একসময় মানুষকে বোঝানো কঠিন হতো যে, শরীরের মতো মনেরও অসুখ হতে পারে। দিন বদলেছে। মানসিক স্বাস্থ্যকে মানুষ গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। তাই বলে কোমর ব্যথাও কি মানসিক হতে পারে? সহজে এর উত্তর দেওয়া কঠিন। বিষয়টি বোঝাতে শুরুতে একটি উদাহরণ টানা যাক—
একসময় কুলকুল করে বয়ে চলা নদীর পানি শুকিয়ে যায়। কিন্তু তার ধারা বহুকাল পরেও থেকে যায়। চিহ্ন দেখে বোঝা যায় একসময় এখানে খরস্রোতা নদী ছিল। ধরুন, সামান্য বা মাঝারি মানের ডিস্ক প্রলাপ্স—যা PLID নামে পরিচিত, সে কারণে আপনার কোমর ব্যথা হলো। ডিস্ক আগের জায়গায় ফিরে গেল ঠিকই; তীব্র ব্যথাও কমে গেল। কিন্তু মৃদু থেকে মাঝারি ব্যথা রয়েই গেল। এই ব্যথা শরীরে বয়ে চলল দীর্ঘকাল। ঠিক ওই মরা নদীর মতো। আপনার কোমরে আঘাত বা ডিস্ক প্রলাপ্সে যে ব্যথার ধারা তৈরি হয়েছিল, আপনার মস্তিষ্ক সেই ধারাকে মনে রাখতে সক্ষম। ব্রেইনের এই স্মরণশক্তি প্রাকৃতিক অথবা পারিপার্শ্বিক অবস্থা দ্বারা প্রভাবিত। যেমন ধরুন, কারও যদি কোমর ব্যথা সম্পর্কে অতিমাত্রায় নেতিবাচক মনোভাব থাকে অথবা প্রকৃত কোমর ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তিটি আর্থ-সামাজিক বা পারিবারিক কারণে মানসিক চাপে থাকেন তবে তার মনের ব্যথার সঙ্গে কোমর ব্যথার সংমিশ্রণ ঘটতে পারে। তৈরি হতে পারে মনের ভেতর স্থায়ী দাগের। যা তার শরীরকে ব্যথার উপলব্ধি দিতে থাকবে বছরের পর বছর। এ ধরনের কোমর ব্যথা ফাইব্রোমায়েলজিয়া নামক রোগের সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই ব্যথা নির্ণয়ের উপায় কী?
এ ধরনের ব্যথা নির্ণয় সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। এই ধরনের রোগীর MRI, X-ray তে-ও সমস্যা উঠে আসতে পারে। PLID বা Lumbar spondylosis পরিলক্ষিত হতে পারে টেস্ট রেজাল্টে। কিন্তু এর প্রকৃত কারণ দেখা যাবে অন্যত্র। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারণগুলো একে একে বের করতে হলে রোগীকে সময় দিতে হবে। চিকিৎসকেরও থাকতে হবে বাস্তবসম্মত ও উন্নত প্রশিক্ষণ।
চিকিৎসা
মনের ব্যথা যখন শরীরে চলে যায়, সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া বেশ কঠিন। এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে ইউটিউব, ফেসবুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা রকমের মনগড়া ও ভুল তথ্য। এসব ভুল তথ্য থেকে ভুল শিক্ষা নেওয়া কোমর ব্যথা রোগীকে ব্যথা সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলাই মূল চ্যালেঞ্জ। যেমন ধরুন—একজন কোমর ব্যথার রোগী বছরের পর বছর ধরে জেনে এসেছে তার ব্যথার কারণ PLID। তিনি হয়তোবা গত তিন বছরে চারটি MRI করে ফেলেছেন। পেশা পরিবর্তন করছেন দ্রুত সুস্থ হতে। কিন্তু সুস্থ হতে পারছেন না। এ ধরনের অসংখ্য রোগী পাওয়া যায়।
প্রথমত, এই ধরনের রোগীকে সঠিক বিষয়টা বোঝাতে হবে। দ্বিতীয়ত, টার্গেটেড বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা দিতে হবে তাকে। সেটি হতে পারে থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ, অ্যাডভাইস বা অন্য চিকিৎসা।
রোগীকে যা করতে হবে
মনে রাখবেন, আপনি ইউটিউব বা ফেসবুকে ভাইরাল যা কিছুই দেখছেন তা সত্যি না-ও হতে পারে। একটা তথ্য বিশ্বাস করার আগে দেখে নিন কে বা কোন পেজ তথ্যটি দিচ্ছে, তার যোগ্যতা কী। রোগীদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা হলো কোমর ব্যথা PLID-এর কারণেই বেশি হয়। কথাটি অনেকাংশেই ভুল। বেশিরভাগ ব্যথার কারণ PLID নয়। গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে অনেক সুস্থ মানুষও রয়েছে যাদের MRI করে দেখা গেছে তারা PLID-তে আক্রান্ত অথচ কোমর ব্যথা নেই। একইভাবে অনেক কোমর ব্যথার রোগী রয়েছে যাদের MRI স্বাভাবিক।
লেখক : কোমর ব্যথাবিষয়ক পিএইচডি গবেষক, লা ট্রোব ইউনিভার্সিটি, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া। বিভাগীয় প্রধান, ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাব বিভাগ, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
মন্তব্য করুন