কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বিপাকে পড়বে দেশ

জ্বালানি চাহিদার ৬৫-৭০ শতাংশ আমদানিনির্ভর
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

আপাতত কোনো সমস্যা না হলেও ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বিপাকে পড়বে বাংলাদেশ। দেশের জ্বালানি চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। পাশাপাশি বাংলাদেশে অপরিশোধিত-পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প উৎস নিয়ে সক্রিয় চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানির মজুত ও সরবরাহের সবশেষ অবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখার ওপর জোর দেন তিনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তিত। এ সময় তিনি জানান, জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বিকল্প জ্বালানির উৎস খুঁজতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে অপরিশোধিত-পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত থেকে জ্বালানি তেল কেনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। আর এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার প্রায় পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। এদিকে, পণ্য পরিবহনের বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা ইরান থেকে না এলেও কার্যত গতকাল রাত থেকে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি পথ, যা উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আরও নাজুক হলে এর প্রভার আমাদের এখানেই পড়বে। তাই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার পাশাপাশি অবশ্যই বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে। কারণ জ্বালানি সরবরাহ চেইনে ভেঙে গেলে দেশের অর্থনীতিও নাজুক অবস্থায় পড়বে।

দেশে বর্তমানে বছরে জ্বালানি তেল আমদানি করে সরবরাহ করা হয় কমবেশি ৭০ লাখ টনের মতো। যার বেশিরভাগই আনা হয় মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার দেশগুলো থেকে। এই যুদ্ধে তেল সরবরাহ নিয়ে চিন্তায় আছে বিপিসি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে পুরো জ্বালানি খাতে নেমে আসবে বিপর্যয়। তবে বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, আপাতত জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সমস্যা তৈরি হবে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের মজুত রয়েছে মাত্র ১২ দিনের। এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত অকটেনের মজুত ২৯ দিন, পেট্রোল ১৯ দিন, ফর্নেস অয়েলের ৯০ দিন, জেট ফুয়েলের ১৫ দিন, কেরোসিনের ২৮৫ দিন এবং মেরিন ফুয়েলের ৪২ দিনের মজুত রয়েছে।

এ ছাড়া গতকাল রোববার ৩৫ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ‘এমটি টরম অ্যাগনেস’ নামে একটি জাহাজ বহির্নোঙরে ভিড়েছে। এ ছাড়া আজ এবং ৪ মার্চ ৩০ থেকে ৩২ হাজার টনের ডিজেল নিয়ে আরও দুটি জাহাজ আসবে। সেগুলো এখন সমুদ্রে আছে। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে ১ থেকে ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস্তা নুরা পোর্ট থেকে তেলবোঝাই করে একটি এবং ২১ মার্চ সৌদি আরবের জাপানরা এলাকা থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে আরও একটি জাহাজ বাংলাদেশে আসার কথা। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই দুই কনসাইনমেন্টের ভাগ্যে কী আছে, তা নিয়ে বিপিসির কর্মকর্তারা চিন্তিত।

দেশে প্রতি বছর ৭০ লাখ টনের মতো জ্বালানি তেলের চাহিদার মধ্যে অপরিশোধিত তেল আমদানি হয় ১৩ লাখ টনের মতো। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৮ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির কার্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ২৪ লাখ ২০ হাজার টন উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হবে। বাকি ১৪ লাখ টন জি-টু-জির অধীনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হবে। এদিকে ইরানে হামলা নিয়ে আলোচনার মধ্যে গত এক সপ্তাহে তেলের বাজার কিছুটা বেড়েছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, আগামী জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আমরা আপাতত সেফ সাইডে রয়েছি। পরিশোধিত জ্বালানি তেল মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে। এসব দেশ থেকে জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে অপরিশোধিত তেলের দীর্ঘমেয়াদি উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হওয়ায় বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এটুকু বলা যায় যে, এ মুহূর্তে আমাদের জ্বালানি তেলের রিজার্ভে কোনো সংকট নেই।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইরান যুদ্ধে দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এলএনজি আমদানিতে। কারণ এলএনজির আমদানির বেশিরভাগই আসে কাতার ও ওমান থেকে। বর্তমানে ২ হাজার ৬৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে সাড়ে নয়শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আকারে আমদানি করা হয়। পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড-আরপিজিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ১১৫টি কার্গোর মাধ্যমে বছরে ৬০ লাখ টনের মতো এলএনজি আমদানি করে। এর মধ্যে শুধু কাতার থেকে আমদানি হয় ৪০ লাখ টনের মতো। গত বছর এ জন্য ব্যয় করা হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদে চুক্তির ভিত্তিতে কাতার এনার্জি এলএনজি মার্কেটিং কোম্পানি, কাতার এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি, ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড এবং আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড এলএনজি সরবরাহ করে থাকে। এ ছাড়া টেন্ডারের মাধ্যমে স্পট থেকে খুব সামান্য এলএনজি কিনে থাকে বাংলাদেশ সরকার। আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা জানান, মার্চ মাসে কমপক্ষে ৯টি কার্গো কাতারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মহেশখালীতে আসার কথা। অর্থাৎ দু-তিন দিন পরপর একেকটি কার্গো এফএসআরইউতে এসে খালাস হচ্ছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ৩ মার্চ একটি কার্গো আসার কথা। এর দুদিন পর আরও একটি কার্গো কাতার থেকে আসার কথা রয়েছে। এখন পর্যন্ত সমুদ্রে দু-তিনটি কার্গো আছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে সর্বশেষ সরবরাহ অবস্থা জানাতে কাতার ও ওমানকে বলা হয়েছে। ওই দুটি দেশ এখনো এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। কর্মকর্তারা বলেন, এরই মধ্যে ১১টি কার্গো জাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অতিক্রম করেছে।

এ ছাড়া দেশের বাজারে প্রতি বছর অন্তত ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্য আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশ থেকে পণ্যটি আমদানি করে দেশের বাজারে সরবরাহ করেন বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা। দেশের বাজারে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এলপি গ্যাসের সংকট চলছে। এ পরিস্থিতিতে সংঘাত বিস্তৃত হলে তা দেশের এলপি গ্যাসের বাজারে সংকট আরও তীব্র করতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বিষয়টি নিয়ে একাধিক ব্যবসায়ী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে গ্যাস, এলপিজি, ক্রুড অয়েল আসে বাংলাদেশে। এটা আমাদের জ্বালানির বড় উৎস অঞ্চল। এ অঞ্চলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানির বড় অংশ পরিবহন হয়। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশে সাপ্লাই চেইন বড় ধরনের সংকটে পড়বে। সেইসঙ্গে জ্বালানি পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। সরকারকে বিষয়গুলো মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে। এ সময় তারা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাড়ে ৯ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে

মেহেদী অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, কারাগারে দুই যুবক

বিএমডিসির নিবন্ধনবিহীন চিকিৎসকের পক্ষে মানববন্ধন, মামলা প্রত্যাহারের দাবি

ফেনী জেলা বিএনপির মিডিয়া সেলের কমিটি অনুমোদন

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশের পর সংসদ সচিবালয়ের তদন্ত কমিটি

সাভার থানা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা, সভাপতি মাশফি-সম্পাদক সামির

‘বাপের দোয়া’ থেকে ‘ক্রিকেটের দোয়া’ করতে চান তামিম

‘আমার বউ নিয়ে গেছে, তাই আমি ওর বউ নিয়ে এসেছি’

জঙ্গল সলিমপুরে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহ দিলেন এসপি মাসুদ আলম

বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে টিভির শোরুমে ক্রেতাদের ভিড়

১০

কোরআনে হাফেজার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

১১

ইরান চুক্তি না করলে আবারও যুদ্ধ শুরু হবে : ট্রাম্প

১২

ভিসা মিলেছে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে রাত কাটাতে বাধা ইরানি ফুটবলারদের

১৩

প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে আ.লীগ নেতার চিঠি

১৪

গ্রামে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, অভিযোগ রুমিন ফারহানার

১৫

৫৫ বছরে শহীদ জিয়া গবেষণা কেন্দ্র কেন হয়নি, প্রশ্ন মঈন খানের

১৬

আগামী ২০ বছর বিশ্ব ক্রিকেটকে শাসন করতে চান সূর্যবংশী

১৭

আল জাজিরা বিশ্লেষণ / ইরান যুদ্ধের ১০০তম দিন, কোথায় দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য?

১৮

কেন্দ্রীয় কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়ে সাতক্ষীরায় জেলা যুবদলের শুভেচ্ছা মিছিল

১৯

এনসিটিবি ও ৪ শিক্ষা বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান 

২০
X