

অর্থনীতিবিদ ও লেখক ড. মাহ্বুব উল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন। পাশাপাশি ১৯৯৩-৯৭ মেয়াদে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য এবং ২০০৩-০৬ মেয়াদে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর এবং ভারতের জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ষাটের দশকে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক; স্বাধীনতার পর ন্যাপের রাজনীতিতে যুক্ত হন। বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক গতি-প্রকৃতি নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেন তিনি
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে তরুণরা। আপনিও উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দুটি গণঅভ্যুত্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ড. মাহ্বুব উল্লাহ্: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানটি সংঘটিত হয়েছে খুবই ব্যতিক্রমী ধারায়। আমরা এ দেশের ইতিহাসে যেসব গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে পরিচিত, সেসব গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটা বড় ধরনের পার্থক্য আছে। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনও ছিল একটা গণঅভ্যুত্থান। সেই অভ্যুত্থান গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তার একটা নেতৃত্বের কাঠামো ছিল। একদিকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রসংগ্রাম পরিষদ, যার সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, সেটার আহ্বায়ক ছিলেন কমরেড আবদুল মতিন। সেই আন্দোলনে বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে প্রচার-প্রচারণা হয়েছে। প্রচারণাটা শুরু হয়েছিল ৪৮ সাল থেকে। তখন এটার নেতৃত্বে ছিল তমুদ্দিন মজলিস। তমুদ্দিন মজলিসের মুখপত্র সৈনিক পত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে যথেষ্ট সাহসী প্রচার চালানো হয়েছে। এ ছাড়া নানারকম পুস্তিকাও লেখা হয়েছে। সে সময়ে সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীও একটি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন।
বড় গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করতে গেলে তার চিন্তাগত, দর্শনগত একটা পটভূমি তৈরি করতে হয়। ফ্রেঞ্চ রেভল্যুশনের পটভূমি তৈরি করেছেন বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিকরা। রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের প্রেক্ষাপট রচনা করেছিলেন সে দেশের সাহিত্যিক চিন্তাবিদরা। এভাবে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের কথা বলতে পারি। আমাদের দেশেও বাষট্টিতে একটা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সেটা ছিল মূলত শিক্ষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। সেখানেও মূলত নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্র সংগঠনগুলো। তার মধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্র শক্তি, জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন ছিল। তবে শিক্ষা আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল কলেজগুলো থেকে। বিভিন্ন কলেজের নেতৃস্থানীয় ছাত্র নেতৃবৃন্দ আইয়ুব খানের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে ছাত্রদের মধ্যে জনমত গঠন করে। একইভাবে ছয় দফা আন্দোলন, ৭ জুনের আন্দোলন এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান—সবই সংগঠিতভাবে হয়েছিল। উনসত্তরের নেতৃত্বে লাখ লাখ মানুষের সাড়া পাওয়া গিয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্বে দিয়েছে, তারা কোনো সংগঠিত দলের লোক ছিল না। কোনো সংগঠিত ছাত্র সংগঠনেরও নয়। এরা এক ধরনের নেতৃত্ব—যেটা ছাত্রদের মধ্য থেকে বা সমাজ থেকেই বেরিয়ে এসেছে। তারা একপর্যায়ে পরিচিত হলো সমন্বয়ক হিসেবে। তারা যে আন্দোলনটা শুরু করেছিল, তার কর্মসূচি উনসত্তরের এগারো দফার মতো পরিপূর্ণ আর্থসামাজিক কর্মসূচি বলতে যা বোঝায়, সেই ধরনের কর্মসূচিও ছিল না। তারা একটা ছোট্ট দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল। তা হলো, কোটা পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে। এর বিপরীতে যখন নানা টালবাহানা করছিল তৎকালীন সরকার, এরকম অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলন ব্যাপক ছাত্রদের সমর্থন পায়। এরকমই একটা সময়ে শেখ হাসিনা মন্তব্য করলেন যে, ‘কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’ অর্থাৎ তিনি আন্দোলনকারীদের রাজাকার বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেন। এতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাল এবং সেদিন রাতেই বিপুল শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসে। তারপরের কাহিনি আমরা সবাই জানি। শত শত লোক নিহত হয়েছে। কেউ বলেন চৌদ্দশ, কেউ বলেন দুই হাজার মানুষ মারা গেছে। বিশ থেকে ত্রিশ হাজার মানুষ আহত হয়েছে। এ রক্তপাতই আন্দোলনটা একেবারে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গেছে। সেটা তখন একদফার আন্দোলনে পরিণত হলো—শেখ হাসিনার বিদায়। কিন্তু এ আন্দোলনে যে বিষয়টা ছিল না, অন্তত ব্যক্তভাবে ছিল না, সেটি হচ্ছে—আন্দোলনে সফল হওয়ার পর আমরা কী চাই? তবে অধিকাংশ সমাজবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ বলতে চেয়েছেন যে, দুটি বিষয় এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে। একটা হলো গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, জনগণের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, জুলুম-নির্যাতনের অবসান ইত্যাদি। আর তার পাশাপাশি একটা জাতীয় চেতনা—যেটা ঠিক আন্দোলনের ঘোষিত কর্মসূচিতে ছিল না, সেটা বেরিয়ে এসেছে। সেটা হলো ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে একটা প্রচণ্ড ধরনের বিক্ষোভ। এখন এ দুটি কাজকে যদি আমরা এ অভ্যুত্থানের লক্ষ্য হিসেবে ধরি—তাহলে এটা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে সম্পর্কে কোনো পরিষ্কার রূপরেখা আন্দোলনে ছিল না। আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার পর একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলো। সেই সরকার গঠিত হওয়া সম্ভব হয়েছে কারণ, সেনাবাহিনী শেখ হাসিনার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। তারা যদি সমর্থন প্রত্যাহার না করত, তাহলে আমরা আরও অনেক রক্তপাত দেখতে পেতাম। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অনেক নাম সামনে এলো। তাদের পরিচয় সামনে এলো। তাদের একজনকে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘে গিয়ে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের কাউকে কাউকে আমরা চিনি, আবার কাউকে কাউকে আমরা চিনি না। তবে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ফসল। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের মধ্য দিয়েই তাদের চিন্তাভাবনা গড়ে উঠেছে। তাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে কিছু কিছু জ্যেষ্ঠ মানুষ বা চিন্তাবিদের ছায়াও পড়েছে। যখন একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়ে গেল, তখন অনেকে বলতে শুরু করল যে, পুরো অভ্যুত্থানটা সংবিধানের চোরাগলিতে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে এ সরকারের উপদেষ্টারা শপথ নিলেন। এ শপথ নেওয়াটাকে অনেকে আন্দোলনের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে দেখেছেন। তাদের একটা দাবি ছিল যে, শহীদ মিনারে গিয়ে জনতার সামনে একটা বিপ্লবী সরকার হিসেবে শপথ গ্রহণ করুন। এই বিতর্ক চলতে থাকল যে, বিপ্লবী সরকার হওয়া উচিত ছিল, সাংবিধানিক সরকার হওয়া উচিত ছিল কি না। তবে আমি মনে করি, এটা পুরোপুরি সাংবিধানিক সরকার নয়। এটাকে আধা-সাংবিধানিক সরকারও নয়, বলা যায় এক-দশমাংশ সাংবিধানিক সরকার। এই সরকারের আইনকানুন, অধ্যাদেশ, বদলি যা কিছু হচ্ছে, সবই শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী আমলের রাষ্ট্রপতির নামেই হচ্ছে। অর্থাৎ এক ধরনের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার চেষ্টা। এভাবে পুরো অভ্যুত্থান একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্ররা—রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যুত্থানকে সফল করার জন্য নিজের নামে এসে আন্দোলনকে সমর্থন করেনি। তলে তলে বা গোপনে নানাভাবে লজিস্টিক সাপোর্ট, লোকবল দিয়ে সফল করার চেষ্টা করেছে। যার ফলে রাজনৈতিক দলগুলো এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারছে না। আবার দাবিও করছে। তাদের বক্তব্য হলো, শেখ হাসিনার পনেরো-ষোলো বছর শাসনে আমরা দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছি, বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, বহুজনকে আমরা হারিয়েছি। আমাদের বহুজন গুম হয়ে গেছে। তাদের মতে, এই আন্দোলনের পটভূমি দীর্ঘদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। আবার এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র নেতৃত্ব থেকে তিনজন উপদেষ্টা পরিষদে স্থান পেলেন।
কালবেলা: গণঅভ্যুত্থানের এক বছর কীভাবে বিশ্লেষণ করছেন?
ড. মাহ্বুব উল্লাহ্: ব্রিটেন প্রবাসী পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত একসময়কার ছাত্রনেতা এবং বিখ্যাত বিপ্লবী লেখক তারেক আলীর একটা ফেসবুক পোস্ট আমি পড়েছিলাম। সরকার কারা গঠন করবে এ নিয়ে যখন বিতর্ক বা আলোচনা হচ্ছিল, তখন তার বক্তব্য হলো—ছাত্রদের উচিত হবে এ আন্দোলনের ফল অন্য কারও হাতে তুলে না দিয়ে নিজেদের কাছে রাখা। অর্থাৎ, ছাত্ররাই নিজেরা সরকার গঠন করবে। তারেক আলী দূরদেশে বসে এসব চিন্তা করেছেন। বিপ্লবী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এ ধরনের চিন্তাভাবনা সঠিক। কিন্তু দেখতে হবে, যাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হচ্ছে, তারা এ ক্ষমতা নেওয়ার জন্য কতটা মানসিকভাবে, তাত্ত্বিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত। কারণ, তাদের নিজস্ব কোনো সংগঠন সারা দেশে ছিল না, সমর্থক হয়তো ছিল। একটা সংগঠিত শক্তি ছাড়া বিশাল অভ্যুত্থানের ফলাফল বিপ্লবে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। শাসনব্যবস্থা আমূল পরিবর্তিত করা, সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন করে নতুন দিকে পরিচালিত করা—এটা সম্ভব নয়। কাজেই যা হওয়ার তা হয়েছে, আমরা সংস্কারবাদের মধ্যে পড়ে গেলাম। আর যারা নতুনভাবে ক্ষমতার স্বাদ পেল, বিশেষ করে তরুণরা—তাদের সম্পর্কে একটা কথাই বলতে পারি, তা হলো—সত্যিকারের যে বুলেট, সেই বুলেটের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করেনি, কিন্তু সুগারকোটেড বুলেট বা চিনির আস্তরণমাখা বুলেটের কাছে তারা বা কেউ কেউ আত্মসমর্পণ করেছে। এটা কাম্য ছিল না। কারণ, ক্ষমতার একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যারা ক্ষমতায় যায়, তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত করা, নীতি বিচ্যুত করা, পদস্খলিত করা। এটা হয়েছে। ফলে তাদের দিয়ে একটা নতুন রাজনৈতিক শক্তির যে অভ্যুদয় বা অভিব্যক্তি—সেটা সফলভাবে জনগণের কাছে উপস্থাপিত হওয়া বা জনগণ সেটাকে অতি আপন ভেবে বরণ করে নেওয়া—সেটি ঘটেনি। আর না ঘটার কারণেই আজ নানারকম সমস্যা আমরা দেখছি। ছাত্রদের মধ্য থেকে যে নতুন দল গঠিত হয়েছে, অনেকেই এরই মধ্যে দল ছেড়ে দিচ্ছেন কিংবা অনেকের বিরুদ্ধে দল বিধিনিষেধ দিতে বাধ্য হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠে আসতে দেখা যাচ্ছে। আমি বলব এটা বাংলাদেশেরই দুর্ভাগ্য। নতুন তরুণ শক্তিকে সমাজের অন্ধকার শক্তি পথচ্যুত করে ফেলল। সোজা পথ থেকে তাদের অনেকেই বিচ্যুত হয়ে গেলেন। সে কারণেই তারা যে আবেদন নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, সেটা অনেকটাই যেন খর্ব হয়ে গেল। জনগণের জন্য এটা হতাশার কারণ হলো। বাংলাদেশের মানুষ ট্র্যাডিশনাল রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন করে অভ্যস্ত হলেও তারা নতুন দিনের অপেক্ষায় ছিল। তাদের পথচ্যুতি জাতির জন্য একটা অপূরণীয় ক্ষতি। আসলে আগামী দিনের নেতৃত্ব তরুণরাই দেবে। সেখানে তাদের সম্পর্কে আমরা হতাশ হয়ে পড়লে আমাদের ভরসার স্থল বলতে আর কিছুই থাকে না।
কালবেলা: ত্রিমাত্রিক নেক্সাসের মাধ্যমে বিগত সরকার ক্ষমতায় ছিল। সেই নেক্সাস অন্তর্বর্তী সরকার ভাঙতে পেরেছে কি? না পারলে কেন?
ড. মাহ্বুব উল্লাহ্: প্রশ্নটা হলো সংস্কার না বিপ্লব? মানুষের আকাঙ্ক্ষা—বাংলাদেশটাকে একেবারে খোলনলচে পাল্টে নতুন বাংলাদেশে রূপান্তর করা হবে। দ্বিতীয় স্বাধীনতার কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী কর্মকাণ্ড হয়নি। শেখ হাসিনার শাসনামলে একটা ত্রিপক্ষীয় নেক্সাস তৈরি হয়েছিল। এর ভেতরে ছিল শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্য এবং তার দলের লোকরা। দুই নম্বর হচ্ছে আমলাতন্ত্র, পুলিশ বাহিনী—যারা প্রশাসনিক কাঠামো ধরে রাখে। তিন নম্বর হচ্ছে অলিগার্করা, যেটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এই অলিগার্করা তাদের যোগ্যতার চেয়ে শতসহস্র গুণ বেশি ধনসম্পদ আহরণ করেছে, অত্যন্ত নোংরাভাবে। ব্যাংকের ভল্টগুলো দখল করে। সেই টাকাগুলো দেশে থাকলে, একটা কথা ছিল। তারা সেগুলোকে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। বিদেশে তারা বাংলাদেশি মুদ্রায় নিয়ে যায়নি। তারা পাচার করেছে ডলার বা পাউন্ডে। সেই বৈদেশিক মুদ্রা তারা কীভাবে পেল, সেই অনুসন্ধানও কিন্তু হয়নি। এ নিয়ে একটা শক্তিশালী তদন্ত হওয়া উচিত ছিল। হাসিনা সরকারের আমলে এমন কোনো দুর্নীতি নেই যে হয়নি। তিন শক্তির নেক্সাস (আমলা, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী) রাষ্ট্রকেই দখল করে নিয়েছে। রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রের কাছে থাকেনি। রাষ্ট্র হয়ে গেছে একটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অপরাধ। এই অপরাধেরও কোনো বিচারের ব্যবস্থা দেখছি না। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যেমন পুলিশের, কাস্টমসের, আমলাদের দুর্নীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দুর্নীতি—এসব রয়েই গেছে। এসবের কিছু কিছু দুর্নীতির বিচার যদি করা হতো, তবুও হয়তো সামনের দিনগুলো একটু ভালো হতো। কিন্তু সেরকম কিছু দেখা যাচ্ছে না। কারণ সরকারের সামর্থ্য বোধহয় অত্যন্ত সীমিত বা সরকার সাহস করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না। বিদ্যমান অবস্থাকে তারা ধাক্কা দিতে চাচ্ছে না। কারণ হয়তো কায়েমি স্বার্থবাদীদের ধাক্কা দিতে গেলে সরকারিই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। বিপ্লবী সরকার হলে হয়তো এ সাহস করতে পারত। কিন্তু মুখের কথায় বিপ্লবী সরকার হয় না। সেজন্য বিপ্লবী পার্টি দরকার। তার পেছনে বিপ্লবী সংগঠন দরকার। সংগঠনের পেছনে সংঘবদ্ধ সশস্ত্র শক্তি দরকার। যারা পুরোনো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, উচ্ছেদ করতে পারে। বিপ্লব মানে একশ্রেণির কাছ থেকে আরেক শ্রেণির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। ২০২৪ সালে সেটি হয়নি। বাংলাদেশে যারা ক্ষমতাবান তারা ক্ষমতাবানই রয়ে গেছে। আরেকটা দিক হলো, শক্তির ভারসাম্য, ক্ষমতার ভারসাম্য। যদি ক্ষমতার ক্ষেত্রে অসম অবস্থা থেকে যায়, তাহলে গণতন্ত্র চর্চা করা সম্ভব হয় না। গণতন্ত্র সেই সমাজেই চর্চা করা সম্ভব, যেখানে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী একে অন্যকে স্বার্থের প্রশ্নে মোকাবিলা করতে পারে এবং মোকাবিলার মধ্য দিয়ে একটা ভারসাম্যে আসতে পারে। কিন্তু সেই কাজটা শুরুই করা হয়নি। সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এসব সংস্কার হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কিছু সংস্কার, সেটা নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, কেউ কেউ সেটা নিয়ে নোট অব ডিসেন্টও দিতে পারে, সে যাই দিক—পুরোটাই তাৎপর্যহীন। কারণ শুধু সংস্কার দিয়ে প্রতিবিপ্লব বা ফ্যাসিবাদকে ঠেকানো যায় না। পরবর্তী সময়ে যেসব সরকার আসবে, তারা আবারও যে অলিগার্কদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে না, সেই নিশ্চয়তা কোথায়? সেজন্য প্রয়োজন ছিল অলিগার্কদের শক্তিটাকে চূর্ণ করা। দ্বিতীয় কথাটি হচ্ছে, সমাজের মধ্যে এমন একটা প্রক্রিয়া চালু করা, যাতে সমাজের অসংগঠিত অংশগুলো, প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত হতে পারে। আমাদের দেশে অনেক শ্রমিক আছে। তারা কতটুকু তাদের মালিকদের শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছে? এভাবে গণতন্ত্রের জন্য বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের শক্তি আছে, কিন্তু সেই শক্তিগুলো মৃত। কারণ তারা সংগঠিতই হতে পারেনি। আজ এই দেশে কৃষকদের একটা বড় লবি তৈরি হতে পারত। সেটা আমরা সংসদেও দেখি না, অন্য কোথাও দেখি না। সমাজে ভারসাম্য আনার জন্য একদিকে দীর্ঘদিনের চেপে বসে থাকা অপশক্তির অবসান দরকার। পাশাপাশি ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। এখন প্রশ্ন থাকে যে, কোন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে এ কাজটা করার জন্য আগ্রহী বা উৎসাহী? দুঃখের কথা হলো, এই মুহূর্তে কাউকে আমি দেখছি না। রাজনৈতিকভাবে মানুষকে ক্ষমতায়িত করার জন্য কেউ কোনো কাজ করতে চাচ্ছে না। তারা ভোট চাচ্ছে, সেটা পাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার, তারা তা করছে। কিন্তু যারা ভোট দেবে, তাদের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়িত হবে সেরকম পরিবেশ তৈরি করা দরকার। সেখানেই আমি প্রচণ্ড ঘাটতি লক্ষ করছি।