

জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে এ নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বৈধতা নিয়ে দেখা দিয়েছে বহু প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, রাজস্ব খাতে সৃজিত পদে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থী নিয়োগের ছক সাজানোর। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রবিধানমালায় লিখিত পরীক্ষার কথা উল্লেখ থাকলেও তার আয়োজন না করেই সরাসরি মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভাইভার জন্য আবেদনকারীদের কারও কারও মোবাইল ফোনে পাঠানো হয়েছে বার্তা (মেসেজ)। তবে অনেক আবেদনকারীই সেই বার্তা বা এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাননি। মাত্র চার দিন পরে হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনের আগে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন তড়িঘড়ির সমালোচনা করেছেন আবেদনকারীদের অনেকেই।
জানা গেছে, ৬২টি পদে জনবল নিয়োগের জন্য গত ২৮ জানুয়ারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৎকালীন রাষ্ট্রীয় বাসভবন ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছে এ জাদুঘর। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন এ জাদুঘরে ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে এসব নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ষষ্ঠ গ্রেডের পদ আটটি, নবম গ্রেডের ২০টি এবং দশম গ্রেডের পদ রয়েছে ১৩টি। বাকিগুলো ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের।
বিজ্ঞপ্তিতে, ষষ্ঠ গ্রেডের জন্য আলাদা অভিজ্ঞতার শর্তজুড়ে দেওয়া হলেও বাকিগুলোর ক্ষেত্রে নেই কোনো শর্ত। শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই সরাসরি তারা প্রথম শ্রেণিসহ বিভিন্ন গ্রেডের সরকারি চাকরি পেয়ে যাবেন। তাও আবার কোনো প্রকার লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু ভাইভা দিয়েই বিভিন্ন গ্রেডের সরকারি চাকরি হয়ে যাবে তাদের। বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্নদের ক্ষেত্রে আবার ‘বিশেষ ছাড়’- এর ব্যবস্থাও থাকছে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে এই জনবল নিয়োগের প্রস্তুতি এরই মধ্যে শেষ হয়েছে, যার অংশ হিসেবে আগামীকাল রোববার প্রার্থীদের সরাসরি ভাইভার জন্য ডাকা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু ভাইভার মাধ্যমে সরাসরি জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওইদিন বিভিন্ন পদের বিপরীতে ভাইভার জন্য আবেদনকারীদের জাদুঘর প্রাঙ্গণে উপস্থিত হওয়ার জন্য মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রার্থীদের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে ভাইভার জন্য ডাকা হয়েছে।
যদিও জাদুঘরের নিজস্ব প্রবিধানমালায় স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে, বিভিন্ন পদে নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণজ্ঞান বা প্রাসঙ্গিক কারিগরি বিষয়ের ওপর পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে হবে। ব্যাখ্যা হিসেবে বলা আছে, লিখিত পরীক্ষা ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা মৌখিক পরীক্ষার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। অর্থাৎ প্রবিধানমালা অনুযায়ী, লিখিত পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি নিয়োগ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু সেই প্রবিধানমালাও অনুসরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, লিখিত পরীক্ষার নোটিশ, সিলেবাস বা সময়সূচি প্রকাশ না করেই শুধু ভাইভানির্ভর প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত ভাইভানির্ভর নির্বাচন হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘এই জাদুঘরের নিজস্ব চাকরি প্রবিধানমালায় লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। তা বাদ দিয়ে ভাইভা নেওয়া সরাসরি বিধি লঙ্ঘন।’
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাদুঘরের এসব পদ রাজস্ব খাতে সৃজিত। রাজস্ব পদের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ দেওয়া শুধু প্রশাসনিক রীতির বিরোধী নয়, বরং ভবিষ্যতে এসব নিয়োগ বাতিলের ঝুঁকিও তৈরি করে। ভাইভা এককভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতি হতে পারে না। এ বিষয়ে সাবেক এক জনপ্রশাসন সচিব বলেন, ‘রাজস্ব খাতের পদে সাধারণত লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। সেটি বাদ দিয়ে হঠাৎ ভাইভা নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক নয়। এটি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।’
সরকারি চাকরি প্রবিধানমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সাবেক এই সচিব আরও বলেন, ‘এভাবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রথম শ্রেণির সব পদেরই নিয়োগ লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। লিখিত পরীক্ষা ছাড়া শুধু ভাইভার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার বিধান নেই। এটা প্রবিধানমালার লঙ্ঘন। ভাইভা চূড়ান্ত মূল্যায়নের অংশ হতে পারে; কিন্তু একমাত্র নির্বাচন পদ্ধতি হতে পারে না। লিখিত পরীক্ষা ছাড়া মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা যায় না।’
তড়িঘড়ি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধানের অভাব: সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এর আগে তড়িঘড়ি করে এমন নিয়োগ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার চাপ রয়েছে। সেই তাড়াহুড়ার অংশ হিসেবেই লিখিত পরীক্ষার ধাপ এড়িয়ে গিয়ে ভাইভার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ চূড়ান্ত করার আগেই কিছু নাম ‘চূড়ান্ত তালিকায়’ উঠানো হয়েছে, যা নিয়োগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ভাইভায় সবাইকে না ডাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক আবেদনকারী জানিয়েছেন, তারা তাদের মোবাইল ফোনে নিয়োগ-সংক্রান্ত কোনো এসএমএস বা পরীক্ষার প্রবেশপত্র পাননি, অথচ সীমিতসংখ্যক প্রার্থীর কাছে ভাইভার জন্য হাজির হওয়ার বার্তা পাঠানো হয়েছে। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই ভাইভার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করলে নম্বর হেরফের ও পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি হয়, যা মেধাভিত্তিক নিয়োগের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অর্থাৎ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের এ নিয়োগ প্রক্রিয়া—লিখিত পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও শুধু ভাইভার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই—স্বচ্ছতা, বৈধতা ও নিরপেক্ষতা তিন ক্ষেত্রেই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, ভাইভা-নির্ভর নির্বাচনে নম্বর হেরফের ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ থাকে।
একাধিক আবেদনকারী কালবেলাকে বলেন, তারা নির্ধারিত নিয়ম-কানুন মেনেই আবেদন করেছিলেন; কিন্তু কবে ভাইভা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে ধারণা নেই। আবেদনকারীদের একজন বলেন, ‘নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যেভাবে বলা হয়েছিল, আমি সেভাবেই আবেদন করেছিলাম; কিন্তু কোনো মেসেজ তো পাইনি।’
আরেক আবেদনকারী বলেন, ‘আবেদন প্রক্রিয়ায় জুলাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছিল, আমি একজন জুলাই আহত। অথচ আমি ভাইভার জন্য কল পাইনি, কোনো মেসেজও আসেনি।’
যদিও জাদুঘর কর্তৃপক্ষের দাবি, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হচ্ছে না, প্রবিধানের বিভিন্ন ধারা অনুসরণ করেই নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের বিদ্যমান বিধি অনুসরণ করা হচ্ছে এবং ভাইভাই চূড়ান্ত ধাপ।
জানতে চাইলে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব কালবেলাকে বলেন, ‘জুলাই জাদুঘরের নিয়োগের বিধিমালার সব ধরনের নিয়মনীতি শতভাগ মেনে আমরা কাজ করছি।’ তবে আবেদনকারী সবাইকে ভাইভার জন্য না ডাকা প্রসঙ্গে প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।
পরে রাতে এই প্রতিবেদকের হোয়াটস অ্যাপ নম্বরে এই নিয়োগ সংক্রান্ত দুটি দাপ্তরিক নথির অংশবিশেষের ছবি পাঠিয়ে মহাপরিচালক উল্লেখ করেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের রাজস্ব পদে নিয়োগের নিমিত্ত নিয়োগ পরীক্ষার সময় ও প্রক্রিয়া প্রমার্জন করেছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। সেখানে বলা হয়েছে, বিশেষায়িত এ জাদুঘর দ্রুত উন্মুক্তকরণের স্বার্থে লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে শুধু মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে স্বল্পতম সময়ে প্রার্থীদের প্রশাসনিক দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা, উপস্থিত বুদ্ধি ও বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা সরাসরি যাচাই করে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনপূর্বক দ্রুততম সময়ে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা এবং কাঙ্ক্ষিত সময়ের মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।’
যদিও প্রশ্ন রয়েছে জুলাই জাদুঘরের এই প্রবিধানমালা নিয়েও। এতে বলা হয়েছে, জুলাই জাদুঘরের নিয়োগ হবে সরাসরি, পদোন্নতি, এবং প্রেষণে বদলির মাধ্যমে। নিয়োগের জন্য উন্মুক্ত বিজ্ঞাপন দিতে হবে এবং বাছাই কমিটির সুপারিশকে বাধ্যতামূলক ধরা হয়েছে। পদোন্নতির উদ্দেশ্যে মেধা যাচাইয়ের জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিতে হবে। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে, যেমন ‘বিশেষ যোগ্যতা’ বা গবেষণাধর্মী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিলের ক্ষমতা রাখা হয়েছে কর্তৃপক্ষের হাতে।
প্রবিধানমালায় সরাসরি নিয়োগের ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিশেষায়িত জাদুঘর বিধায় বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নিয়োগের যে কোনো শর্ত শিথিল করিতে পারিবে।’ কিন্তু বিশেষ যোগ্যতা কি হবে সেটা ব্যাখ্যা করা হয়নি। আর অস্পষ্টতার এই সুযোগ নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রয়েছে অনিয়মের শঙ্কা।
জনপ্রসাসন বিশ্লেষকদের মতে, এসব ধারার মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে কারসাজির সুযোগ রয়েছে। বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাড়াই বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্নদের জন্য শর্ত শিথিলের ব্যবস্থা রাখার ফলে আর্থিক লেনদেন, স্বজনপ্রীতি বা প্রভাবশালীরা সুবিধা পেতে পারেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নিয়মের যথাযথ বাস্তবায়ন অপরিহার্য।