

চট্টগ্রাম কক্সবাজারের সেই আলোচিত সেই গোলাম রব্বানীকে ঘিরে নানা গুঞ্জন ও রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রেল অঙ্গনে। গেল সরকার বা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন উদ্বোধনের পর থেকেই অধ্যবধি এক কন্ট্রোল অর্ডারে আড়াই বছর ধরেই কাজ করছেন গোলাম রব্বানী। চট্টগ্রাম ডিভিশনে কাজ করলেও বেতন এবং টিএ বিল নিচ্ছেন ঢাকা ডিভিশন থেকে। একই সঙ্গে সম্প্রতি দায়িত্ব অবহেলা এবং কারণ জানতে চেয়ে বুক অফ করে সিআরবি অফিসে আনা হয়েছিল সেই রব্বানিকে।
প্রশ্ন উঠেছে কেন তাকে আড়াই বছর ধরেই কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনে রেখেছেন। কেনই বা এই স্টেশনে আরেকজনকে কন্ট্রোল অর্ডার করে নেওয়া হয়েছে। এসব গুঞ্জন খোদ রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মুখে মুখে। তবে টানা এতদিন একটা কন্ট্রোল অর্ডারে রাখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করলেন সাবেক ও বর্তমান রেল কর্মকর্তারা।
সমুদ্রের শহর কক্সবাজারে ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর যখন প্রথম ট্রেন ঢোকে, তখন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে ছিল নতুন এক স্বপ্ন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ শুরু হওয়ায় অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার বদলে যাবে যাতায়াতের চিত্র, সহজ হবে ভ্রমণ, কমবে ভোগান্তি। কিন্তু সেই স্বপ্নের শুরুতেই বাস্তবতা ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করে।
চট্টগ্রাম বিভাগের পর্যটন নগরী কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার পর থেকেই যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা হলো কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনিয়ম এবং একটি কথিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ।
২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর কক্সবাজার রেল রুট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার পর প্রথম দিকেই সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে যে ভোগান্তি তৈরি হয়, তা ছিল টিকিট না পাওয়া, অনলাইনে দ্রুত বুকিং শেষ হয়ে যাওয়া এবং কাউন্টারে উপস্থিত থেকেও টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অভিযোগ আরও বিস্তৃত হয় এবং বিষয়টি ধীরে ধীরে প্রশাসনিক তদন্ত, আদালতের নজরদারি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান পর্যন্ত গড়ায়।
স্টেশন চালুর পরপরই ঢাকা–কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটের দুটি ট্রেনকে কেন্দ্র করে টিকিট চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পর্যটন মৌসুমে এই চাহিদা আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। যাত্রীদের অভিযোগ, অনলাইন সিস্টেমে টিকিট ওপেন হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা শেষ দেখায়, একই সঙ্গে কাউন্টারেও সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। পরে একই টিকিট বাইরে কালোবাজারিদের মাধ্যমে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি হয়—এমন অভিযোগ উঠে আসে। স্থানীয় পর্যটক ও যাত্রীদের অনেকেই দাবি করেন, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা বুকিং কাউন্টারের কিছু কর্মচারীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার গোলাম রব্বানীর নাম বিভিন্ন অভিযোগে একাধিকবার সামনে আসে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে টিকিট ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, প্রশাসনিক দায়িত্বে স্বচ্ছতার অভাব এবং একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন তথ্য ফাঁস বা অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও স্টেশন মাস্টার গোলাম রব্বানীর প্রভাব ও ইশারার ভূমিকা রয়েছে বলে ভেতরের মহলে আলোচনা আছে, ফলে কক্সবাজার টিকিট ব্যবস্থাপনার অনেক সিদ্ধান্ত তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
স্থানীয় সূত্র এবং রেলওয়ের একাধিক অভ্যন্তরীণ কর্মচারীর দাবি অনুযায়ী, স্টেশন চালুর শুরু থেকেই একটি গোষ্ঠী টিকিট বুকিং প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। যাত্রীদের অভিযোগ, সকালবেলা অনলাইন টিকিট ওপেন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বুকিং শেষ হয়ে যায়, অথচ বাস্তবে সেই টিকিটের একটি অংশ পরে স্টেশনের বাইরের চক্রের কাছে পাওয়া যায়। এই চক্রের সঙ্গে কাউন্টারের কিছু কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের কেন্দ্রে তার নাম উঠে আসায় বিষয়টি ঘিরে রেলওয়ে প্রশাসনে নড়াচড়া শুরু হয়। প্রশাসনিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়, যেখানে কক্সবাজার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা গোলাম রব্বানীকে ১৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় নির্দিষ্ট দপ্তরে উপস্থিত হয়ে সাক্ষাৎ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাছাড়া রেলভবন ও সিআরবির প্রভাবশালী কয়েকজন কর্তার কারণে বার বার থেমে যায় নানা ঘটনা।
তবে পরে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি, কারণ ওই সময়ে তিনি ছুটিতে ছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক সমন্বয় ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্ট মহলে এই অনুপস্থিতি ঘিরে “অদৃশ্য প্রভাব” বা “অদৃশ্য শক্তির” ভূমিকা নিয়েও নানান আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে, যদিও এর পক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর আরেকটি প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়, যেখানে একাধিক কর্মকর্তার বদলি ও সংযুক্তির বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, একই পদে একাধিক কর্মকর্তাকে একই ইউনিটে পদায়ন করার ফলে দায়িত্ব বণ্টনে জটিলতা তৈরি হয় এবং প্রশাসনিক কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রেল প্রশাসনের ভেতরে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।
টিকিট কালোবাজারির অভিযোগ নিয়ে প্রথম বড় ধরনের আইনি উদ্যোগ আসে ২০২৩ সালের শেষ দিকে। কক্সবাজার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, টিকিট বিক্রয়ের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এবং বিষয়টি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তবে সেই তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে পরবর্তীতে প্রকাশ্যে কোনো বিস্তারিত প্রতিবেদন না আসায় বিষয়টি আবারও ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ২০ মার্চ রেলপথ প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রাম রেলস্টেশন পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং রেল সেবাকে আরও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঘোষণার পরও কক্সবাজার রুটে টিকিট সংকট এবং কালোবাজারির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এই অবস্থায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থা নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করে। দুদকের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হুমায়ুন বিন আহমদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্টেশন মাস্টারের কাছে বিস্তৃত নথিপত্র চাওয়া হয়। চিঠিতে ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জারির কথা উল্লেখ করা হয় এবং এতে গত ১ জানুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত টিকি
ট বিক্রির বিস্তারিত তথ্য, অনলাইন ও অফলাইন বিক্রয়ের রেকর্ড, কাউন্টারভিত্তিক হিসাব, কোটা বরাদ্দ তালিকা, স্টাফ আইডি, সিস্টেম অ্যাক্সেস লগ, ডিউটি রোস্টারসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি জমা দিতে বলা হয়।
দুদকের এই অনুসন্ধানে বলা হয়, প্রাথমিক অভিযোগ অনুযায়ী একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে টিকিট ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। সাধারণ যাত্রীরা নির্ধারিত মূল্যে টিকিট না পেলেও একই টিকিট পরবর্তীতে অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে অনলাইন সিস্টেমের সার্ভার লগ এবং স্টেশনভিত্তিক বিক্রয় তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে।
স্টেশন মাস্টার গোলাম রব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় আরও বলা হয়, তিনি আওয়ামী লীগের আমলসহ দীর্ঘদিন ধরে একই স্টেশনে দায়িত্ব পালন করছেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বদলি না হয়ে সেখানে থেকে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছেন।
অন্যদিকে যাত্রীরা বলছে, কক্সবাজার রুটে টিকিট পাওয়া এখনো একটি জটিল প্রক্রিয়া। অনেক যাত্রী অনলাইনে চেষ্টা করেও টিকিট পাওয়া যায় না, আবার কাউন্টারে গেলেও একই অবস্থা দেখা যায়। ফলে বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে বেশি দামে টিকিট কিনতে হচ্ছে, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় তিনি কক্সবাজারে পদায়ন পান বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও টিকিট সিন্ডিকেট ভেঙে পড়ার প্রত্যাশা থাকলেও তা বাস্তবে হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দায়িত্বশীলদের প্রতি জনমনে আশা ছিল যে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু সেই প্রত্যাশিত পদক্ষেপ না আসায় একই কাঠামো বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এতসব অভিযোগ ও আলোচনা থাকা সত্ত্বেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্যজোটের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট এম আর মনজু কালবেলাকে বলেন, রেলের চিহ্নিত অনিয়ম দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্তত ২০ জনকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে। অনেকেই আলোচিত দুদকের মামলার আসামিও। অনেক মামলার তদন্তও চলমান রয়েছে। তাদেরকে চেয়ার থেকে সরিয়ে দিলে সঠিক তথ্য বের হবে। রেলের গতিও বেড়ে যাবে। তা না হলে ঊর্ধ্বতনদের ছত্রছায়ায় নিচের চিহ্নিতরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান কালবেলাকে বলেন, একজন যাত্রীকে হুইল চেয়ার দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছোট একটু সমস্যা হয়েছিল, এরপর স্টেশন মাস্টারকে বুক অফ করা হয়। পরে বিস্তারিত জেনে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এক কন্ট্রোল অর্ডারে এক স্থানে আড়াই বছর চাকরি করার প্রশ্নে বিস্তারিত জেনে জানাকে পারবেন বলে জানান তিনি।