

প্রধান প্রকৌশলী পদে চার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো), বর্তমানে যার নাম ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই-পিএলসি। যদিও পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিতরণকারী এই প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত রাখার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু সেই নির্দেশনাকে যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে পদোন্নতির প্রক্রিয়া। এখানেই শেষ নয়, ডেসকো পরিচালনা পর্ষদের ৪২৩তম সভার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে উপস্থাপিত জনবল কাঠামো বিদ্যুৎ বিভাগে পাস করিয়ে বড় পরিসরে নিয়োগের আয়োজনও চলছে। যদিও ডেসকো পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন অনুযায়ী, অভিজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান জনবলের যথার্থতা, যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন লোকবল যথাযথ পদে আছে কি না এবং কোথাও অতিরিক্ত জনবল থাকলে তা সম্বন্বয় করে প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাস করার কথা ছিল। কিন্তু ডেসকো সেই নির্দেশনা আড়াল করে বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘অর্গানোগ্রাম ২০২৫’ বিদ্যুৎ বিভাগে পাস করানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর বাইরেও সিনিয়রিটি (জ্যেষ্ঠতা) লঙ্ঘন করে কনিষ্ঠ একাধিক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ২৬ নভেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখা থেকে উপসচিব ফারজানা খানম স্বাক্ষরিত চিঠিতে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ডেসকোর প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের ওই নির্দেশনা অমান্য করে গত ১৪ জানুয়ারি ডেসকো পদোন্নতি কার্যক্রম চালু করে এবং চারজনকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেয়। পদোন্নতি পাওয়া চারজন হলেন মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান, মো. নজরুল ইসলাম, মো. মঈনদ্দিন খান ও মির্জা আবু নাছের।
এ ছাড়া ডেসকোর পরিচালনা পর্ষদের ঘনিষ্ঠদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে জ্যেষ্ঠতার তালিকাও পরিবর্তন করা হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২০ নভেম্বর জ্যেষ্ঠতার আগের তালিকা সংশোধন করে নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয় ডেসকোর ওয়েবসাইটে।
নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ‘গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ডেসকোর সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ পর্যালোচনাপূর্বক সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য গত ১১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি গ্রিভেন্স রিড্রেস কমিটি গঠন করা হয়। পরে ২১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে কমিটিতে আরও দুজন সদস্য যুক্ত করা হয়।’
ডেসকোর পরিচালনা পর্ষদের ৫০৫তম সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৬৫২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন বিষয়ে কমিটির কাছে অভিযোগ দাখিল করে। ওই সভায় পূর্বোক্ত কমিটিকে পরবর্তী বোর্ড সভায় প্রতিবেদন উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। তবে নথিতে উল্লেখ রয়েছে—পরবর্তী সময়ে গ্রিভেন্স রিড্রেস কমিটি কর্তৃক বোর্ড সভায় প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয়নি। বরং বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অমান্য করে গত ১৯ জুন, ২০২৫ তারিখে গ্রিভেন্স রিড্রেস কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ অনুষ্ঠিত ডেসকো পরিচালনা পর্ষদের ৫১৪তম সভা এবং ৫ নভেম্বর ২০২৫ অনুষ্ঠিত ৫১৭তম সভায় যথাক্রমে আলোচ্যসূচি ৪ ও ১০ হিসেবে পুনর্গঠিত গ্রিভেন্স রিড্রেস কমিটি কর্তৃক প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ডেসকো পরিচালনা পর্ষদের ৫০৫তম সভার কার্যবিবরণীতে উল্লিখিত ২৪২টি একক আবেদনের মধ্যে মাত্র ১১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবেদন ৫১৭তম সভায় উপস্থাপিত হয় এবং যৌথভাবে কৃত কোনো আবেদন উপস্থাপিত হয়নি। ৫১৭তম সভায় শুধু মুষ্টিমেয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবেদন বিবেচনায় আনা হয় এবং অযৌক্তিকভাবে অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবেদন অগ্রাহ্য করা হয়।
নথিতে দাবি করা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা পরিবর্তন, গ্রেড অবনমনসহ কিছু বিশেষ লক্ষ্যে সার্ভিস রুলসের ধারা পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে, এমনকি ডেসকো পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সিনিয়রিটি লিস্ট প্রণয়ন করে তা প্রকাশ না করে গোপন রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত আমলে না নিয়ে ডেসকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ‘ডেসকো অর্গানোগ্রাম ২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। পরিচালনা পর্ষদের ৪২৩তম সভায় ‘প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে অর্গানোগ্রাম পুনর্বিন্যাসের জন্য অভিজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ’-এর সিদ্ধান্ত থাকলেও তা প্রতিপালন করা হয়নি। বরং বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে নতুন অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন ও কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ওয়েরসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৫ পর্যন্ত ডেসকোর গ্রাহক সংখ্যা ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭৮ জন, যার মধ্যে প্রি-পেমেন্ট গ্রাহক ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৯৯৯ জন। অর্থাৎ ডেসকোর প্রায় ৬৫ শতাংশ গ্রাহকই প্রি-পেমেন্ট মিটারের আওতায়। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডেসকো এরই মধ্যে জিআইএস ও স্ক্যাডা সিস্টেম বাস্তবায়ন করেছে। অভ্যন্তরীণ দাপ্তরিক কাজে ইআরপি ও ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নের জন্য ওসিএসএমএস নামের অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করছে এবং গ্রাহক অভিযোগ নিষ্পত্তিতে হটলাইন সেবা সিস্টেম ব্যবহার করছে। ফলে নতুন করে যে পরিমাণ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার দশ ভাগের একভাগ জনবলও প্রয়োজন নেই। আর এ কারণেই ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত লাভের জন্য পরিচালনা পর্ষদের ৪২৩তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্গানোগ্রাম পুনর্বিন্যাসে অভিজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রদানে অনীহা দেখাচ্ছেন।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের অব্যাহত সংস্কার/পুনর্গঠন কার্যক্রমের আওতায় বিদ্যুৎ বিতরণ পদ্ধতি পরিচালন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও গুণগত মান পরিবর্তনের লক্ষ্যে কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর আওতায় সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি হিসেবে ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে গঠিত হয় ডেসকো। পরে ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে ৫০০ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে ডেসার কাছ থেকে মিরপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা অধিগ্রহণের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ডেসকোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। কালের বিবর্তনে এক সময়ের লাভজনক এই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি বর্তমানে চরম আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ডেসকোর আর্থিক লোকসান ছিল ৫০৫ কোটি টাকা, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান দেখানো হয়েছে ১২৫ কোটি টাকা। বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ ছাড়া ও জনবলের যথার্থতা যাচাই ছাড়া লোকসানে থাকা এই প্রতিষ্ঠানের নতুন জনবল কাঠামো অনুমোদন করানো বিলাসিতার নামান্তর।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান কালবেলাকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নিষেধজ্ঞা থাকার পরও পদোন্নতি দেওয়া হলে সেটা অনিয়ম। প্রয়োজন ছাড়া লোকবল নিয়োগ ও নিয়ম লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এসব বিষয়ে সচিব জানে। তবে নিয়ম লঙ্ঘন হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’