রেজওয়ান রনি, রংপুর
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৪২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: ফল বিশ্লেষণ

জামায়াত ঝড়ে ভাঙল জাতীয় পার্টির ‘দুর্গ’ ধরাশায়ী বিএনপিও

রংপুর বিভাগ
ছবি : কালবেলা
ছবি : কালবেলা

দীর্ঘদিন থেকে রংপুরকে জাতীয় পার্টির (জাপা) শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে দেখা হতো। এ অঞ্চলের ক্ষমতা ধরে রেখেছিল জাপা ও আওয়ামী লীগ। তবে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জাপার সেই ‘দুর্গ’ ভেঙে পড়েছে। রংপুরের ৩৩টি আসনের মধ্যে জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ১৮টিতে জয়লাভ করেছে। বিএনপি পেয়েছে ১৩টি আসন।

যে আসনে ৩৯ বছর ক্ষমতা ধরে রেখেছিল জাপা, সেই আসনে হেরে গেছেন দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের। গাইবান্ধার দুটি আসনে প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হতে পারেননি দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। এক আসনে তিনি ভোটের জামানত হারিয়েছেন, আর অন্যটিতে তৃতীয় হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতিতে জড়িয়ে জাতীয় পার্টি ক্ষমতার অংশীদার থাকলেও উত্তরবঙ্গে প্রত্যাশিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে না পারায় ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা দলটির ভরাডুবির কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচনের দিন জি এম কাদের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন ও সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের কথা থাকলেও তিনি করেননি। সারাদিন রংপুর নগরীর সেনপাড়ায় তার বাসভবন ‘দ্য স্কাই ভিউতে’ ছিলেন। গতকাল শুক্রবার সকালে বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে দেখা করেন। পরে তিনি দুপুরে সৈয়দপুর বিমানবন্দর হয়ে ঢাকায় চলে যান।

ভোটের পরদিন দুপুরে রংপুর নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড় এলাকায় কথা হয় রিকশাচালক আব্দুল হকের সঙ্গে। তার বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার কাফ্রিখাল এলাকায়। তিনি জানান, ভোটার হওয়ার পর থেকেই তিনি জাতীয় পার্টির প্রতীক ‘লাঙ্গল’ মার্কায় ভোট দিয়ে আসছিলেন।

আব্দুল হক বলেন, ‘এরশাদ বেঁচে থাকলে হয়তো ভোট দিতাম। কিন্তু দলের নেতারা এত বছরেও এ অঞ্চলে তেমন কাজ করেননি। তাই এবার পরিবর্তন চাইছি।’

তবে বদরগঞ্জের জাপা সমর্থক রেজাউল করিমের মত ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘দলের রাজনীতি তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে না দেওয়ার কারণে সাংগঠনিক শক্তি কমে গেছে।’ তার ভাষ্য, ‘দলের ভেতরের সমস্যা আর কেন্দ্রের রাজনীতির কারণে ক্ষতি হয়েছে। দলকে নতুন করে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা গেলে মানুষ আবারও জাপার দিকে ফিরবে।’

কোন আসনে কারা জিতলেন: পঞ্চগড়ের দুটি আসনের মধ্যে দুটিতেই জয় পেয়েছে বিএনপি। পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী নওশাদ জমির ও পঞ্চগড়-২ আসনে ফরহাদ হোসেন আজাদ জয়ী হয়েছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি আসনেই বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঠাকুরগাঁও-২ আসনে মো. আব্দুস সালাম ও ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে মো. জাহিদুর রহমান জিতেছেন।

দিনাজপুরের ছয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই জিতেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। বাকি একটিতে জিতেছেন স্বতন্ত্র একজন। দিনাজপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী মো. মনজুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনে মো. সাদিক রিয়াজ, দিনাজপুর-৩ আসনে সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর-৪ আসনে মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ. জেড. এম. রেজওয়ানুল হক ও দিনাজপুর-৬ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বিজয়ী হয়েছেন।

নীলফামারীর চার আসনেই জিতেছেন জামায়াত প্রার্থীরা। নীলফামারী-১ আসনে অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার, নীলফামারী-২ আসনে আল ফারুক আব্দুল লতীফ, নীলফামারী-৩ আসনে ওবায়দুল্লাহ সালাফী ও নীলফামারী-৪ আসনে আব্দুল মুনতাকিম নির্বাচিত হয়েছেন।

লালমনিরহাটের তিনটি আসনেই জিতেছে বিএনপি। লালমনিরহাট-১ আসনে হাসান রাজীব প্রধান, লালমনিরহাট-২ আসনে রোকন উদ্দীন বাবুল ও লালমনিরহাট-৩ আসনে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু বিজয়ী হয়েছেন।

রংপুরের ছয়টি আসনে জিতেছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। রংপুর-১ আসনে জামায়াতের রায়হান সিরাজী, রংপুর-২ আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, রংপুর-৩ আসনে মো. মাহবুবুর রহমান (বেলাল), রংপুর-৪ আসনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, রংপুর-৫ আসনে জামায়াতের গোলাম রব্বানী ও রংপুর-৬ আসনে মো. নুরুল আমীন জয়ী হন।

কুড়িগ্রামের ৪টি আসনের তিনটিতে জামায়াত ও একটিতে জোটের দল এনসিপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। কুড়িগ্রাম-১ আসনে জামায়াতের মো. আনোয়ারুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম-২ আসনে এনসিপির আতিকুর রহমান মোজাহিদ, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের ব্যারিস্টার মাহবুব আলম সালেহী ও কুড়িগ্রাম-৪ আসনে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক জয়ী হন।

গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে জামায়াত, একটিতে বিএনপি জিতেছে। গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-২ আসনে আব্দুল করিম সরকার, গাইবান্ধা-৩ আসনে আবুল কাওছার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, গাইবান্ধা-৪ আসনে বিএনপির মোহাম্মদ শামীম কায়সার ও গাইবান্ধা-৫ আসনে জামায়াতের মো. আব্দুল ওয়ারেছ বিজয়ী হয়েছেন।

জামায়াতের ‘বাজিমাত’, তবু চাওয়া ছিল আরও: বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে ১৬টিতে জয় পেয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া জোটের শরিক এনসিপি পেয়েছে দুটি আসন। দলটির ইতিহাসে উত্তরবঙ্গ থেকে এতসংখ্যক আসনে জয় এর আগে আসেনি।

জেলাভিত্তিক ফলে দেখা যায়, জামায়াত-জোট রংপুরের ৬টির সবকটিতে, নীলফামারীর ৪টির ৪টিতে, কুড়িগ্রামের ৪টির ৪টিতে এবং গাইবান্ধার ৫টির মধ্যে ৪টিতে জয় পেয়েছে। তবে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটে কোনো আসন পায়নি তারা।

জামায়াত নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলভিত্তিক সাংগঠনিক কাজ, নিয়মিত কর্মসূচি ও প্রার্থী বাছাইয়ে কৌশলগত সিদ্ধান্তের ফলেই এ সাফল্য এসেছে। তবে তারা জানান, অন্য জেলাগুলোতেও আগের নির্বাচনে তারা আসন পেয়েছিলেন, তাই আরও বেশি আসনে জেতার প্রত্যাশা ছিল তাদের।

রংপুর বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনের ফল নিয়ে মহানগর জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য এটিএম আজম খান বলেন, ‘জনগণের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে জামায়াত। এ ছাড়া এই এলাকাগুলোতে আগে জামায়াত বা বিএনপির এতজন নেতা সংসদে যেতে পারেননি। তাই মানুষ পরিবর্তনের সুযোগকে বেছে নিয়েছে।’

বিভাগের চার জেলায় আসন না পাওয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু আসনে আমরা আগে সিট পেতাম, কিন্তু এবার প্রত্যাশিত ফল হয়নি। আমরা বসে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করছি এবং আগামী দিনে তৃণমূল পর্যায়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেব।’

বিএনপি কম আসন পেল কেন: ১৯৯১ সালে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র একটি ও ১৯৯৬ সালে ৩টি আসন পায় বিএনপি। ২০০১ সালে বিএনপি এই বিভাগে ৯টি আসন পায়। তবে ২০০৮ সালে জামায়াতের মতো বিএনপিও এই বিভাগে কোনো আসন পায়নি।

রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার কয়েকজন বিএনপি নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে বিএনপির আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। কিন্তু নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তৃণমূল কর্মীদের অবম্যূল্যায়ন—এসব কারণে সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি।

তবে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জনগণ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। যেখানে বিএনপির প্রার্থীরা হেরেছেন, সেখানে ভোটের ব্যবধান খুব অল্প হয়েছে। অনেক জায়গায় ভোটাররা বিএনপি ও জাতীয় পার্টিকে ভোট দিয়েছেন; মাঝখান দিয়ে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করেছে। ভালোভাবে সাংগঠনিক কাজ করলে আগামীতে ভালো হবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কী বলছেন: রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ত্বহা হোসাইন বলেন, উত্তরবঙ্গের রাজনীতি কোনো ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতায় ভোটাররা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির মতো সুসংগঠিত ও পুনর্গঠিত শক্তির দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা জাতীয় পার্টির পরিবর্তে নতুন শক্তির ওপর আস্থা রেখেছে। এজন্য জাতীয় পার্টির এমন বিপর্যয় হয়েছে।

সারা দেশে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পেলেও রংপুরে জামায়াতের চাইতে কম আসনে বিজয়ী হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, রংপুরে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে প্রভাবশালী নেতা কম থাকায় স্থানীয় কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় ও উদ্দীপনার ঘাটতি দেখা যায়। এ ছাড়া কিছু এলাকায় হেভিওয়েট প্রার্থী বাদ দিয়ে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই বাসের চালকসহ গ্রেপ্তার ৩ জনের জামিন

৩৫.৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড / সিলেটে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নাহিদ ইসলামের বৈঠক

মধ্যরাতে দেশে পৌঁছাবে লেবাননে নিহত ২ বাংলাদেশির মরদেহ

শেষ মুহূর্তে বড় ধাক্কা, আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের বিশ্বকাপ শেষ

বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল ৩ অটোরিকশা যাত্রীর

রোগীকে আটকে ইনজেকশন পুশের টাকা দাবি, নার্সকে শোকজ  

গৃহকর্মী থেকে মন্ত্রী : কলিতা মাঝির উত্থানের গল্প

নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করল চসিক

এসএসসি পরীক্ষার্থীকে বলাৎকার, আ.লীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ২

১০

তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

১১

ব্রাজিলের সামনে এবার মিসর

১২

আগামী পাঁচ দিন কেমন থাকবে আবহাওয়া, জানাল অধিদপ্তর

১৩

ফ্ল্যাটে মিলল গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ, শরীরে আঘাতের চিহ্ন

১৪

সিলেটের কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে : সিসিক প্রশাসক

১৫

আসছে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ, দিনে-দুপুরে নেমে আসবে অন্ধকার

১৬

বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ গেল বিএনপি নেতার

১৭

আইভীকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

১৮

গাজায় বিয়ের অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৫

১৯

সরকারি দলের বৈঠক / এমপি-মন্ত্রীদের জনগণের কাছে সরকারি সেবার সুফল পৌঁছানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

২০
X