বরিশালে বহুল আলোচিত সুজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। শুরুতে তার বিরুদ্ধে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তোলা হলেও তদন্ত বলছে ভিন্ন কথা। মূলত মাদক কারবারের অর্থ নিয়ে বিরোধের কারণে তাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপির সদস্য বাচ্চু দুরানী, তার ছেলে সাব্বির ও তাদের দলবলের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্র জানায়, গত ১৪ মার্চ দুপুরে বরিশাল শহরের ধান গবেষণা সড়কে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তোলে কয়েক যুবক। ওই দিনই শিশুটির মা-বাবা বিষয়টি পুলিশের কাছে অস্বীকার করে; কিন্তু পরদিন শনিবার শিশুটির মা কোতোয়ালি থানায় একটি এজাহার নিয়ে যান। এর পরই স্থানীয় কয়েক যুবক সুজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হাত উপরে তুলে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করে। নির্মম নির্যাতনের এক পর্যায়ে সুজন প্রাণ হারান। তাকে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সুজন ওই এলাকার ইজিবাইক চালক মনির হাওলাদারের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, সুজন নিজেই মাদকাসক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় একটি মাদক কারবারি চক্রের হয়ে ইয়াবা বিক্রি করতেন। মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে শিশু ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তোলা হয়। তাকে ধরে নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে গাছের সঙ্গে বেঁধে এমন নির্যাতন করতে থাকে। নির্যাতনে স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য বাচ্চু দুরানীর ছেলে সাব্বির হোসেন অংশ নেন।
সুজনের স্বজনদের দাবি মাদক কারবার নিয়ে বিরোধের জেরে চার ব্যক্তি মিলে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে সুজনকে। পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলা হয়। গণপিটুনিতে সুজনের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত মামলা হয়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটকও করেনি পুলিশ। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার পর রাতে নিহত সুজনের পরিবার হত্যা মামলা করবে বলে জানিয়েছে। তাদের থানায় এজাহার দিতে বলা হয়েছে। ওসি বলেন, ধর্ষণচেষ্টা যেমন অপরাধ, তেমনি আইন হাতে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করাও সমান অপরাধ। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া লোকজন ১৫ মার্চ সুজনকে আটক করে কীর্তনখোলা নদীর তীরে জিয়ানগর মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে একটি গাছের সঙ্গে উঁচু করে দুই হাত দড়ি দিয়ে বেঁধে বেধড়ক পেটাতে থাকে। পিটুনিতে অংশ নেয় স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানের ছেলে মো. বাঁধন, স্থানীয় কাইয়ুম মুনশি, ইমনসহ ছয়-সাতজন। নির্মম নির্যাতনে সুমন জ্ঞান হারালে ১৫ মার্চ সন্ধ্যার দিকে কোতোয়ালি থানা পুলিশ উদ্ধার করে শের-ই-বাংলা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত সুজনের বাবা মনির খানের অভিযোগ, তার ছেলেকে পিটিয়ে হত্যার নেপথ্যে মূল পরিকল্পনাকারী একই এলাকার বাচ্চু দুরানী, বাঁধন, ইমন ও রুবেল। তারা সবাই স্থানীয় যুবদলের রাজনীতি করে। গত শুক্রবার দুপুরে সুজনের বিরুদ্ধে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তোলে। ওই দিন রাত ১০টার দিকে অভিযুক্তরা তার বাসায় যান। ঘটনাটি মীমাংসার নাম করে মনিরের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। সব শেষে ২০ হাজার টাকায় মীমাংসার কথা হয়। বিষয়টি সাবেক কাউন্সিলর ফিরোজ আহমেদকে জানানো হয়েছে বলে জানান মনির খান।
তিনি বলেন, ‘খবর পেয়ে ১৪ মার্চ রাতে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে পুলিশ সবার সামনে বসেই শিশুটির সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা না পেয়ে পুলিশ ফিরে যায়। হামলাকারীরা যে অভিযোগ তুলেছে ওই ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি বলে পুলিশের কাছে শিশুর বাবা-মা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন; কিন্তু হঠাৎ করেই ১৫ মার্চ দুপুরে শিশুর মা থানায় একটি অভিযোগ দেন। এরপর সুজনকে পুলিশে দেওয়ার কথা বলে ধরে নিয়ে যায় বাচ্চু দুরানী, বাঁধন, ইমন ও রুবেল। তার পরেই তাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে।
এদিকে বাচ্চু দুরানী অভিযোগও অস্বীকার করে বলেন, সুজনের মায়ের সঙ্গে আমার রাস্তায় দেখা হয়েছিল। তখন উনি আমাকে মীমাংসা করে দিতে অনুরোধ করেছিলেন। আমি তখন এটা মীমাংসাযোগ্য নয় বলে তাকে (সুজনের মা) ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
নিহত সুজনের ভাই মো. আকাশ বলেন, ‘আমার ভাই সুজনকে স্থানীয় মো. বাঁধন, রুবেল, সাদ্দাম হোসেন, রাজীব হাওলাদার ধরে নিয়ে বেঁধে মারধর করেন। এ সময় কাইউম মুনশি, জামাল মুনশি, বাচ্চু দুরানী উপস্থিত ছিলেন। ঘটনার পর থেকে বাঁধন, রুবেল, সাদ্দাম ও রাজীব হাওলাদার আত্মগোপনে আছে।’
আকাশ দাবি করেন, সুজনকে দিয়ে এলাকার একটি মাদক কারবারি চক্র ইয়াবা বিক্রি করাত। সুজনও মাদকাসক্ত ছিলেন। মাসখানেক আগে পরিবার থেকে সুজনকে মাদক বিক্রি ও সেবন না করতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমনকি বাড়ি থেকে তাকে মোংলা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও সুজনকে ওই চক্র থেকে বারবার তাদের সঙ্গে মাদক বিক্রির জন্য চাপ দিতে থাকে; কিন্তু সুজন মাদক বিক্রি করতে যাননি। এতে ক্ষিপ্ত হয় ওই চক্র। সুজন সম্প্রতি মোংলা থেকে বরিশালে ফিরেছিলেন বলে জানান তার ভাই।
এদিকে বিএনপির সদস্য বাচ্চু দুরানী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ঘটনার সময় আমার ছেলে মাঠে খেলছিল। মারধরের খবর শুনে সন্ধ্যার আগে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখি, গাছের সঙ্গে বেঁধে সুজনকে পেটানো হচ্ছে। যুবকদের মারধর করতে নিষেধ করলে তারা আমার ওপরেও চড়াও হয়েছিল। এরপর আমি সেখান থেকে চলে আসি।’
বাচ্চু আরও বলেন, ‘ঘটনাস্থলে বাঁধনসহ কয়েকজনকে দেখেছি। বাঁধন এলাকায় মাদক কারবার করেন। বাঁধনের সঙ্গে এ নিয়ে সুজনের দ্বন্দ্ব ছিল বলে শুনেছি।’ তিনি দাবি করেন, ‘আমি ও আমার ছেলে মারধরের সঙ্গে জড়িত প্রমাণ করতে পারলে আমি বিচারের মুখোমুখি হতে রাজি। পুলিশের সঙ্গেও আমি এ বিষয়ে কথা বলেছি।’
বরিশাল আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘নিহত সুজন অপরাধী হতে পারে; কিন্তু একজন অপরাধীকে শাস্তি দিতে হলে অপরাধ প্রমাণের জন্য তদন্ত এবং বিচারের পুলিশ ও আদালত আছে। কেউ ইচ্ছা করলেই এভাবে প্রকাশ্যে কাউকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মেরে ফেলতে পারে না। এটা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। তাই তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা উচিত।’
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, সুজনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধরের ভিডিও আমাদের হাতে এসেছে। এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা শনাক্ত করা হয়েছে। তবে সুজনের মরদেহ দাফন করার জন্য ওর পরিবার গ্রামের বাড়ি বাউফলে আছে। তাই এ ঘটনায় মামলা হয়নি।
মন্তব্য করুন