

হাসপাতালের পার্কিংয়ে পার্ক করতে গিয়ে দেখি হালকাপাতলা, ছোটখাট গড়নের এক লোক নির্বিকার ভঙ্গিতে ধূমপান করছেন। ডিপার সিগনাল দেওয়ায় একটু সরে দাঁড়ালেন। কোনো মতে পাশ কাটিয়ে গাড়িটি ঢুকালাম। ফ্রন্ট ডেস্ক পার হতে গিয়ে জানলাম একজন রোগী আমার জন্য দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায়। তড়িঘড়ি চেম্বারের দিকে এগোলাম।
একটু পরে দেখি বেজমেন্টে দেখা সেই নির্বিকার ভদ্রলোক চেম্বারের দরজায়। চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসালাম। বললেন, ‘মিয়াভাই পাঠাইছে।’ এরপর বললেন, ‘ফজলু চেরাম্যানকে চেনেন?’ বুঝলাম, আমার জেলা শহরের রোগী। উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল করিম ভাই প্রায়ই রোগী পাঠান। দেখলাম হার্টরেট একটু কম। চোখের পাপড়ির জ্যানথেলেজমা বুঝিয়ে দিল উনার ডিসলিপিডিমিয়া, হাইপোথাইরয়েড দুটোই থাকতে পারে। জানালেন, তিনবার বুকে ব্যথা উঠেছে। তিনবারই উপজেলা কমপ্লেক্সে চিকিৎসা পেয়েছেন, আশার কিছু ছিল না, ঢাকা যেতে হয়েছে; যেহেতু উনার বড় ভাইও এই রোগে মারা গেছেন, তাই এবার বাধ্য হয়ে ঢাকা এসে করোনারি এনজিওগ্রাম করান। সেখানে বলেছে বাইপাস সার্জারি লাগবে। সার্জনের কথা শুনে ভয় পেয়ে গ্রামে ফিরে যান; চেয়ারম্যান সাহেব জোর করে আমার কাছে পাঠিয়েছেন।
সবকিছু শোনার পর এনজিওগ্রাম রিপোর্ট দেখে বুঝলাম—ক্রিটিক্যাল টিভিডি, অর্থাৎ হার্টের প্রধান প্রধান রক্তনালির প্রতিটিতেই ৯০ শতাংশের বেশি ব্লক। ইকোকার্ডিওগ্রাম দেখাচ্ছে হার্টের পাম্পিং ফাংশন ৩৩ শতাংশ, হার্টের বাম পাশের প্রধান কক্ষ একদম নড়াচড়া করছে না, ফুলে ঢোল হয়ে আছে, পুরো হার্টের ওয়াল নড়াচড়া কমিয়ে দিয়েছে প্রায়।
আমি উনাকে বোঝালাম, বাইপাস সার্জারি করতে হবে; কিন্তু ঝুঁকি আছে, পরীক্ষা করতে হবে। মানুষটিকে ভেঙে পড়তে দেখলাম। বললেন, ‘জীবন বেশি দিন নাই, ওষুধ লিখে ছুটি দ্যান, আমাদের গোষ্ঠীর সবাই এমনিই মরে।’ আমি লম্বা নিঃশ্বাস নিলাম, সময় লাগল বোঝাতে।
রক্তের রিপোর্ট পেয়ে বুঝলাম অনুমান সঠিক—হাইপোথাইরয়েড, কোলেস্টেরল বেশি, সঙ্গে ব্লাড সুগারও বেশি।
ভদ্রলোকের নাম বাবলু মিয়া। সঙ্গে আসা একমাত্র ছেলে বললেন, ভর্তি না করালে বাড়ি চলে গেলে তার বাবা আর আসবে না, বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করবে। হাতে থাকা টাকা শেষের দিকে। আমার মাথাটা ফাঁকা হতে শুরু করল। করপোরেট হাসপাতাল এ ধরনের রোগীর জন্য বানানো হয় না।
সাত-পাঁচ ভেবে ফোন হাতে তুলে নিলাম, ম্যানেজমেন্টের ফিন্যান্স চিফকে ফোন দিলাম। বললাম, সুরাহা করে দেন। অল্প সময় পরে উনি কার কার সঙ্গে আলাপ করে জানালেন এগিয়ে যেতে। অপ্টিমাইজেশনের পর একদিন সকালে অপারেশন শুরু করলাম।
রোগী দীর্ঘমেয়াদি ধূমপায়ী, ডায়াবেটিক এবং লো ইজেকশন ফ্রাকশন হওয়ায় খরচ একটু বেশি হলো। আত্মীয়রা টুকটুক করে কিছু টাকা জমা দিলেন। সুস্থ মানুষকে হাসিমুখে বাড়ির জন্য প্রস্তুত করলাম।
ছুটির সময় খরচের তালিকা দেখে সাহস হারালাম, ভাবলাম আর ছোট হওয়া যাবে না; এবার নিজের পকেট থেকেই ঘাটতি পূরণ করব, শত হলেও নিজের জেলার রোগী। বাবলু মিয়া নিজে হেঁটে চেম্বারে এলেন, ছবি তুললাম একসঙ্গে। বললাম, বিলের বাকি টাকা আমি দিয়ে দেব, বিলিং সেকশনে জানিয়ে দিয়েছি, নিশ্চিন্তে চলে যান। আমার হাত তুলে উনার বুকের সঙ্গে চেপে ধরে কান্না শুরু করলেন। আমি চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম, খেয়াল রাখবেন চোখের পানি দিয়ে ব্যান্ডেজ ভেজানো যাবে না, একটু হাস্যরসের সঙ্গে হাসিমুখে বিদায় দিলাম।
লাউঞ্জে এক মগ গরম কফি হাতে নিয়ে দেখছিলাম ওদের বিদায়। ফিন্যান্স চিফের ফোনে ঘোর কাটল; জানালেন, দূর থেকে সবাই দেখছিল সব কীর্তিকলাপ, বিলের বাকি অংশ পুরোটা মওকুফ করা হয়েছে। আমার মনটা শীতল হয়ে গেল, হয়তো হাতে গরম কফি থাকার কারণে চোখের কোনে কিছু গরম পানি জমা হলো। বুঝলাম না, আমি বেশি ভাগ্যবান নাকি ওই রোগা পাতলা বাবলু মিয়া।
অধ্যাপক ডা. মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ
কনসালট্যান্ট, কার্ডিয়াক সার্জারি
ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটাল