সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩৩
আমজাদ হোসেন শিমুল, রাজশাহী
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

ভোটের আগে সীমান্তে ফের বেড়েছে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান

সীমান্ত এলাকা ও অস্ত্র। ছবি : সংগৃহীত
সীমান্ত এলাকা ও অস্ত্র। ছবি : সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উদ্বেগ বাড়ছে সীমান্ত এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে অস্ত্র কারবারিরা। সীমান্তপথে বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের আনাগোনা— প্রায় প্রতিদিনই ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাবের নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হলেও পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না চোরাচালান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে অন্তত ৪০ কিলোমিটার এলাকায় নেই কাঁটাতারের বেড়া। এই অরক্ষিত অংশই অস্ত্র পাচারের প্রধান পথ হয়ে উঠেছে। সীমান্ত পাহারায় বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন থাকলেও কৌশলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কারবারিরা। বিজিবির হাতে যেসব অস্ত্র ধরা পড়ছে, তার বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নাইন এমএম পিস্তল।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট সীমান্ত দিয়ে ঢুকে এসব অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্র ভোটকালীন সহিংসতায় ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান বলেন, সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র আনা হচ্ছে এবং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। এগুলো ভোটের সময় ব্যবহার হতে পারে। ভোটার হিসেবে আমি আতঙ্কিত। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোট দিতে যাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

রাজনৈতিক মহলও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। রাজশাহী-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্রধারীরা যে দলেরই হোক, তারা জাতির শত্রু। তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’

নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্তবর্তী ২৭ জেলায় অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত ৭৮৭ জন লাইনম্যানের তালিকা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩৮ জন, রাজশাহীর তিনজন, জয়পুরহাটে ১৬ জন এবং নওগাঁয় ১৯ জন রয়েছে। বাকিরা অন্যান্য জেলার। তালিকাভুক্ত এসব ব্যক্তির ওপর বিশেষ নজরদারি চলছে। পাশাপাশি নতুন অস্ত্র কারবারিদের শনাক্তে নিয়মিত তালিকা হালনাগাদ করছে বিজিবি।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র প্রবেশ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে। শিবগঞ্জ উপজেলার রাণীনগর হঠাৎপাড়া, শাহাপাড়া, পণ্ডিতপাড়া, বালিয়াদিঘিসহ কয়েকটি গ্রামের বিভিন্ন ব্যক্তি সীমান্তপথে অস্ত্র আমদানির সঙ্গে জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে অস্ত্রের চালান যে একেবারেই ধরা পড়ছে না, তা নয়। গত বছরের ২৬ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাওয়া বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে আটটি বিদেশি পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬টি গুলি, গানপাউডার ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করে সেনাবাহিনী। সীমান্ত থেকেই এসব অস্ত্র ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল।

এর আগে, গত ১৬ আগস্ট রাজশাহী নগরের কাদিরগঞ্জ এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দুটি বিদেশি এয়ারগান, একটি রিভলভার ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হন মুনতাসিরুল আলম অনিন্দ্য। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের চাচাতো ভাই।

গত ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারিতেও একের পর এক অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। ৫ ডিসেম্বর বাঘার জোত কাদিরপুর এলাকায় দুটি ওয়ান শুটারগান ও হেরোইন উদ্ধার করে র‍্যাব। ১২ জানুয়ারি রাজশাহী নগরের সিটিহাট এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ের পাশ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি গুলি ও একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। তানোর, কাটাখালীসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকাতেও র‍্যাব ও বিজিবির অভিযানে মিলেছে পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই জব্দ হয়েছে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪১টি গুলি ও সাড়ে ৯ কেজি বিস্ফোরক। জানুয়ারির শুরুতে শিবগঞ্জের আজমতপুর সীমান্তে আমবাগান থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি ওয়ান শুটারগান। এর আগেও একাধিক দফায় পিস্তল ও গুলি জব্দ হয়েছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় বিশেষভাবে কাজ করছি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্ত অপরাধ কমেছে, ভোটের পরিবেশও স্বাভাবিক।

বিজিবির রাজশাহীর ১-ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, পদ্মা নদীতে সাতটি স্পিডবোট দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। ভোট উপলক্ষে সাত শতাধিক বিজিবি সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্বীকার করেছেন, কিছু অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, অস্ত্র এলেও সেগুলো ধরা পড়ছে এবং যেগুলো বাইরে রয়েছে, সেগুলো নির্বাচনে ব্যবহারের সুযোগ পাবে না। প্রশাসন প্রতিদিনই অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সিরাজগঞ্জে বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের শীতবস্ত্র বিতরণ

তারেক রহমানই বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবেন :  সালাম

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঢামেকে শোক বই, উদ্বোধন করলেন ড্যাব সভাপতি 

শাকিবের গ্রিন কার্ড পাওয়ার ‘গোপন’ খবর ফাঁস করলেন অমিত হাসান

ইসিকে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছ ভোট গণনা নিশ্চিত করতে হবে : রবিউল

ঢাবির মাঠে খেলতে আসায় কানে ধরালেন ডাকসুর সর্বমিত্র

সোমবার গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়

তারেক রহমানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই : মঈন খান

মাদুরোকে গ্রেপ্তারে মার্কিন অভিযানের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

‘ভারতীয় প্রক্সি বাহিনীর’ সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ

১০

কোনো কোনো দল বলছে আমরা নাকি মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছি : তারেক রহমান

১১

সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য 

১২

স্বর্ণের দামে নতুন ইতিহাস, সোমবার থেকে কার্যকর

১৩

ডিবির জালে আটক মাদক সম্রাট স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা বিল্লাল

১৪

দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপির বিকল্প নেই : সালাহউদ্দিন

১৫

পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতাকারীরা ভোটের জন্য এসেছে : মির্জা ফখরুল

১৬

এবার ক্রিকেটারদের সঙ্গে ‘বৈঠকে’ বসছে পাকিস্তানও, উত্তেজনা তুঙ্গে 

১৭

‘মাদকের আড্ডাখানা ও বেশ্যাখানা’ মন্তব্যের জেরে আইনি পথে যাচ্ছে ডাকসু

১৮

যানজট ও নাগরিক ভোগান্তি কমাতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে : হামিদ

১৯

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে : দুলু

২০
X