

রাজনীতির চেনা ময়দানে ভোটের লড়াইয়ে আবারও বিজয়ী হয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন। যিনি রাজনৈতিক মহলে ‘ভিপি জয়নাল’ নামেই সমধিক পরিচিত। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ফেনী সদর আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩১ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ঈগল প্রতীক নিয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু পেয়েছেন ৮০ হাজার ৫৮ ভোট। দীর্ঘ সময় পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে দেশের রাজনীতিতে পরিচিত একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যানের বিপরীতে ফেনীর ভোটাররা কেন আবারও ভিপি জয়নালকেই বেছে নিলেন, তা নিয়ে চলছে রাজনৈতিক মহলে নানা বিশ্লেষণ।
দৈনিক কালবেলার অনুসন্ধানে স্থানীয় ভোটার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তিতে প্রধান কিছু কারণ উঠে এসেছে। কালবেলার পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তা
ভিপি জয়নাল ফেনীর রাজনীতিতে এক পরিচিত ও পরীক্ষিত নাম। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি বিএলএফ কমান্ডার ছিলেন। ফেনীর গডফাদার খ্যাত আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম জয়নাল আবেদীন হাজারীর সঙ্গে রাজনৈতিক ময়দানের প্রতিপক্ষ হিসেবে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। ফেনীর রাজনীতিতে তিনি এক আলোচিত নাম। বিগত সময়ে ওনার বিরুদ্ধে দুর্নীতি কমিশনসহ নানা সংস্থা তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ করতে পারে নাই। তিনি দুদকের কাছ থেকে স্বচ্ছতার সনদ পেয়েছিলেন।
এর আগে তিনি তিনবার (১৯৮৮, ২০০১ এবং ২০০৮) এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারসহ তিনি মোট চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। উনি এমপি থাকা অবস্থায় বিগত সময়ে ফেনী রাস্তাঘাটসহ নানা ক্ষেত্রে ফেনী সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায় সাধারণ মানুষের সাথে তার একটি গভীর সংযোগ রয়েছে। তিনি দীর্ঘ সময় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তার নির্বাচনী এলাকা ফেনী সদর আসনের মাঠঘাট ছিল তার সুপরিচিত। ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করেন, অভিজ্ঞ এই নেতার মাধ্যমে এলাকার উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব। তার বিজয়ের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার
ফেনী-২ আসনের ভোটারদের মধ্যে দীর্ঘদিনের এক গুমোট ভাব ছিল। গত দুটি নির্বাচনে (২০১৪ ও ২০১৮) আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। অনেকেই অভিযোগ করে বলেন তারা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন নাই। তাই কেন্দ্র থেকে যাকেই নমিনেশন ঘোষণা দেওয়া হতো তিনি ভোটের মাঠে জিতে আসতেন। এক্ষেত্রে জনমতের তেমন প্রতিফলন হতো না বলেই ভোটারদের অভিযোগ।
এবার ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে আসার সুযোগ পেয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে ভোটারদের কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদানের জন্য নানাভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। ফেনী মূলত বিএনপির অধ্যুষিত এলাকা। বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম জেলা হিসেবে ফেনী সুপরিচিত। তাই এবার নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে পারি মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে ধানের শীষ তথা ভিপি জয়নালের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি করেছে।
সাংগঠনিক শক্তি ও ঐক্যবদ্ধ বিএনপি
যদিও ফেনী বিএনপিতে ভিপি জয়নালের প্রার্থিতা নিয়ে প্রাথমিকভাবে নানা তর্ক বিতর্ক ছিল। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলালসহ দলের স্থানীয়রা এ নিয়ে নাখোশ ছিলেন। কিন্তু পরে আলালসহ দলের শীর্ষস্থানীয়রা সকল ভেদাভেদ বলে প্রবীণ নেতা ভিপি জয়নালের পক্ষে কোমর বেঁধে মাঠে নামেন। ছাত্রদল যুবদল স্বেচ্ছাসেবক দল মহিলা দলসহ বিএনপির সকল অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা জানপ্রাণ লড়াই করেছেন ভোটের মাঠে ধানের শীষ কে বিজয়ী করার জন্য।
ফেনীতে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত বরাবরই মজবুত। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অনুগত ছিলো। তারাই দলের শৃঙ্খলাবোধ থেকে ধানের শীষ কে বিজয়ী করতে মাঠে নামেন। নির্বাচনের আগে বিএনপির প্রচারণা ও সাংগঠনিক তৎপরতা ভোটারদের আশ্বস্ত করেছে, দল হিসেবে বিএনপিই সদরের প্রধান বিকল্প।
ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও সহজলভ্যতা
ভিপি জয়নাল একজন সাবেক অধ্যাপক এবং সাবেক ছাত্রনেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ফেনীর মানুষের কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তাছাড়া দীর্ঘ সময় তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। পার্লামেন্টারিয়ান হওয়ার পথঘাট তার জানা ছিল। বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে অভিজ্ঞতায় তিনি ছিলেন এগিয়ে।
অন্যদিকে, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মজিবুর রহমান মঞ্জুর ছিল এটি প্রথমবার নির্বাচন। যদিও মুজিবুর রহমান মঞ্জু দেশীয় রাজনীতিতে একটি পরিচিত মুখ ও একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান। ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য কারিশমায় ছিলেন মঞ্জু সেরা। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের অনেকেই মঞ্জুকে আইকন হিসাবে মেনে নিয়েছেন। তবে তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে ভিপি জয়নালের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কাছে পিছিয়ে পড়েছেন।
রাজনৈতিক সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতি
বিজয় লাভের পর ভিপি জয়নাল প্রতিহিংসার রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে এলাকা পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এমনকি তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মজিবুর রহমান মঞ্জুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে যে রাজনৈতিক শিষ্টাচার দেখিয়েছেন, তা ফেনীর সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি আগামীতে মঞ্জুকে নিয়ে জেলার উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি এ সময় মঞ্জুকে বলেন এটি আমার শেষ নির্বাচন। আপনি যদি আগামীতে ফেনীর উন্নয়নে গণমানুষের জন্য কাজ করেন তবে মানুষই আপনাকে এমপি বানাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, দলের সকলেই ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন ভিপির পক্ষে কাজ করেছেন বলেই এ ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। একটি নিঃসন্দেহে দলীয় ঐক্যের ফলাফল।
ফেনী-২ আসনের ভোটারদের মতে, এবারের নির্বাচনে জয় কেবল ভিপি জয়নালের ব্যক্তিগত জয় নয়, বরং এটি ফেনীর মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের এবং একটি পরিচিত মুখকে পুনরায় সংসদীয় আসনে দেখার ইচ্ছার প্রতিফলন। এখন দেখার বিষয় তিনি আগামী পাঁচ বছর কীভাবে জেলার উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।