

পদোন্নতির সব শর্ত পূরণ ও ধাপ পেরোনোর পরও শুধু দুই কর্মচারী নেতার ব্যক্তিগত রোষানল থেকে বাগড়া ও বাধায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে আটকে আছে সরকারি ৮৬ কর্মচারীর পদোন্নতি। কর্মচারী থেকে ১১তম গ্রেডে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে পদোন্নতিতে সরকারের কোনো আর্থিক খরচ না থাকা সত্ত্বেও তাদের বাধায় আটকে আছে পদোন্নতির ফাইল। এরই মধ্যে পদোন্নতি না পাওয়ার মনোবেদনা নিয়েই পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন তাদের একজন, আরও তিন কর্মচারী চলে গেছেন অবসরে। এ ছাড়াও চলতি বছরই অবসরে যাবেন আরও অন্তত ৫ জন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, তাদের পদোন্নতিতে বাগড়া দেওয়া দুজন হলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি সৈয়দ লিয়াকত আলী ও মহাসচিব অহিদুর রহমান। এর মধ্যে লিয়াকত গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন বলে অভিযোগ। আর অহিদুরের বিরুদ্ধে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ আলাদাভাবে তদন্ত করছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই দুই কর্মচারী নেতার বিগত সরকারের সময় শিক্ষা প্রশাসনে আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিল গভীর সখ্য।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে ৪৮৫টি। এসব পদের মধ্যে ৮০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি ২০ শতাংশ বিভিন্ন শিক্ষা অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মধ্যে থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ২০ শতাংশ হারে ৯৯টি পদ সংরক্ষিত রয়েছে শিক্ষা অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের জন্য। ২০২১ সালে এ পদের বিপরীতে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাতে আবেদন করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, বিভিন্ন শিক্ষা অফিস ও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রধান সহকারী, হিসাবরক্ষক কাম প্রধান সহকারী, প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক, সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং উচ্চমান সহকারীরা। আবেদনের জন্য যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) ডিগ্রি থাকার কথা বলা হয়। এ ছাড়াও ফিডার পদে যেমন প্রধান সহকারী, হিসাবরক্ষক কাম প্রধান সহকারী, প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক ইত্যাদি ন্যূনতম সাত বছর চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়াও পাঁচ বছরের এসিআর এবং বিভাগীয়, ফৌজদারি বা দুদকের কোনো মামলা না থাকাসহ আরও কিছু যোগ্যতার শর্ত ছিল। এসব যোগ্যতা যাচাই-বাচাই করে ২০২৩ সালের জুলাইতে ৯৯ জনের বিপরীতে ৮৬ যোগ্য প্রার্থীকে পদোন্নতির জন্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) প্রস্তাব পাঠায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। পিএসসি যাচাই বাচাই শেষে তাদের সবাইকে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে; কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ঠেকাতে উচ্চ আদালতে মামলা এবং মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করতে থাকেন দুই কর্মচারী নেতা। যে দুজনের মধ্যে অহিদুর উচ্চমাধ্যমিক পাস হওয়ায় সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদে পদোন্নতির আবেদনই করতে পারেননি। আর লিয়াকত ওই সময় পর্যন্ত আবেদনের যোগ্যতা অর্জন করেননি। তাদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পদোন্নতির কাজ এগিয়ে নিতে চাইলে তারা উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন করেন। এ ছাড়াও আরও কয়েকটি ইস্যু দাঁড় করিয়ে ফের মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।
সর্বশেষ চলতি বছরের ২৫ আগস্ট এসব কর্মচারীদের মধ্যে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠদের তালিকা পুনরায় পাঠাতে মাউশিকে চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে যোগ্য ৮২ জনের তালিকা পাঠিয়েছে মাউশি। এর মধ্যে ৩ জন অবসরে এবং একজনের মারা যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই তালিকা মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পরপরই অহিদ ও লিয়াকত ফের বেপরোয়া হয়ে নতুন নতুন অভিযোগ তুলছেন। এই তালিকা অনুসরণ করে পদোন্নতি দেওয়া যাবে না বলে প্রকাশ্যে হুমকিও দিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, মাঝখানে লিয়াকত রিট পিটিশন করলে চারটি পদ সংরক্ষিত রেখে পদোন্নতির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য আদেশ দেন হাইকোর্ট। সেই আদেশের ওপর আইন মন্ত্রণালয় থেকে মতামত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে পদোন্নতিতে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে মতামত এসেছে। আদালতের আদেশে ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে পদায়নের বিষয়টি নিষ্পত্তি করে আদালতকে অবগতের নির্দেশ দেওয়া হয়, কিন্তু ৩ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেটি নিষ্পত্তি হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মচারী নেতা অহিদুর রহমানের মাউশিতে পদায়ন হলেও তার নির্দিষ্ট কোনো ডেস্ক নেই। ফলে তার কোনো কাজও নেই। সারা দিন সমিতির অফিসে বসে বিভিন্ন পদে বদলির তদবির করে বেড়ান। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য, এমপিও সিন্ডিকেট এবং দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার মতো একাধিক অভিযোগ তদন্ত করছে মাউশির মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন উইং। আর অবৈধ আয়ের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ায় অহিদ ও লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি-২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অহিদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আগের তালিকা সঠিকভাবে হয়নি, তাই নতুন করে জ্যেষ্ঠতার তালিকা করতে হবে। এতে যদি আগের লোকজনই পদোন্নতি পায়, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই।’ নিজে প্রার্থী না হয়েও কেন অভিযোগ করছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি কর্মচারীদের নেতা হিসেবে আমার দায়িত্ব রয়েছে।’
যদিও মাউশির কেন্দ্রীয় কর্মচারী পরিষদের মহাসচিব বেল্লাল হোসেন বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘মাউশির জ্যেষ্ঠতার তালিকার প্রার্থীদের সব সনদ ও রেকর্ডপত্র যাচাই করে পিএসসি যোগ্য ৮৬ জনকে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তারপরও একের পর এক মামলা, অভিযোগ করে সেই পদোন্নতি আটকে রাখা হয়েছে। এটা নিষ্পত্তি না হওয়ায় পেছনের ১১ হাজার কর্মচারীর পদোন্নতি বঞ্চিত হচ্ছেন, একইভাবে সারাদেশে ৮৬ জন সহকারী শিক্ষা অফিসারের পদ শূন্য রয়েছে।’
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, একই সময়ে পিএসসি সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে ৮৬ জন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে ১৭ জনকে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। এসব প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদায়ন হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে।
মাউশির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক বি এম আব্দুল হান্নান কালবেলাকে বলেন, ‘পদোন্নতি দেওয়ার কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়। আমাদের কাছে জ্যেষ্ঠতার তালিকা চেয়েছে, সে মোতাবেক হালনাগাদ তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এতে কেউ ক্ষুব্ধ হলেও আমাদের কি করার আছে?’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) বদরুন নাহার বলেন, ‘এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অভিযোগ, মতামত আসায় মাউশির মাধ্যমে সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি করানো হয়েছে। সেই তালিকা মোতাবেক পদোন্নতির কাজ চলছে।’