

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উন্নত চিকিৎসা ও সুস্থতা নিশ্চিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে তোলা হয় শিশু বিকাশ কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে পরিচালিত এসব কেন্দ্রে গড়ে প্রতিদিন হাজারের বেশি শিশু চিকিৎসা ও সেবা পেত। সম্প্রতি অর্থ সাশ্রয়ের নামে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াই এই সেবা নিশ্চিতের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যেখানে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসা ও সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সুস্থতা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, অন্যদিকে চাকরি হারাবেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় ‘হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট (এইচএসএম) অপারেশন প্ল্যান’-এর একটি অংশ হিসেবে শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠা পায়। পর্যায়ক্রমে দেশের ২৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ১১টি জেলা সদর হাসপাতালে ধীরে ধীরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত জুলাই পর্যন্ত এসব কেন্দ্র থেকে দুই লাখ ৪৩ হাজার ৯৩৪ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু চিকিৎসাসেবা পেয়েছে। শুরুতে ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে রোগীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৯১০ জন, যা ২০২২-২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬ হাজার ১৭২ জনে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শূন্য থেকে ১৬ বছর বয়সী অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার, সেরিব্রাল পালসি, এডিএইচডি, মৃগীরোগ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও শেখার অক্ষমতা, দেরিতে কথা বলা ও বাক সমস্যা—এ ধরনের নানা জটিলতায় আক্রান্ত শিশুরা এসব কেন্দ্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বিনামূল্যে চিকিৎসা পায়।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইচএসএমের অধীনে পরিচালিত শিশু বিকাশ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়ে যায়। তবে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য অপারেশনাল প্ল্যানে এটি সংযুক্ত ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর অপারেশনাল প্ল্যান অনুমোদন না হওয়ায় এটি অনিশ্চয়তায় পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা।
অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ হলেও কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা চাকরি স্থায়ী হওয়ার আশায় ১৪ মাস ধরে বিনা বেতনে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। জানা গেছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে সরকারের সামান্য কিছু অর্থ সাশ্রয় হলেও সামগ্রিকভাবে দেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগ কেন্দ্রের থেরাপিস্ট রুমানা মাহফুজ কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা তো প্রতি মাসেই অপেক্ষায় থাকি বেতন কবে হবে সেটার জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষা করতে করতে ১৪ মাস পার হয়ে যাচ্ছে। এখন শোনা যাচ্ছে প্রকল্পই বন্ধ হয়ে যাবে। এরই মধ্যে চিকিৎসকদের বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। আমরা আসলে কী করব জানি না। এ বিষয়ে আমাদের খোলাখুলি কিছু বলাও হয়নি। কবে বেতন পাব, সেটিও জানি না। আমাদের সামনে এখন শুধুই অন্ধকার।’
কেন্দ্রগুলোর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, একজন ডেভেলপমেন্টাল থেরাপিস্ট এবং একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীর তত্ত্বাবধানে। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে শিশু বিশেষজ্ঞ ছাড়া শুধু থেরাপিস্ট বা নিয়মিত চিকিৎসক দিয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসা ও সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রতিদিন এসব কেন্দ্রে যেসব অটিজম, সেরিব্রাল পালসি বা ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত শিশু আসে, তাদের বেশিরভাগেরই নিয়মিত থেরাপি এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক না থাকলে সঠিক রোগ নির্ণয়, ওষুধ ব্যবস্থাপত্র এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা—কোনোটিই সম্ভব নয়। ফলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসা ব্যাহত হবে। এ ধরনের শিশুর চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেলে সে কয়েক মাসের মধ্যেই অর্জিত অগ্রগতি হারাতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে তার স্বনির্ভর হওয়ার ক্ষমতা, শেখার দক্ষতা ও সামাজিক জীবন সবই প্রভাবিত হবে। অর্থাৎ, কোনো অর্থনৈতিক হিসাবই এই ক্ষতির পূর্ণ মূল্য প্রকাশ করতে পারবে না।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, শিশু বিকাশ কেন্দ্রের শিশুদের চিকিৎসার যে পদ্ধতি, সেটা হচ্ছে একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। অর্থের অভাবে এখান থেকে চিকিৎসক সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই ঠিক হবে না। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি নেচিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শিশু স্বাস্থ্য ও নিউরো ডেভেলপমেন্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শিশুদের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেলে শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। অনেক শিশু হাঁটাচলা, কথা বলা বা দৈনন্দিন কাজ শেখার প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হবে। এমনকি অনেকে আজীবনের জন্য স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ হারাতে পারে, যা সমাজে তাদের বোঝা হিসেবে রয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক শিশু নিউরোলজিস্ট ডা. নাজমুল হক বলেন, অটিজম বা ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা থেমে গেলে কয়েক মাসের মধ্যে তারা যেটুকু অগ্রগতি করেছিল, তাও হারিয়ে ফেলবে। এই ব্যর্থতা শুধু একজন শিশুর নয়, পুরো পরিবারের জন্য আজীবন কষ্ট ডেকে আনবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসক এবং মনোবিজ্ঞানী ছাড়া একটা শিশুর চিকিৎসা শুধু থেরাপি দিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তা ছাড়া শিশু বিকাশ কেন্দ্রে অল্প খরচে যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, সেটা অন্য কোথাও নিতে গেলে অনেকগুণ বেশি অর্থ খরচ হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতালের উপস্থিত কোনো একজন চিকিৎসক শিশু বিকাশ কেন্দ্রে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ হবে না। কারণ, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া শিশু বিকাশ কেন্দ্রে আসা শিশুদের চিকিৎসা সম্ভব নয়। তা ছাড়া শিশু বিকাশ কেন্দ্র কর্মরত চিকিৎসকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও অভিজ্ঞ করে গড়ে তোলা হয়েছে। এজন্য তাদের পেছনে সরকারের অনেক ব্যয় করতে হয়েছে।
এ ধরনের বিশেষায়িত সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার বিএমআরসিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেন, বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য অপারেশন প্ল্যান বাতিল করা। এর মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিদেশি সহায়তা নির্ভরতা থাকবে না। তবে বর্তমানে কীভাবে এই বিশেষায়িত সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, গত বছর অপারেশন প্ল্যান বাতিল করার পর সরকার এক বছরের প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করতে বলেছিল। সেই প্রকল্প অনুমোদনের আগেই বছর শেষ হয়ে যায়। এরপর সরকার দুই বছরের প্রকল্প তৈরি করতে শুরু করেছে, তবে সেটি অনুমোদন হতে হতে দ্বিতীয় বছরও শেষ হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র নিয়ে আমরা বিকল্প চিন্তা করছি। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সভা হয়েছে। আমরা ইতিবাচক কিছু করার চেষ্টা করছি, কারণ বিষয়টি খুব স্পর্শকাতর।’