

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়ায় বিএনপি অভাবনীয় ফল করেছে। জেলার সাতটি আসনেই দলটির প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। ২০০১ সালের পর এটিই দলটির বড় বিজয়। এর পেছনে মূলত কাজ করেছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ইমেজ বা ভাবমূর্তি।
এ ছাড়া দলটির নেতাকর্মীদের নিরলস পরিশ্রম, প্রার্থী বাছায়ে সঠিক পদক্ষেপ, সাংগঠনিক শক্তি, দলীয় কোন্দল ভুলে নেতাকর্মীরা একাট্টা হয়ে ভোটের মাঠে নামা, নারী কর্মীর ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট প্রার্থনা, হিন্দু ভোটারদের অভয় দিয়ে কাছে টানা এবং আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের বাক্সে নেওয়ায় বিএনপির ভোটের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সব আসনে।
মূলত ১৯৭৯ সাল থেকেই বগুড়া জেলা বিএনপির ঘাঁটি। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নের রাজনীতিতে সেই ঘাঁটি অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সেই ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয় বিএনপি।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি থাকায় হাজারো ভোটার ঘর ছেড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণ ও নির্ভয় পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। তা ছাড়া বগুড়ার মানুষ দীর্ঘ ১৭ বছর উন্নয়ন বঞ্চনার জবাব দিতে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাসন থেকে ফেরা তারেক রহমানকে মন খুলে ভোট দিয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে বিএনপি প্রধান তারেক রহমান ধানের শীষ প্রতীকে ২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আবিদুর রহমান ৯৭ হাজার ৬২৬ ভোট পান। ভোটের ব্যবধান দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৫৪। এ আসনে ৭১ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।
বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা) আসনে বিএনপির কাজী রফিকুল ইসলাম ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন ৫৬ হাজার ৯৩৩ ভোট পান। ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ১২ হাজার ৯২৮। এ আসনে ভোট পড়েছে ৬২ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এ আসনে বিএনপির মধ্য কোন্দল ছিল প্রকট। ২০১৮ সালের উপনির্বাচনের প্রার্থী আহসানুল তৈয়ব জাকির দলীয় মনোনয়ন চেয়ে না পাওয়ায় তিনি পদে পদে বাধা সৃষ্টি করেন কাজী রফিককে। সর্বশেষ তিনি ঋণখেলাপির মামলা করেন দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে। সেই মামলা আদালতে খাজির হওয়ার পর কেন্দ্রের নির্দেশে শেষ মুহূর্তে এক্যবদ্ধভাবে ভোট করেন দুই নেতা। পরে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে ধানের শীষ।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী মীর শাহে আলম ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী মাওলানা শাহাদাজ্জামান পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট। ভোটের ব্যবধান ৪৭ হাজার ৪৭৬। এ আসনে ভোট পড়েছে ৭২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
এ আসনে ১৯৭৯, ১৯৯৬, ২০০১ সালে বিজয়ী হয় বিএনপি। এবারও বিপুল ভোটে জয়ের সম্ভাবনা ছিল শত ভাগ। কিন্তু শুরু থেকেই মার্কা জটিলতার কারণে বিএনপির ভোটাররা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। কারণ প্রথম দিকে আসনটি বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী জাতীয় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে ছাড় দেয় বিএনপি। তার মার্কা কেটলি। বিএনপির দুর্গ এ আসনে ধানের শীষের পরিবর্তে কেটলি নিয়ে বিজয়ী হয়ে আসা অনেকটায় অসম্ভব। শেষ মুহূর্তে মাহমুদুর রহমান মান্না ঋণখেলাপির আলোচনা থাকায় বিএনপি এখানে তরুণ নেতা মীর শাহে আলমকে প্রার্থী করে। মাঝের এ টানাপোড়েনে বিএনপি ভোটের ব্যবধান কিছুটা কমে যায়।
শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল ওহাব বলেন, প্রার্থী নিয়ে টানাপোড়েন না থাকলে ভোটের ব্যবধান আরও বাড়ত। আমরা এক মাসও প্রচারের সুযোগ পাইনি। অথচ প্রতিপক্ষরা ১০ মাস আগে থেকে মাঠে নেমেছে।
বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি) আসনে বিএনপির আব্দুল মহিত তালুকদার ১ লাখ ২৭ হাজার ৪০৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী নূর মোহাম্মদ ১ লাখ ১১ হাজার ২৬ ভোট পেয়েছেন। ভোটের ব্যবধান ১৬ হাজার ৩৮০। এ আসনে ভোট পড়েছে ৭২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আসনটি বিএনপির পারিবারিক আসন হিসেবে পরিচিত। কারণ বিজয়ী আব্দুল মহিত তালুকদারের বাবা আবদুল মজিদ তালুকদার তিনবার এবং তার বড় ভাই আবদুল মোমিন তালুকদার দুই বার এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এর আগে মহিত তালুকদার ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কিন্তু জামায়াত এবার এ আসনে তরুণ ও সদালাপী এক ইউপি চেয়ারম্যানকে প্রার্থী করায় ঝুঁকির মুখে পড়ে বিএনপি। তা ছাড়া বাবা ও ভাইয়ের পৈতৃক আসন হওয়ার কারণে অনেকটা অহমিকা কাজ করে বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে। যার কারণে তিনি প্রচার-প্রচারণায় হাত গুটিয়ে বসে থাকেন। নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করেন। খরচের রাশ টেনে ধরেন। এসব কারণে বিএনপির সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে জামায়াত। যার কারণে সামান্য ভোটে পার পায় বিএনপি।
বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে বিএনপির মোশারফ হোসেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মোস্তফা ফয়সাল পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৭৮ ভোট। ভোটের ব্যবধান ৪৬ হাজার ৩৬১। এ আসনে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৮ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা ৭৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এ আসনে জামায়াতের প্রভাব রয়েছে। সে হিসেবে জামায়াত প্রার্থী দিয়েছিল ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাবেক সভাপতিকে। সবার ধারণা ছিল, এ আসনে জামায়াত প্রার্থী জয়ী হবেন। কিন্তু সনাতনী ও নারী ভোটারের উপস্থিতি বিএনপি প্রার্থীকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়।
বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে বিএনপির প্রার্থী জিএম সিরাজ ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী দবিবুর রহমান ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩২৯ ভোট পেয়েছেন। ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৫ হাজার ৫১২। হিন্দু অধ্যুষিত এ আসনে ৭১ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট পড়েছে। জিএম সিরাজ ছয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
তার বিজয়ের নেপথ্যে কাজ করেছেন, সনাতনীদের ভোট। তারা নির্ভয়ে ভোট দিয়েছেন। এ ছাড়া নারী ভোটারের উপস্থিতি, ভোট না দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ হাত খুলে ভোট দিয়েছেন। তরুণ ভোটাররাও ব্যবধান গড়ে দিয়েছে বেশি।
বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপি প্রার্থী মোরশেদ মিলটন ২ লাখ ৬২ হাজার ৫০১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মাওলানা গোলাম রব্বানী পেয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ১৮৪ ভোট। ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৭।
বগুড়া জেলার মধ্যে মিলটনই সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান এ আসনটি গাবতলী উপজেলায়। শহীদ জিয়া তাদের ঘরের সন্তান বলে নারী-পুরুষ, সনাতনী সবাই এ আসনে ধানের শীষকেই ভোট দেন। এর আগে অনেকবার এ আসন থেকে খালেদা জিয়া প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হয়েছেন।
বগুড়া শহর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক হিরু বলেন, বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের ধারায় বগুড়া আবারও প্রমাণ করেছে, এটি শহীদ জিয়ার হাতে গড়া দল বিএনপির শক্ত ঘাঁটি।
বগুড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু বলেন, বগুড়ার মানুষ সত্যিকার অর্থেই বিএনপিকে ভালোবাসে, এ বিজয় তারই প্রমাণ।
বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি। এখানকার মানুষ আগেও আমাদের সমর্থন করেছেন, এবারও করেছেন। তিনি বলেন, ভোটের সময় আমাদের নেতাকর্মী-সমর্থকরা ভোটারের ঘরে ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে তারেক রহমানকে ভোট দিয়েছে। তারেক রহমান সদরে প্রার্থী হওয়ায় সেই ঢেউ অন্য আসনগুলোতেই ছড়িয়ে পড়ে। আর এ কারণেই বিজয় সুনিশ্চিত হয়েছে।