

তালেবানশাসিত আফগানিস্তানে সম্প্রতি প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধি নিয়ে দেশটিতে ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক শতাব্দী আগে যে দেশে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে মুসলিম বিশ্বের জন্য উদাহরণ তৈরি করেছিল, এখন সেই দেশের আইনে ফিরেছে ‘দাস’ শব্দটি। এটি শুধু একটি শব্দচয়নের বিষয় নয়, এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজে ফিরছে দাসপ্রথা! পাশাপাশি এটি শ্রেণিভিত্তিক বিচারের কথা বলছে। এর মানে ধর্মীয় নেতারা অপরাধ করলে কেবল উপদেশ পাবেন অথচ নারী ও নিম্নশ্রেণির মানুষ একই অপরাধে কারাদণ্ড আর শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হবেন। এমন বৈষম্যমূলক বিধান নিয়ে ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন দেশটির অধিকারকর্মীরা। উদ্বেগ জানিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় এসব আইন দ্রুত পরিমার্জনের আহ্বান জানিয়েছে।
গত ৪ জানুয়ারি তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ১১৯টি অনুচ্ছেদের ‘আদালতের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি’ অনুমোদন দেন। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সংস্থা জর্জটাউন ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি বলছে, ৭ জানুয়ারি ১১৯টি অনুচ্ছেদ, ৩টি অধ্যায় ও ১০টি ধারা সংবলিত ‘ক্রিমিনাল প্রসিডিউরাল রেজ্যুলেশনস ফর কোর্টস’ শিরোনামে ফৌজদারি কার্যবিধিটি অনুমোদন করে দুই দফা ডিক্রি জারি করেন তালেবান আমির। যদিও এটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। পরে ২১ জানুয়ারি এটি পশতু ভাষায় তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।
এতে বলা হয়েছে, গোত্রপ্রধান ও সামরিক কমান্ডারদের অন্তর্ভুক্ত অভিজাত শ্রেণিকে সাধারণত কারাদণ্ড এড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়, মধ্যম শ্রেণির ক্ষেত্রে কারাদণ্ড হতে পারে এবং নিম্ন শ্রেণির ব্যক্তিদের ওপর জনসমক্ষে বেত্রাঘাত, কারাবাসসহ কঠোর শাস্তি আরোপ করা হবে।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর দেশটির নতুন আইনি কাঠামোতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর আবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দাস’ শব্দটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আফগান আইনের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
তুর্কি টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এ আইনের একাধিক ধারায় স্পষ্টভাবে ‘মুক্ত ব্যক্তি’ ও ‘দাসে’র মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে, ফলে কার্যত দাসত্বকে একটি স্বীকৃত আইনি শ্রেণি হিসেবে হাজির করা হয়েছে।
তালেবানদের এ আইনের ১৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যে অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি (হুদুদ) নেই, সে ক্ষেত্রে অপরাধীকে বিচারকের বিবেচনাধীন শাস্তি (তাজির) দেওয়া হবে, ‘অপরাধী মুক্ত হোক বা দাস’ উভয় ক্ষেত্রেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, আইনে ‘দাস’ শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে তালেবানরা এমন একটি মর্যাদাকে বৈধতা দিচ্ছে, যা আফগানিস্তানে বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এ পরিবর্তন আফগানিস্তানের আগের আইনি কাঠামোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কয়েক দশক ধরে দেশটির কোনো সংবিধান বা দণ্ডবিধিতে দাসপ্রথার অস্তিত্ব স্বীকৃত ছিল না।
দ্য ডিপ্লোমেট বলছে, প্রথম নজরে এই ফৌজদারি আইনটি একটি সাধারণ আইনি কাঠামোর মতো মনে হতে পারে। কিন্তু এ আইনের লক্ষ্য নাগরিকদের সুরক্ষা নয়, বরং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা।
আফগানিস্তানে দাসপ্রথা আইনগতভাবে বিলুপ্ত হয় ১৯২৩ সালে, রাজা আমানুল্লাহ খানের শাসনামলে। এরপর এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে প্রতিটি সংবিধানেই এ নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল। তালেবানদের ২০২৬ সালের ফৌজদারি আইনে আবার ‘দাস’ শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছে, যা ইসলামি ও আন্তর্জাতিক দাসবিরোধী নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কট্টরপন্থি তালেবান গোষ্ঠীর জারি করা নতুন এ ‘ফৌজদারি কার্যবিধির’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আফগান মানবাধিকার সংস্থা রাওয়াদারি। সংস্থাটির অভিযোগ, এই বিধি বৈষম্য, নির্যাতন ও দাসত্বকে আইনি বৈধতা দেয় এবং মোল্লা ও ধর্মীয় নেতাদের ফৌজদারি বিচার থেকে কার্যত দায়মুক্তি দেয়।
রাওয়াদারি জানিয়েছে, নতুন বিধিতে নাগরিকদের চারটি সামাজিক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে এবং একই অপরাধের শাস্তি অপরাধীর শ্রেণিভেদে ভিন্ন হবে। বিধির ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শীর্ষ শ্রেণিতে থাকা ধর্মীয় পণ্ডিত বা মোল্লারা অপরাধ করলে কেবল উপদেশ বা তিরস্কার পাবেন, আর সর্বনিম্ন শ্রেণির ব্যক্তিদের কারাদণ্ড ও শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
কার্যবিধিতে বলা হয়েছে, গোত্রপ্রধান ও সামরিক কমান্ডারদের অন্তর্ভুক্ত অভিজাত শ্রেণিকে সাধারণত কারাদণ্ড এড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে, মধ্যম শ্রেণির ক্ষেত্রে কারাদণ্ড হতে পারে এবং নিম্ন শ্রেণির ব্যক্তিদের ওপর জনসমক্ষে বেত্রাঘাত, কারাবাসসহ কঠোর শাস্তি আরোপ করা হবে।
রাওয়াদারি জানিয়েছে, এই বিধি আইনের দৃষ্টিতে সমতা, নির্দোষ ধরে নেওয়ার নীতি, নির্যাতন নিষিদ্ধকরণ, ন্যায্য বিচারের অধিকারসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপন্থি। সংস্থাটি আরও বলেছে, এতে আইনজীবী পাওয়ার অধিকার বা নীরব থাকার অধিকারের কোনো বিধান নেই এবং বিবেচনাধীন শাস্তি (তাজির) আরোপের ব্যাপক সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিধিটিতে ‘গুলাম’ (দাস) শব্দ ব্যবহার করে দাসত্বকে আইনি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের ৫ নম্বর দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, হুদুদ শাস্তি ‘ইমাম’ কার্যকর করবেন, আর তাজির শাস্তি কার্যকর করতে পারবেন ‘স্বামী’ বা ‘মালিক’ (বাদার)। হুদুদ বলতে ইসলামী আইনে আল্লাহর অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তিকে বোঝায়।
এই বিধান মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে, কারণ এতে প্রাতিষ্ঠানিক পারিবারিক সহিংসতা ও দাসসদৃশ পরিস্থিতির ঝুঁকি তৈরি হয়, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে, কেননা এটি মালিক ও স্বামীদের শাস্তি কার্যকর করার ক্ষমতা দেয়। বিধি প্রকাশের পর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও তালেবানবিরোধী গোষ্ঠী এর সমালোচনা করেছে। আফগানিস্তানের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ফারিদ হামিদি বলেছেন, এটি এমন একটি নথি যা সব নাগরিককে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং মানবিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত হানে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক রিচার্ড বেনেট বিধিটির প্রভাবকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। রাওয়াদারি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফেমিনিস্ট ম্যাজরিটি ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা বলছে, তালেবানের কার্যকর করা নতুন কার্যবিধি আফগানিস্তানের আইনি ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে, সহিংসতাকে আনুষ্ঠানিকীকরণ করছে, ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য করছে, দাসত্বকে বৈধতা দিচ্ছে এবং ধর্মীয় আইনের আড়ালে নারীদের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ কার্যবিধির অস্পষ্টতার কারণে এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ করে দিচ্ছে।