই / আজকের নামাজের সময়সূচি

আলিম পরীক্ষা  / নিয়মিতদের হাতে অনিয়মিত প্রশ্ন, কেন্দ্র সচিবসহ ৫ জনকে অব্যাহতি

ইরানের সঙ্গে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান সাবেক মার্কিন আলোচকের

বিশ্বকাপের মাঝেই ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে ঝরল ফিলিস্তিনি গোলরক্ষকের প্রাণ

অফসাইডে ভাঙল ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্ন, নাটকীয় জয়ে শেষ ষোলোয় পর্তুগাল

পর্তুগালকে সমতায় ফেরালেন রোনালদো

১০

অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়লেন রোনালদো

১১

ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ২৭

১২

ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের মহড়া, বিএনপি নেতাকে বহিষ্কার

১৩

ইতালিতে ট্রিপল মার্ডারের একমাত্র সাক্ষী আমিরের জবানবন্দি

১৪

শেষ ষোলোর টিকিট কেটে যে রেকর্ড গড়ল স্পেন

১৫

সাঁতার শিখতে গিয়ে প্রাণ গেল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রের

১৬

অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে শেষ ষোলোতে স্পেন

১৭

শ্রমিক নেতাকে হত্যা, ছাত্রদলের ২ নেতা বহিষ্কার

১৮

নরওয়ে ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে বড় সুসংবাদ

১৯

বিএনপি নেতার মাদক সেবনের ভিডিও ভাইরাল

২০
X