আমজাদ হোসেন হৃদয়
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৫, ০৮:১৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর বাইরে আন্দোলন সংগঠিত করা ছিল চ্যালেঞ্জ

রাজধানীর বাইরে আন্দোলন সংগঠিত করা ছিল চ্যালেঞ্জ

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান শুধু ঢাকার রাজপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ঢাকার বাইরে জেলার পর জেলা আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাজধানীর বাইরে এ আন্দোলন সংগঠিত করতে সমন্বয়কদের পড়তে হয়েছিল নানান চ্যালেঞ্জে। প্রশাসনের কড়া নজরদারি, স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের হুমকি—সবকিছুই আন্দোলনের গতি মন্থর করছিল। তবুও সমন্বয়করা থেমে থাকেননি। নিজের জীবন বাজি রেখে আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন তারা।

রাজধানীর ঢাকার বাইরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা একাধিক সমন্বয়কের সঙ্গে কথা বলেছে কালবেলা। তাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ‘অনেক এলাকায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও গ্রেপ্তার আতঙ্ক বেশি ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছেন স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। তবুও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্থানীয় সংগঠনগুলো মিলিত হয়ে ধীরে ধীরে কৌশলে আন্দোলনের শক্ত ভিত গড়ে তোলেন তারা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগরী

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক মাহফুজুর রহমান। তার ক্যাম্পাস ও নগরীর মধ্যে আন্দোলনের সমন্বয় গড়ে তোলার কথা জানান তিনি। মাহফুজুর বলেন, ‘৬ জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যমূলক কোটা বাতিলের দাবিতে আমাদের আন্দোলন শুরু হয়। শুরুতে ছাত্রলীগের দখলদারত্বের রাজনীতি ও ফেসবুক পেজ-গ্রুপ নিয়ন্ত্রণের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হতে ভয় পেতেন। আমরা নতুন ফেসবুক গ্রুপ খুলে এবং অফলাইনে প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করি। ৪ জুলাই পর্যন্ত ক্যাম্পাসে আন্দোলন চললেও, ওইদিন রাতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে আন্দোলন জোরদার সম্ভব নয়। এরপর শহরের বিভিন্ন কলেজ-প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার উদ্যোগ নিই। ৮ জুলাই থেকে চবি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হুমকি ও হয়রানি শুরু হয়। ১১ জুলাই পুলিশ টাইগার পাসে হামলা করলে আমরা অন্যান্য ছাত্রসংগঠনকে আন্দোলনে যুক্ত করার জন্য যোগাযোগ করা শুরু করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘১৪ জুলাই রাতে ছাত্রলীগের হামলা পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। আমরা নিজেদের সাধ্যমতো আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের শহরে থাকার ব্যবস্থা করি। ১৬ জুলাই মুরাদপুরে সংঘর্ষে তিন আন্দোলনকারী শহীদ হন। এরপর থেকে আন্দোলনকারীদের গণগ্রেপ্তার ও ইন্টারনেট শাটডাউন শুরু হয়। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও আমরা কারফিউ ভেঙে বিক্ষোভ চালিয়ে যাই। ডিবির পক্ষ থেকে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি প্রত্যাখ্যান করে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিই। ৩১ জুলাই কোর্ট বিল্ডিংয়ের মার্চ ফর জাস্টিস ও ২ আগস্ট আন্দরকিল্লায় বিক্ষোভ মিছিল গণঅভ্যুত্থানের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ৩-৪ আগস্ট নিউমার্কেট চত্বরে হাজারো মানুষের জমায়েত হয়। তবে শুরুতে আন্দোলন সংগঠিত করা ছিল আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগরী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক মিশকাত চৌধুরী মিশু। তৎকালীন সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করলে শিক্ষার্থীরা অনেকেই হল ও মেস ছাড়তে শুরু করেন। ফলে শিক্ষানগরীখ্যাত রাজশাহীতে আন্দোলন জমানো ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

মিশু বলেন, ‘রাজশাহী মূলত শিক্ষানগরী হিসেবেই পরিচিত। ১৬ জুলাইয়ের পর যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই ক্যাম্পাস ছেড়ে দেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেস এবং বাসায় ধরপাকড় চালানোর কারণে শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই রাজশাহী ছেড়ে দেন। ফলে কারফিউর সময়গুলোয় স্থানীয় অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা আন্দোলন আবারও গড়ে তুলি। আবার বিশ্ববিদ্যালয় শহর থেকে কিছুটা বাইরে হওয়ায় অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ছাত্র-জনতার সঙ্গে সমন্বয় করে রাস্তায় দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। আবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেসব শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নিতে আসতেন, তাদের শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের ধরে হতাহত করছিল, ওই সময়টাতে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধীরে সেই সংকট কাটিয়ে উঠি আমরা।’

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগরী

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠক জারিফ আল হেলাল। বিশ্ববিদ্যালয় ও জুলাই আন্দোলনে প্রথম আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর আন্দোলনের গতি প্রবল হয়ে ওঠে। তবে এর আগে আন্দোলনেকে ত্বরান্বিত করতে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আহ্বান করেছেন তারা।

জারিফ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ১৬ জুলাইয়ের পূর্বে আমরা ক্যাম্পাসে অনলাইন, অফলাইন প্রচারণা চালিয়েছি। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছি। আর ১৬ জুলাই আবু সাঈদ ভাই শহীদ হওয়ার পর রংপুরের মানুষ ধীরে ধীরে রাজপথে নেমে এসেছিল। মাঝখানে আন্দোলন কিছুটা স্থবিরতা এলে রংপুর শহর ও আশপাশের মানুষের বাসায় গিয়ে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে রাজপথে নামার জন্য আহ্বান করতে হয়েছিল। ফলে রংপুরে নারী, শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষ শত বাধার মধ্যেও আমাদের ডাকে সারা দিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল।’

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সম্মুখযোদ্ধা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুখলেসুর রহমান সুইট গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাকে বারবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্দোলন থামানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। ঢাকার কয়েকজন সমন্বয়ক যখন গ্রেপ্তার হন, তখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। নিরাপত্তাজনিত কারণে আমি কোন বাসায় থাকি তা গোপন রাখা হতো এবং পুলিশ যেন লোকেশন বের করতে না পারে, সে জন্য ফোনে নতুন নতুন সিম ব্যবহার করতাম। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকায় আমাকে প্রশাসনের লোকজন খুঁজতে থাকে। তবে ঝুঁকি নিয়েও প্রতিদিনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। একটা ব্যাগে কিছু কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে কয়েকদিনে কয়েক জায়গায় লোকেশন বদলেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ জুলাই মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে হল বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী সবাই যার যার মতো বাসায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে অনেকেই আন্দোলনের গুরুত্ব বুঝে আশপাশের ছাত্রাবাসে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের নিয়েই আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলাম। যেহেতু পরবর্তী সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, আমরা আর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছাতে পারছিলাম না। তাই মোবাইল ফোনে যাদের কাছে পারতাম আন্দোলনের মেসেজ দিয়ে দিতাম। তারা বাকি শিক্ষার্থীর কাছে সেই মেসেজ পৌঁছে দিত।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কালকিনি রিপোর্টার্স ইউনিটির নবনির্বাচিত কমিটি ঘোষণা

মৃধা আলাউদ্দিন / কবিতায় জেগে ওঠা নতুন চর...

মাকে লাঞ্ছনার অভিযোগ তোলে যা বললেন আমির হামজা

নেতারা কেন মন্ত্রণালয় ছাড়েননি, ব্যাখ্যা দিলেন জামায়াত আমির

নিপীড়িত ও দুর্বলের জন্য ইসলাম একটি পরীক্ষিত শাসনব্যবস্থা : চরমোনাই পীর

বাউল গানে লন্ডন মাতালেন শারমিন দিপু

‘হ্যাঁ’ ‘না’ ভোটের প্রচার চালাতে পারবেন না সরকারি কর্মকর্তারা : ইসি

নিজের বহিষ্কারের খবরে ইউপি চেয়ারম্যানের মিষ্টি বিতরণ

গুনে গুনে ৮ বার ফোন, জয় শাহকে পাত্তাই দিলেন না পিসিবি চেয়ারম্যান!

জীবন কানাই দাশের মায়ের মৃত্যু

১০

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এক প্রার্থীকে বহিষ্কার

১১

গণতন্ত্রের উত্তরণে বাধা দিলে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করবে : সালাহউদ্দিন আহমদ

১২

পদত্যাগের খবর, যা বললেন গভর্নর

১৩

তারেক রহমানের পক্ষে ভোট চাইলেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা

১৪

থাইল্যান্ডে সামরিক বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ২

১৫

ইসলামের পক্ষে একমাত্র হাতপাখাই ভরসা : চরমোনাই পীর

১৬

বেপর্দা নারীদের সঙ্গে সেলফি তোলেন জামায়াত আমির : চরমোনাই পীর

১৭

বিশ্বকাপ ইস্যুতে অবশেষে নীরবতা ভাঙল শ্রীলঙ্কা

১৮

পাবনায় নকল দুধ তৈরির কারখানার সন্ধান, অভিযানে আটক ৩ 

১৯

স্ত্রীসহ জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে র‍্যালি করলেন ববি হাজ্জাজ

২০
X