চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:২২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

হরমুজ প্রণালি বন্ধ, যে সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ঘটার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইরানের পাল্টা হামলার পর পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে, আর সেই ধাক্কা এসে লেগেছে বাংলাদেশের জ্বালানি, কৃষি ও বাণিজ্য খাতে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে শুধু তেল সংকট নয়, খাদ্য উৎপাদন, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স ও মূল্যস্ফীতির ওপর একযোগে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান তেলের দাম বাড়ার শঙ্কা নেই জানিয়ে বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭টি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে।

ডিজেল সংকট হলে কৃষিতে বড় ধাক্কা

বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে, যার পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল টার্মিনাল রাস তানুরাতে ড্রোন হামলার পর লোডিং কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইস্টার্ন রিফাইনারির কাঁচামাল সরবরাহ নিয়ে সময়সূচি অনিশ্চিত। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত প্রায় দুই সপ্তাহের চাহিদা মেটানোর মতো। সামনে বোরো মৌসুমে সেচের চাপ বাড়বে, এমন সময়ে ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি উৎপাদনে ধাক্কা লাগার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, পরিকল্পিত আমদানি সূচি ঠিক থাকলে তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা নেই। মার্চ–জুন সময়ে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ২,১৪,০৬২ টন, যা প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে। সামনে বোরো মৌসুমে সেচের চাপ বাড়বে। এমন সময়ে ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এছাড়া অকটেন মজুত আছে ৩৬,৬৪০ মেট্রিক টন (২৮ দিনের চাহিদা), পেট্রোল ২১,০৯২ মেট্রিক টন (১৫ দিন), জেট ফুয়েল ৬০,০২০ মেট্রিক টন (৩০ দিন), ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিনের মজুত এবং কেরোসিন ২৪১ দিনের মজুত আছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজেল ও সারের ওপর একসঙ্গে চাপ তৈরি হলে বোরো উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং বাজারে চালের দাম বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি

২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে Brent Crude-এর দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলারের ওপরে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর অন্যান্য গ্রেডের দামও বেড়েছে। এতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি বিল বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্চ থেকে জুন সময়ের জন্য বড় আমদানি পরিকল্পনা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে।

বার্থ অপারেটরস, শিপহ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনারস অ্যাসোসিয়েশনের (বোটসোয়া) সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, আমরা জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তায় আছি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আমাদের অপারেশনাল ব্যয় বেড়ে যাবে। চুক্তিতে একটা নির্দিষ্ট রেটে আমরা অপারেশন চালাই। এর মধ্যে চুক্তির পর তেলের দাম বাড়লেও আমাদের রেট সমন্বয় করা হয়নি। এখন আবার বাড়লে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। এই ক্ষেত্রে সরকার ভর্তুকি দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

এলএনজি ও বিদ্যুৎ খাতে শঙ্কা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কার্গো বিলম্বিত হলে লোডশেডিং বাড়তে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হরমুজ ও লোহিত সাগর অনিরাপদ হয়ে পড়ায় জাহাজগুলো এখন আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করছে। এতে যাত্রা সময় ১০ থেকে ১৫ দিন বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনে ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ হওয়ায় কন্টেইনারপ্রতি অতিরিক্ত কয়েক হাজার ডলার গুনতে হচ্ছে।

রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে চাপ রপ্তানিনির্ভর তৈরি পোশাক খাত বলছে, বাড়তি খরচ বিদেশি ক্রেতাদের ওপর চাপানো কঠিন। ফলে মুনাফা কমছে এবং নতুন অর্ডার নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ বাংলাদেশির আয়ও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে নির্মাণ ও অবকাঠামো প্রকল্প স্থগিত হলে কর্মসংস্থান কমবে, রেমিট্যান্স কমতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আরও চাপ তৈরি হবে।

বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া সার হরমুজ রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। একই সময়ে ডিজেল সংকট দেখা দিলে সেচ ব্যাহত হবে—ফলে কৃষি উৎপাদনে দ্বিমুখী চাপ তৈরি হবে।

সরকার বলছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় মজুত নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদি মজুত দিয়ে দীর্ঘ সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বিকল্প জ্বালানি উৎস, সরবরাহ বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ এখন জরুরি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তাহের গ্রেপ্তার

লক্ষ্মীপুরে ‘চন্দ্রগঞ্জ’ উপজেলা গঠনের গেজেট প্রকাশ

ডিফেন্ডারের জায়গায় মিডফিল্ডার নিয়ে বড় চমক আনচেলত্তির

৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ

আইনজীবী আমিনুল গণির মৃত্যুতে অ্যাটর্নি জেনারেল ও চিফ প্রসিকিউটরের শোক

৭২’র সংবিধান নিয়ে ‘অতিকথন’ রয়েছে: আসিফ নজরুল

ডাকাতির অভিযোগে গণপিটুনিতে যুবক নিহত

ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ১৫

বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের দৌড়ে এগিয়ে কারা?

বাস খাদে পড়ে নিহত ৪

১০

নতুন করে সংঘাত, নাগরিকদের ইরান ছাড়তে বলল ভারত

১১

ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক: শি জিনপিং

১২

সব রেকর্ড ভাঙছে ২০২৬ বিশ্বকাপ! ফুটবল ইতিহাসে এই প্রথম ঘটতে যাচ্ছে যা কিছু

১৩

আজ বেস্ট ফ্রেন্ড দিবস

১৪

তার চুরির সময় বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ গেল যুবকের

১৫

উত্তর কোরিয়ায় পৌঁছেছেন শি জিনপিং, স্বাগত জানালেন কিম জং উন ও তার স্ত্রী

১৬

কেন ঢাক-ঢোল বাজিয়ে শতবর্ষী বাবাকে দাফনের চেষ্টা ছেলের

১৭

বেতন বাড়ল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর এপিএসদের

১৮

হামে শিশু মৃত্যু / ড. ইউনূসসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে এমপির মামলার আবেদন খারিজ

১৯

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ কানাডার

২০
X