ফরহাদ মজহার
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:৪৫ এএম
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৯:১৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

উপনিবেশ, সাম্রাজ্যবাদ ও গণমাধ্যম

উপনিবেশ, সাম্রাজ্যবাদ ও গণমাধ্যম

গণমাধ্যম সম্পর্কে আমাদের বিস্তর রঙিন বা রোমান্টিক ধারণা রয়েছে। যে কারণে আমরা দাবি করে থাকি শক্তিশালী গণমাধ্যম গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী গণমাধ্যম দরকার। এই দাবি অস্পষ্ট। আসলে ইতিহাসে এভাবে দাবি করার পক্ষে বিশেষ প্রমাণ নেই।

কথাটা আসলে উল্টা করে বলা। পাশ্চাত্যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে উদার ব্যক্তিতান্ত্রিক চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল। বিপ্লবের আগে শিল্প, সাহিত্য, সংবাদপত্রসহ সব মাধ্যমেই প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক সামন্তীয় বা পেটিবুর্জোয়া চিন্তাধারার বিপরীতে ব্যক্তির মহিমা প্রচারিত হয়েছে। অর্থাৎ গণমাধ্যমের বিকাশ সমাজের সামগ্রিক বিকাশ থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেনি। গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার বিকাশ, শ্রেণি হিসেবে বুর্জোয়া শ্রেণির গঠন, গণমাধ্যমের রূপান্তর এবং নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সবই সমান্তরাল ঘটনা। বিচ্ছিন্নভাবে একটিকে আরেকটির কারণ হিসেবে যেমন প্রমাণ করা কঠিন, তেমনি বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার মধ্য দিয়ে উদার, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যমেরও ক্ষয় ঘটেছে। গণমাধ্যম আধুনিক পাশ্চাত্য রাষ্ট্রে সমাজের শক্তিশালী বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করেছে। পাশ্চাত্যের শিল্পসাহিত্য সংবাদপত্রসহ সব গণমাধ্যমের স্বভাব এভাবেই পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তন ঘটেছে বুর্জোয়া শ্রেণির আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের মধ্য দিয়ে। তেমনি পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের বর্তমান কালপর্বে গণমাধ্যম ক্রমেই কোনো দেশ বা রাষ্ট্র নয়, গ্লোবাল করপোরেট স্বার্থরক্ষা করে চলেছে। এই স্বার্থ কোনো

দেশের বা রাষ্ট্রের স্বার্থ ভাবলে আমরা ভুল করব। গত ৭ অক্টোবর হামাসের আল-আকসা তুফান অভিযানের পর শক্তিশালী করপোরেট গণমাধ্যম তাদের নিজ নিজ দেশের কিংবা নিজ দেশের জনগণের স্বার্থ নয়, নগ্নভাবে ভিন্ন রাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষাবলম্বন করেছে। গণমাধ্যমের মধ্যে আমরা যে দ্বন্দ্ব বা লড়াই দেখি, সেটা একসময় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির লড়াই-সংগ্রাম দিয়ে বোঝা যেত। সেটা আলাদা কিছু ছিল না। আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর সেই রাষ্ট্র সচল রাখার প্রাতিষ্ঠানিক শর্তের মধ্যে বুর্জোয়া শ্রেণিকে তাদের পক্ষের গণমাধ্যমকে শক্তিশালী রাখতে হয়েছে। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নকে সচল এবং বর্তমান এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে পাশ্চাত্য গণমাধ্যম অবশ্যই করপোরেট স্বার্থই রক্ষা করতে হবে। তাই প্রধান প্রধান করপোরেট মিডিয়ায় আমরা জায়নবাদি সেটলার কলোনিয়াল রাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষেই প্রচার দেখি। গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী গণমাধ্যম দরকার এই বাচাল ও বাসি কথা মাথায় রাখলে গণমাধ্যম নিয়ে স্বাধীনভাবে ভাবা ও পর্যালোচনা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা বাস্তবে দেখেছি এবং দেখছি কীভাবে গণমাধ্যম একটি গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট শক্তি ও রাষ্ট্র কাঠামো টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। বৃহৎ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের ভূমিকা বুঝতে হলে ঔপনিবেশিক কালপর্বে উপনিবেশ স্থাপন এবং উপনিবেশের পক্ষে যুক্তি ও ন্যায্যতা হাজির করা, সাম্রাজ্যবাদের যুগে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে মতাদর্শ ও ন্যায্যতা তৈরি এবং পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কালে পুঁজি বা করপোরেট স্বার্থে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম খুবই নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। তাই গণমাধ্যমের প্রতি কোনো আলগা পিরিতি বা রোমান্টিসিজমের সুযোগ নেই বললেই চলে।

কিন্তু বিদ্যমান ক্ষমতা বা শক্তির বিপরীতে ‘গণ’ বা জনগণের পক্ষে কি গণমাধ্যমের কোনো ভূমিকা নেই? অবশ্যই আছে। সেই ক্ষেত্রে তাকে ‘গণমাধ্যম’ না বলে ভিন্নভাবে চিহ্নিত করা জরুরি। তাকে আমরা প্রতিরোধের বয়ান বা ‘গণসাহিত্য’ বলতে পারি, যা সবসময়ই বিদ্যমান ক্ষমতা ও করপোরেট পরিসরের বাইরে তৈরি ও উৎপাদিত হয়। তার প্রচারের ধরনও আলাদা। ‘গণমাধ্যম’ বলতে আমরা যেভাবে মূল ধারার করপোরেট মিডিয়া বুঝি তার সঙ্গে এ সাহিত্যের চরিত্রগত ফারাক আছে। উভয়কে এক গণ্য করার বিভ্রান্তিকর অনুমান থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

পুরোনা তর্ক

গণমাধ্যম নিয়ে তর্ক পুরোনা। নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট: দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব দ্য মাস মিডিয়া’ (১৯৮৮) বহুল পরিচিত গ্রন্থ (Herman and Chomsky 2008)। গণমাধ্যম নিয়ে তর্ককে খুবই নির্ধারক জায়গায় নেওয়ার ক্ষেত্রে এ বইটির ভূমিকা রয়েছে। ক্ল্যাসিক বই। গ্রন্থটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যম কীভাবে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে বয়ান এবং বিদ্যমান ক্ষমতার পক্ষে ‘সম্মতি’ উৎপাদন করে তার পর্যালোচনা।

গণমাধ্যম আসলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে জনগণের সম্মতি উৎপাদনের পক্ষে একটি প্রচার ব্যবস্থা। এর স্বরূপ উন্মোচনের জন্য গ্রন্থটি যে বিশেষ বিশ্লেষণের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, সেটা লেখকদের ভাষায় ‘প্রোপাগান্ডা মডেল’। সাধারণ জনগণের কাছে বার্তা ছড়িয়ে দিতে গিয়ে খবর বাছাই, বিন্যাস ও উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম বিদ্যমান ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। প্রভাবশালী, অভিজাত গোষ্ঠীর বিভিন্ন নীতি এবং স্বার্থের জন্য কার্যকরভাবে গণসম্মতি তৈরি করাই মূল ধারার গণমাধ্যমের কাজ। এ কাজ করতে গিয়ে যে পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় তাকেই হারম্যান ও চমস্কি গণমাধ্যমের প্রচারণার মডেল বা নকশা বলেছেন।

গণমাধ্যম সাধারণত ধনী ব্যক্তি বা বৃহৎ করপোরেশনের মালিকানাধীন। এই মালিকানা কাঠামো মালিকদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংবাদই আদতে প্রকাশ ও প্রচার করে। এরপর রয়েছে বিজ্ঞাপনের ভূমিকা। গণমাধ্যমগুলো বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞাপনদাতারা বিতর্ক চায় না, অ-বিতর্কিত বিষয়বস্তু পছন্দ করে। যার ফলে গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে একটা স্বেচ্ছা সেন্সরশিপ চলে। ফলে ভিন্নমতের কণ্ঠস্বরগুলো প্রান্তিক ও আড়াল হয়, কিংবা চাপা পড়ে।

তা ছাড়া গণমাধ্যম তথ্যের জন্য সরকার, ব্যবসা এবং বিশেষজ্ঞ উৎসের ওপর নির্ভর করে। তাই প্রায়ই শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি সংবাদ কভারেজে প্রাধান্য পায়। এ উৎসগুলোই সংবাদের একটি স্থির প্রবাহ সরবরাহ করে, গণমাধ্যমের রিপোর্ট এতে সহজ এবং সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে বটে, কিন্তু তা সমাজের অধিপতি শ্রেণির স্বার্থকেই প্রবল করে তোলে। গণমাধ্যম মামলা, অভিযোগ বা সমালোচনা এড়িয়ে চলতে চায়। তাই শক্তিশালী স্বার্থকে বিপর্যস্ত করার ভূমিকা গণমাধ্যম এড়িয়ে চলে।

গণমাধ্যমের যে ‘মডেল’ বা প্রচার ব্যবস্থার কাঠামো ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট বইতে বর্ণনা করা হয়েছে, সেটা সংবাদ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরই বিশেষভাবে জোর দিয়েছে। অনেকে একে জনসাধারণের ওপর মিডিয়ার প্রভাব হিসেবে ভুল করেন। এ বই সংবাদ উৎপাদনের এ ব্যবস্থা জনগণের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তার পর্যালোচনা করেনি। সেটা ভিন্ন বিষয়। তাই তারা পরিষ্কারই বলছেন, ‘গণমাধ্যম কীভাবে সংবাদ বানায় আর জনগণের ওপর তার প্রভাব কী হয় দুটি আলাদা বিষয়...। এটা অবশ্যই ঠিক যে, সরকারি ভাষ্যের সঙ্গে গণমাধ্যমের ভাষ্যের যোগ থাকে এবং জনগণের অভিমত প্রভাবান্বিত করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকে, কিন্তু সেটা মাত্রার বিচার। যেখানে জনগণের স্বার্থের সঙ্গে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের তীব্র বিরোধ থাকে, সেখান সরকারি ভাষ্য জনগণের মধ্যে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি করে। যাই হোক, আমরা যে কথাটা বইতে বিশেষভাবে জোর দিতে চাইছি সেটা হলো, যেসব শক্তি গণমাধ্যমের চরিত্র নির্ণয় করে প্রোপাগান্ডা মডেল দিয়ে তাকেই ব্যাখ্যা বর্ণনা করা হয়েছে। তার মানে এই নয়, এই মডেল থেকে যে কোনো প্রোপাগান্ডা উৎপাদিত হলেই তা সবসময়ই কামিয়াব হবে’ (Herman and Chomsky 2008, 13)।

গণমাধ্যম ও উপনিবেশ

গণমাধ্যমের এই ভূমিকা শুধু আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ কিংবা স্বাধীন জাতীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। হারম্যান ও চমস্কির প্রোপাগান্ডা মডেল ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদকে ন্যায্যতা দেওয়ার ক্ষেত্রে মিডিয়ার বিভিন্ন ভূমিকা বুঝতেও আমাদের সহায়ক হয়। গণমাধ্যম ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদী দখলদারিকে স্বাভাবিক ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করতে চেয়েছে। এ উদ্দেশ্যে ঔপনিবেশিক বয়ান যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি গণমাধ্যম সাম্রাজ্যবাদী বয়ানও উৎপাদন করেছে।

উনিশ শতকে ভিক্টোরিয়ান প্রেসের যুগে ব্রিটেনের ‘দ্য টাইমস’-এর মতো সংবাদপত্রগুলোর নিবন্ধে উপনিবেশের জনগণকে ‘অসভ্য’ ও ‘বর্বর’ হিসেবে চিহ্নিত করে এমন সব বর্ণনা হাজির করেছিল। সেই সব বর্ণনার অনিবার্য যৌক্তিক সিদ্ধান্ত দাঁড়ায় যে, সভ্য হতে হলে কলোনির অধিবাসীদের জন্য অবশ্যই পশ্চিমা সভ্যতা ও ইংরেজের শাসন দরকার। সেই যুক্তি জোরেশোরে পেশও করা হতো। ঔপনিবেশিক আমলে গণমাধ্যম বিভিন্ন যুক্তি ও বর্ণনার মধ্য দিয়ে উপনিবেশবাদকে ন্যায্যতা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ন্যায্যতাগুলো সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বই ইত্যাদি নানান ফর্মের মাধ্যমে প্রচার করা হতো। প্রায়ই জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, বর্বরদের সভ্য করার মিশন, উপনিবেশের অর্থনৈতিক সুবিধা এবং কলোনির কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হতো। ‘অসভ্যদের সভ্য’ করার মিশন ছিল ঔপনিবেশিকতাকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রধান একটি যুক্তি। বলাবাহুল্য উপনিবেশকারীরা নিজেদেরই ‘সভ্য’ ও ‘অগ্রসর’ গণ্য করত। সেই অগ্রসরতা বা সভ্যতা প্রমাণের জন্য কলোনির জনগণকে অসভ্য ও বর্বর প্রমাণ করাটাই ছিল যৌক্তিক ও স্বাভাবিক। সভ্যতার মিশনের প্রধান দাবি ছিল জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস। কলোনির সংস্কৃতি ও জীবন ব্যবস্থার বিপরীতে ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে উচ্চতর বলে গণ্য করা হয়েছিল, অতএব কলোনির জনগণকে ইউরোপীয় সভ্যতার স্তরে পৌঁছানোর জন্যই উপনিবেশ স্থাপনকে দরকারি কাজ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

‘সভ্যতার মিশন’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণকে ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক শক্তির প্রধান দায় ও কর্তব্য হচ্ছে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার স্থানীয় বর্বর অধিবাসীদের সভ্য করা, অধর্ম থেকে উদ্ধার করে তাদের যিশুর ধর্মে ধর্মান্তরিত করা এবং তাদের শিক্ষা দেওয়া, যেন তারা ইংরেজের মতো ভাবতে পারে। কলোনির লুটতরাজ ও অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর কলোনিয়াল শাসন কায়েমের পক্ষে ‘সভ্যতার মিশন’ ছিল গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি। জে আর সিলি (J R Seeley) The Expansion of England বইয়ে যুক্তি দিয়েছেন অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে শাসন করার জন্য কেন ইংরেজই সবচেয়ে উপযুক্ত জাতি (Seeley 1883)।

জে আর সিলি ও সভ্যতার মিশন তত্ত্বের সমর্থকরা জন ওয়াল্টার দ্বিতীয় এবং তার ছেলে জন ওয়াল্টার তৃতীয়ের পত্রিকা The Times-এ লিখতেন। পত্রিকার প্রতাপ ও প্রভাব কার্কর রাখার ক্ষেত্রে ওয়াল্টার পরিবারের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ১৮০৩ থেকে ১৮৪৭ তারিখ অবধি জন ওয়াল্টার দ্বিতীয় পত্রিকার ব্যবস্থাপনায় ছিলেন, এরপর জন ওয়াল্টার তৃতীয় ১৮৯৪ সাল অবধি পত্রিকা চালান। পাশাপাশি জে আর সিলির বই প্রকাশ করত ড্যানিয়েল ও আলেক্সান্ডার ম্যাকমিলান পরিবারের ম্যাকমিলান পাবলিশার। সিলির বিখ্যাত বই The Expansion of England ছাপা হয় ১৮৮৩। দ্য টাইমস এবং ম্যাকমিলান ইংরেজ বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকদের চিন্তা প্রকাশ, প্রচার ও ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ঔপনিবেশিক শক্তি ঔপনিবেশিকতাকে ন্যায্য এবং পদানত জনগোষ্ঠীর জন্য মঙ্গল বলে ক্রমাগত প্রচার করেছে। অসভ্য বা বর্বরদের সভ্য করার উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তি দিয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঔপনিবেশিক বয়ান ও প্রোপাগান্ডা সে ক্ষেত্রে খুবই সফল। এ সফলতা আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে কলোনির গণমানসে এত গভীর ও প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, আমরা সম্পর্কে বাতচিত করি বটে, কিন্তু আসলে আমাদের মধ্যে গেড়ে বসা ‘সভ্যতার মিশন’ তত্ত্ব কত গভীর ও দুরারোগ্য সে সম্পর্কে আমরা আদৌ সচেতন ও সজ্ঞান নই। দীর্ঘ ও কঠিন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক বি-উপনিবাশয়নের লড়াই ছাড়া নিজেদের ইতিহাস নির্মাণের জন্য নিজেদের স্বাধীন কর্তা হিসেবে তৈরি এবং বিশ্ব ইতিহাসে প্রবেশ সম্ভব নয়। ঔপনিবেশিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা আমাদের এত গভীরভাবে প্রোথিত যে ‘সভ্যতা/অসভ্যতা’, ‘শিক্ষা/অশিক্ষা’, ‘আধুনিকতা/অনাধুনিকতা, ‘প্রগতি/পশ্চাৎপদতা’ ইত্যাদি বাইনারি ঔপনিবেশিক ইংরেজ বা ইউরোপকে আদর্শ জ্ঞান করেই আমরা ভাবি। অর্থাৎ ইংরেজ বা ইউরোপ সভ্য, আধুনিক ও অগ্রসর, আমরা অসভ্য, বর্বর ও পশ্চাৎপদ। অতএব আমাদের অগসর হতে হলে ইউরোপকেই, কিংবা সাম্রাজ্যবাদী যুগে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি ও জীবন ব্যবস্থাকেই আদর্শ হিসেবে মানতে হবে।

এই ঔপনিবেশিক কালপর্ব আমরা মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা সাংস্কৃতিকভাবে অতিক্রম করেছি বলা যাবে না। আমাদের জাতিবাদী বয়ানে ‘বাঙালি’ হওয়া আপাদমস্তক রোমান্টিক কিংবা যা আমরা আর কখনোই হব না বা হতে চাই না তার জন্য মধুর হাহাকারের অধিক কিছু না। আমরা মনে মনে নিশ্চিত সেটা আর সম্ভব নয়। আমাদের পাশ্চাত্য প্রীতি হচ্ছে মেরেছ কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেব না জতীয় বৈশ্বিক আখ্যান। তাই কলোনিয়ালিজমবিরোধী জাতিবাদী বয়ান আমাদের বাহ্যিক রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছে কিন্তু মর্মে রয়েছে নিজেদের ইংরেজ বা ইউরোপীয় করে তোলার বাসনা। সভ্য হওয়া মানে ইংরেজ বা ইউরোপীয় হওয়া। কলোনির গণমানসে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়ে রয়েছে তার চিকিৎসা অত সহজ নয়। জনসাধারণের ধ্যান-ধারণা পরিগঠনের মধ্য দিয়েই গণমাধ্যম ঔপনিবেশিকতা এবং সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে অনুকূল মনোভাব সৃষ্টি করেছে। সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া এবং ঔপনিবেশিক নীতি, মতাদর্শ ও আইনকে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

‘সভ্য করার মিশন’র আসলেই একটি অপ্রতিরোধ্য কেন্দ্রীয় ঔপনিবেশিক প্রকল্প। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বারা অ-ইউরোপীয় সমাজে উপনিবেশ এবং অ-ইউরোপীয়দের ওপর আধিপত্য কায়েম ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। এই মতাদর্শটি দাবি করে তথাকথিত ‘অনগ্রসর’ জনগণের কাছে সভ্যতা, অগ্রগতি এবং ‘আলোক’ বিতরণ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির দায়িত্ব। ইউরোপীয় উপনিবেশকারীরা তাদের প্রচেষ্টাকে খ্রিষ্টধর্ম এবং পাশ্চাত্য মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ ধার্মিক প্রচেষ্টা গণ্য করে। উপনিবেশ স্থাপন ছিল ধর্ম প্রচারের জন্য জরুরি। উপনিবেশের জনগণের প্রতি ধর্মীয় দরদের মধ্যেও জনগণকে শিশু, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং স্বশাসনে অক্ষম হিসেবে পর্যবসিত করা হয়। সেই দরদের যুক্তিতে পরাধীন জনগোষ্ঠীর অভিভাবক হয়ে তাদের উপকার করার বাসনাও সিভিলাইজিং মিশনের অন্তর্গত। ঔপনিবেশিক পরোপকার ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার পক্ষে বয়ান তৈরি এবং ঔপনিবেশিক শক্তিকে ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা মাত্র (Thomas 1994)।

ঔপনিবেশিক শক্তি ইউরোপের বাইরে সভ্যতা বিতরণ করেছে এই অনুমান থেকে কার্ল মার্ক্সও পুরোপুরি মুক্ত ছিলেন না। তবে একে অনেকে যেভাবে ‘ইউরোকেন্দ্রিকতা’ (Eurocentrism) বলে থাকেন, বিষয়টি অত সরল নয়। অনড় ‘বর্বর’ জনগণকে ঔপনিবেশিক শক্তি ‘সভ্য’ করেছে সেটা মার্ক্সের দাবি ছিল না। মার্ক্স পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ককে সামন্ত বা প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক নিশ্চল অর্থনৈতিক সম্পর্কের তুলনায় গতিশীল মনে করতেন। তার দাবি, ঔপনিবেশিক শক্তির ধ্বংসাত্মক ও বিনাশী কর্মকাণ্ড উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর গতিহীন সমাজকে সচলতা দিয়েছে। এখানে যে দার্শনিক অনুমান রয়েছে সেটা হলো ভাঙন ছাড়া নতুন কিছু গড়ে তোলা অসম্ভব। এশীয় সামন্ত ব্যবস্থা ভেতর থেকে নিজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে না ভাঙলেও বাইরের ঔপনিবেশিক শক্তি সেই ভাঙাগড়া সম্পন্ন করেছে। ঔপনিবেশিকতার মধ্যে যে প্রগাঢ় ধারণা বদ্ধমূল যে কলোনির অ-ইউরোপীয় সমাজগুলো নিজ শাসনে অক্ষম, ফলে ইংরেজ বা ইউরোপীয়রা তাদের শাসক হবে এটা যৌক্তিক ও ন্যায্য—এটা মার্ক্সের দাবি ছিল না। এই ঔপনিবেশিক মানসিকতা প্রবলভাবে এখনো বাংলাদেশের মতো প্রাক্তন ব্রিটিশ কলোনিতে রয়েছে। তার প্রকাশটা ইন্টারেস্টিং। যেমন, শ্রেণি নির্বিশেষে আমরা মনে করি, আমরা আমাদের দেশ কিংবা রাষ্ট্র নিজেরা গঠন করতে পারব না। এমনকি আমাদের নির্বাচনও ঠিকভাবে করতে হলে বিদেশি সহায়তা লাগবে। আমরা পারব না, তবে যুক্তরাষ্ট্র এসে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ঠিক করে দেবে, কেবল তখন আমরা ফ্যাসিস্ট শাসক ও রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাব।

পর্তুগিজ ব্রিটিশ এবং ফরাসিরা ছিল কয়েক কাঠি চড়া। তারা খ্রিষ্টধর্ম প্রচার এবং বর্বরদের পাপ থেকে উদ্ধারে ক্ষেত্রে প্রবলভাবেই নিয়োজিত ছিলেন এবং পশ্চিমা নৈতিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়াকে তাদের ধর্মীয় দায় গণ্য করতেন। কলোনির মানুষগুলোকে আদিপাপ থেকে মুক্তি দেওয়া খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি পালন ভাবা হতো (Thomas 1994)।

জাতিগত ও সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস ছিল ঔপনিবেশিক ন্যায্যতার আরেকটি ভিত্তি। পাশ্চাত্য গণমাধ্যমগুলো অ-ইউরোপীয় জনগণকে বর্ণগতভাবে নিকৃষ্ট এবং সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চাৎপদ গণ্য করত এবং সেভাবেই গণমাধ্যমে তাদের হাজির করা হতো। এ দাবিগুলোর পক্ষে ছদ্ম বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও যুক্তিতর্কও ব্যবহার করা হতো।

অনেক মিডিয়া সামাজিক ডারউইনবাদকে তাদের যুক্তির পক্ষে ব্যবহার করত। এর দ্বারা অনায়াসেই প্রমাণ করা যেত যে, ইউরোপীয় আধিপত্য আসলে ‘যোগ্যতমের বেঁচে থাকার’ অতি স্বাভাবিক এবং অনিবার্য পরিণতি। যারা প্রতিযোগিতায় পাশ্চাত্যের সঙ্গে পারছে না বা হেরে গেছে তারা পাশ্চাত্যের অধীনতা মেনে নেবে এটাই স্বাভাবিক (MacKenzie 2003)।

এ ছাড়া কৌশলগত এবং জাতীয় নিরাপত্তা ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণকে ন্যায়সংগত প্রমাণের প্রয়াস সবসময়ই ছিল। পাশ্চাত্য গণমাধ্যমগুলো জাতীয় স্বার্থরক্ষা এবং বৈশ্বিক শক্তি নিশ্চিত করতে সাম্রাজ্য রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণের গুরুত্বের ওপর সবসময়ই জোর দিয়েছে। স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবসময়ই পাশ্চাত্য গণমাধ্যম অপরিহার্য হিসেবে চিত্রিত করেছে (Gallagher and Robinson 2024)।

ঔপনিবেশিকতাকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য এক্সপ্লোরার বা অনুসন্ধানমূলক মিশন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা পাশ্চাত্য গণমাধ্যমগুলো সবসময়ই ব্যবহার করেছে। গণমাধ্যমের আকর্ষণীয় রিপোর্টগুলো সবসময়ই নতুন দেশ বা মহাদেশের আবিষ্কারক, অভিযাত্রী ও বিজ্ঞানীদের মহিমান্বিত করেছে। কারণ এর সঙ্গে নতুন ভূমি ‘আবিষ্কার’ জড়িত। যেসব ভূমি ঔপনিবেশিক শক্তি নিজের দখলে নিতে পারে এবং জনগোষ্ঠীকে ঔপনিবেশিক শক্তির পদানত করা যায়। স্থানীয় অধিবাসীদের পরাধীন করারা কার্যকলাপ বা প্রক্রিয়াকে অনেক সময় জ্ঞানের মহৎ সাধনা হিসেবে হাজির করা হয়েছে। পাশ্চাত্য গণমাধ্যম অভিযাত্রী ও বিজ্ঞানীদের অবদানকে সবসময়ই এ যুক্তিতে উদযাপন করে যে, ঔপনিবেশিকতা গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়কে সম্ভব ও সহজ করে তুলেছে। সাহিত্য এবং রাজনৈতিক কার্টুনগুলো উপনিবেশিত জনগণকে একটা স্টেরিওটাইপে হাজির করে, যাতে তাদের নিকৃষ্ট ও অসভ্য হিসেবে চিত্রিত করা যায়। এর উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে শক্তিশালী করা। ঔপনিবেশিক পণ্যের বিজ্ঞাপনগুলোও এমনভাবে করা হতো যেন উপনিবেশগুলোতে ইউরোপীয় উপস্থিতির কারণে পরাধীন জাতি সভ্যতার সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারছে। সাহিত্যকর্ম এবং রাজনৈতিক কার্টুনগুলো প্রায়ই উপনিবেশিত জনগণকে স্টেরিওটাইপিক্যাল এবং অবমাননাকর উপায়ে চিত্রিত করে, যা ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা শক্তিশালী করে (Said 2003)।

ঔপনিবেশিক আমলে বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে ঔপনিবেশিকতাকে ন্যায্যতা ও বৈধতা দিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ঔপনিবেশিকতাকে সভ্যতার মিশন হিসেবে প্রণয়ন করা, অর্থনৈতিক সুবিধার ওপর জোর দেওয়া, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাগুলো প্রচার করা এবং কৌশলগত প্রয়োজনীয়তাগুলো হাইলাইট করার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম সাম্রাজ্যবাদী নীতিগুলোর জন্য জনসমর্থন তৈরি এবং বজায় রাখতে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। গণমাধ্যম আগে যেমন, তেমনি এখনো ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে জনমত গঠন ও জনমত প্রভাবিত করতে ভূমিকা রাখে।

ঔপনিবেশিক আমলে পাশ্চাত্য গণমাধ্যমে উপনিবেশিত অঞ্চলগুলোকে অদ্ভুত, রহস্যময়, রহস্যে ঘেরা বা ‘এক্সোটিক’ দেশ হিসেবে হাজির করার পেছনেও ঔপনিবেশিক বাঞ্ছা কাজ করেছে। যার মতলব ছিল, এ দেশগুলোর রহস্যভেদ করার জন্য দেশগুলোতে অভিযান চালানো দরকার। উপনিবেশিত দেশগুলোতে ‘পশ্চাৎপদ’ হিসেবে চিত্রিত করার উদ্দেশ্যও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর দ্বারা হস্তক্ষেপ ন্যায্য প্রমাণ করার যুক্তি। এডওয়ার্ড সাঈদ তার বিখ্যাত ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে পশ্চিমা গণমাধ্যম প্রাচ্যের এমন এক চিত্র আঁকে, যার উদ্দেশ্য পাশ্চাত্যের আধিপত্যকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করা (Said 2003)। পাশ্চাত্য গণমাধ্যমের রাজনৈতিক কার্টুন এবং সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনের বিজ্ঞাপনগুলো প্রায়ই বর্ণবাদী ব্যঙ্গচিত্রের অধিক কিছু হয়ে উঠতে পারে না। প্রাচ্য সম্পর্কে পাশ্চাত্যের স্টেরিওটাইপ ধারণা তৈরির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশ্চাত্যের বাইরের জনগণ নিকৃষ্ট এবং পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং শাসন গ্রহণ করা ছাড়া তাদের মুক্তির আর কোনো পথ নাই—এ ধারণা বদ্ধমূল করে তোলার পাশ্চাত্যের গবেষণা, সাহিত্য ইত্যাদির পাশাপাশি গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে খ্রিষ্টান মিশনারিদের রিপোর্ট এবং জার্নালগুলোও বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষত যখন মিশনারি প্রকাশনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ‘বর্বর’ অবস্থা তুলে ধরা হয় এবং তাদের ওসেই হাল থেকে উদ্ধারের জন্য পশ্চিমা ধর্মীয় খ্রিষ্টীয় শিক্ষা এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষাকেন্দ্রিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়। বিশ শতকের গোড়ার দিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র এবং রেডিও প্রোগ্রামগুলোতে প্রায়ই দাবি করা হতো যে, ঔপনিবেশিক শক্তির একটি নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে ঔপনিবেশিকতার অধীন জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত এবং উন্নীত করা। এটা ছিল উপনিবেশবাদকে ন্যায্য প্রমাণের খুবই জনপ্রিয় একটি যুক্তি (Comaroff and Comaroff 1991)।

ঔপনিবেশিক দেশগুলোর গণমাধ্যমগুলো প্রায়ই নিজ দেশের জন্য উপনিবেশবাদের অর্থনৈতিক সুবিধা তুলে ধরেছে (Gallagher and Robinson 2024)। উপনিবেশ থেকে অর্জিত সম্পদ এবং সম্পদের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। যুক্তি দেখিয়েছে উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য উপকারী (Curtin 1964)। ঔপনিবেশিক দেশগুলোর প্রবন্ধ এবং সম্পাদকীয়গুলো প্রায়ই দাবি করেছে জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির জন্য কৌশলগতভাবে উপনিবেশ অপরিহার্য। কিংবা সাম্রাজ্য বজায় রাখা এবং সম্প্রসারণ করা জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় (Hobson 2018)।

উপনিবেশ বা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম জাতিবাদী বয়ান তৈরিতে ভূমিকা রাখেনি তা নয়, কিন্তু সেটা বাহ্যিক আধিপত্য থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে নিজেরাই নিজেদের ঔপনিবেশিক ‘সভ্যতার মিশন’ জারি বা কায়েম রাখা মাত্র। শুরুর দিকে দুর্বল, সংকীর্ণ ও প্রান্তিক থাকলেও উপনিবেশবিরোধী জাতীয় সংগ্রাম দানা বেঁধে ওঠার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে, নতুন জাতিবাদী শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে এবং ঔপনিবেশিকতার রাজনৈতিক ইতিহাস বদলে গিয়েছে। জাতিবাদ উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু ‘সভ্যতার মিশন’ স্বয়ং সফল করার দায় জাতিবাদীরা জেনে বা না জেনে নিজের কাঁধে নিজে বহন করে চলেছে।

নৃবিজ্ঞান, ভ্রমণ সাহিত্য এবং সরকারি নীতি পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে ইতিহাস বিচার করলে দেখা যায় বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ, সংস্কৃতি এবং ঔপনিবেশিকতার মধ্যে সম্পর্ক আমরা যত সরল ভাবি, সেটা মোটেও তেমন সরল নয়। ঔপনিবেশিকতা নিছকই একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ ছিল না বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রকল্পও বটে। ফলে ঔপনিবেশিক শাসন কলোনিয়াল শক্তিকে যেমন, তেমনি উপনিবেশবিরোধী চিন্তা, সংস্কৃতি ও শক্তিকেও রূপ দিয়েছে। উপনিবেশকারী এবং উপনিবেশের ভিকটিম উভয়কেই গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

নিকোলাস টমাস এদিকটার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। সংস্কৃতি ছিল যুগপৎ ঔপনিবেশিকতার হাতিয়ার এবং ফলাফল। উভয়ই। ঔপনিবেশিকতার প্রক্রিয়া পরাধীন জাতির ওপর ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি আরোপ করার মধ্য দিয়ে উপনিবেশবিরোধী কর্তাসত্তাও পয়দা করেছে। বাংলাদেশে আমরা আমাদের জাতীয়বাদসহ চিন্তা চেতনায় ঔপনিবেশকতারই ফল। হাইব্রিড সংস্কৃতি কিংবা জাতিবাদী চেতনা দ্বারা একে পুরোপুরি বোঝা যাবে না। উপনিবেশবিরোধী জাতিবাদসহ ঔপনিবেশিকতা বৈশ্বিক ইতিহাসের অন্তর্গত প্রক্রিয়া। চরম উপনিবেশ বিরোধিতার পরও আমরা চেতনা, বুদ্ধি ও সাংস্কৃতিকভাবে ইংরেজের ঔরসজাত।

ঔপনিবেশিক শাসন মজবুত ও জারি রাখার ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। নৃতাত্ত্বিকদের কাজ ঔপনিবেশিক প্রশাসকদেরই ক্ষমতা প্রয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কাজে আসত। নৃতত্ত্ব আদিতে ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে আদিবাসীদের রীতিনীতি, সামাজিক কাঠামো এবং বিশ্বাস ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য ও খোঁজখবর দেওয়ার চর্চা। পরাধীন জনগোষ্ঠীর খোঁজখবর নেওয়া, গবেষণা-বিশ্লেষণ করা, নৃতাত্ত্বিক জ্ঞান-গরিমা প্রচারের দ্বারা ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে পরাধীন জনগোষ্ঠীকে পরাধীন রাখার ফন্দি-ফিকির তৈরিতে সহায়তা করার চর্চা থেকেই নৃতত্ত্বের জন্ম। এর দ্বারা ঔপনিবেশিক শক্তি আরও কার্যকরভাবে পরাধীনদের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে সক্ষম হয় (Pels and Salemink 2000)। কলোনির জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মাচার ইত্যাদি জেনে সেসবের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে কলোনিয়াল শাসনের রূপ তৈরি হয়েছিল। প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ শাসনের নীতি ও কৌশল কখনো বিদ্যমান স্থানীয় কাঠামোর মাধ্যমে কিংবা কখনো তাদের তার সংস্কারের মধ্য দিয়ে প্রণীত হতো। অর্থাৎ ঔপনিবেশিকতা একপক্ষীয় প্রক্রিয়া মাত্র ছিল না। ঔপনিবেশিক সম্বন্ধের টানাপোড়েনের মধ্যে উভয়পক্ষেরই রূপান্তর ঘটছিল।

সাম্রাজ্যবাদ, গণমাধ্যম ও ভূরাজনীতি

সাম্রাজ্যবাদের যুগে উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে, মার্কিন সংবাদপত্র, সাম্রাজ্যবাদী উদ্যোগ সমর্থন জানিয়েছিল। যেমন স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ। উইলিয়াম র‍্যান্ডলফ হার্স্টের (William Randolph Hearst) মালিকানাধীন পত্রিকাগুলো খোলাখুলিই সেটা করেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ নিপীড়িত জনগণকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা রাখে এটা প্রমাণ করা প্রধান গণমাধ্যমগুলোর প্রধান মতাদর্শিক কর্তব্য হয়ে উঠেছিল (Kinzer 2007)।

জনমত গঠন করতে এবং তার সাম্রাজ্যবাদী প্রচেষ্টা ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য প্রচারকে ইংরেজরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল। ইংরেজ ‘সভ্য শক্তি’ এবং উপনিবেশের জনগণের ভালো করার জন্যই এসেছে, এ প্রচারের দ্বারা ঔপনিবেশিক ইংরেজ তাদের শাসনকে ন্যায্য প্রমাণ করতে চেয়েছে। সেই ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল প্রধান। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ধারণাকে একটি হিতৈষী এবং সভ্য শক্তি হিসেবে প্রচার করার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে গণমাধ্যমে প্রচার ছিল অন্যতম। ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও কর্মের জন্য জনসমর্থন অর্জন ছাড়া ব্রিটিশ শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা যেত না (MacKenzie 2003)। উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদ শ্বেতাঙ্গদের একটি নৈতিক দায়িত্ব এবং ‘সভ্যতার মিশন’। তবে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সাম্রাজ্যপন্থি বার্তা প্রচারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। স্কুলের পাঠ্যক্রমে সাম্রাজ্যের ইতিহাস, ভূগোল এবং উপনিবেশপন্থি বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বই ও শিশু সাহিত্য সবসময়ই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ইতিবাচকভাবে হাজির করেছে। দুঃসাহসিক গল্প এবং ভ্রমণ কাহিনি ঔপনিবেশিক শোষণ ও বসতি স্থাপনকারীদের মহিমা প্রকাশ করেছে এবং সৈন্যদের জীবন রোমান্টিক আখ্যান দান করেছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রদর্শনী ও মেলার ভূমিকা ছিল। সাম্রাজ্য প্রদর্শনী, উপনিবেশের সম্পদ এবং বৈচিত্র্য প্রদর্শন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্জনগুলো প্রদর্শন করার মধ্যে একদিনে পরাধীন জনগোষ্ঠীর মনে হীনম্মন্যতা তৈরি এবং অন্যদিকে সাম্রাজ্যের মহিমা প্রতিষ্ঠা ছিল কলোনিয়াল শাসন আকর্ষণীয় ও বৈধ করার গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ও পদক্ষেপ। পোস্টার, পেইন্টিং এবং চলচ্চিত্রগুলোও সাম্রাজ্যবাদী প্রচেষ্টাকে মহিমান্বিত করতে ভূমিকা পালন করেছিল। গণমাধ্যমের প্রচারণা ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তর্নিহিত শোষণ ও সহিংসতার চেহারার ওপর মুখোশ পরিয়ে দেয়। ঔপনিবেশিকতার একটা সাফ চেহারা বা আদর্শিক চিত্র হাজির করে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জুমার দিন মসজিদে এসে যে ৩ কাজ ভুলেও করবেন না

২৯ আগস্ট : আজকের নামাজের সময়সূচি

যারা অত্যাচার-নির্যাতন করেছে তাদের বিচার হতেই হবে : হুম্মাম কাদের

স্বাস্থ্য পরামর্শ / চোখের লাল-জ্বালা: এডেনোভাইরাল কনজাঙ্কটিভাইটিসের প্রাদুর্ভাব

ইতালিতে ‘ও লেভেল’ পরীক্ষায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অভাবনীয় সাফল্য

সাবেক এমপি বুলবুলের পিএস সিকদার লিটন গ্রেপ্তার

টাকা না পেয়ে ফুপুকে গলাকেটে হত্যা করল ভাতিজা

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে নারীদের জন্য বিশেষ কোটা বাতিল 

আন্তর্জাতিক ফেলোশিপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ছাত্রদলের ঊর্মি

স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরেছেন খালেদা জিয়া

১০

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারের মায়ের মৃত্যুতে প্রেস ক্লাবের শোক

১১

প্রকৌশলীদের মর্যাদা রক্ষায় আইইবির ৫ দফা দাবি

১২

পুলিশের গাড়িতে হামলা চালিয়ে আসামি ছিনতাই

১৩

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগপর্বের ড্র অনুষ্ঠিত, রিয়াল-বার্সার প্রতিপক্ষ কারা?

১৪

সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ভিডিওটি ভুয়া

১৫

আজীবন থাকা, কাজ ও ব্যবসার সুযোগ দেবে সৌদি, কত টাকা লাগবে

১৬

ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক

১৭

এবার যুক্তরাজ্য থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের 

১৮

ফিফা কোয়ালিফায়ারে শেষবারের মতো নামছেন মেসি, জানালেন নিজেই

১৯

অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে রেখে স্বাস্থ্যকর্মীর টিকটক, অতঃপর...

২০
X