

ময়মনসিংহে শুরু হয়েছে বিদ্যুতের তীব্র লোডশেডিং। গ্রীষ্মের শুরুতে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনের পর দিন বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। গরমের তাপদাহের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে নেমে এসেছে অস্বস্তি। ময়মনসিংহ গ্রিডে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে।
জেলা ও উপজেলা শহরের তুলনায় পল্লী ও গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুতের ভোগান্তির মাত্রা আরও বেশি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলার প্রধান অর্থনৈতিক খাত মৎস্য ও পোল্ট্রি খামারে। অন্যদিকে বেকায়দায় পড়েছেন চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। বিদ্যুৎ না থাকায় গরম ও মশার উপদ্রবে অতিষ্ট হয়ে পড়ছে মানুষের জনজীবন। বিদ্যুৎ সংকটে এ অঞ্চলের মানুষের জনজীবন বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এমনিতেই সন্ধ্য ৭ টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে দিনে দুই থেকে তিন ঘন্টা লোডশেডিং থাকায় বিপাকে পড়েছেন তারা। ফলে ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুর হক জানান, প্রতিমুহূর্তে বিদ্যুতের চাহিদা উঠানামা করে। ময়মনসিংহ জোনে (ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল) বিদ্যুতের চাহিদা থাকে (প্রচণ্ড গরমে সন্ধ্যায়) ১২শ থেকে ১৩শ মেগাওয়াট। সেখানে আমাদের সরবরাহ রয়েছে ৭শ থেকে ৯শ মেগাওয়াট।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল দশটায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ৮শ ৪০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ময়মনসিংহ জেলায় সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা থাকে (প্রচণ্ড গরমে সন্ধ্যায়) ৪শ মেগাওয়াট। আর স্বাভাবিকভাবে চাহিদা থাকে ২শ ৫০ মেগাওয়াট। সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুর ১টায় সরবরাহ ছিল ২শ ৪৩ মেগাওয়াট। ২০ এপ্রিল রাত ১টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিল না।
সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ রুরাল পাওয়ার কোম্পানির প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১০ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাস সল্পতায় বর্তমানে উৎপাদন নেমে মাত্র ৫০ মেগাওয়াটের নিচে এসেছে। জামালপুর ইউনাইটেড পাওয়ার ডেভলপমেন্টের প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১৫ মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকটের কারণে সেখানে উৎপাদন হচ্ছে প্রতিদিন মাত্র ৬৬ থেকে ৬৭ মেগাওয়াট।
ঈশ্বরগঞ্জ, গৌরীপুর, তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সারাদিনে ৩ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি বলে জানা গেছে।
গ্রামাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা পর্যায়ে সারাদিনে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। তবে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি। কখনো ৭/৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়ে থাকে বলেও জানা গেছে।
ত্রিশাল উপজেলার কোনাবাড়ি গ্রামের শিল্পী আক্তার বলেন, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। অন্ধকারে বা পর্যাপ্ত আলো না থাকায় তারা মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারছে না। তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫থেকে ৭ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে আমাদের পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় গরম ও মশার উপদ্রবে একেবারে অতিষ্ট আমাদের জীবন। এই সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তারকান্দা উপজেলার এলিজা আক্তার বলেন, এ বছর দাখিল পরীক্ষা দিচ্ছি। কিন্তু বিদ্যুতের সমস্যার কারণে খুব বিপদে আছি। প্রতিদিন লোডশেডিং থাকে, বিশেষ করে রাতে, যখন পড়ার সবচেয়ে ভালো সময়। অন্ধকারে বসে ঠিকমতো পড়তে পারি না। মোবাইলের আলো বা চার্জলাইট দিয়ে যতটুকু পারি পড়ার চেষ্টা করি, কিন্তু এতে চোখে অনেক চাপ পড়ে।
নান্দাইল উপজেলার এসএসসি পরীক্ষার্থী এমরান হাসান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে পড়াশোনা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে। দিনে কাজের চাপ থাকে, তাই রাতে পড়তে বসি। কিন্তু তখনই বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে করে পড়ার রুটিন ঠিক রাখা খুব কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় মন খারাপ হয়ে যায়, কারণ ভালো ফল করার স্বপ্ন থাকলেও ঠিকভাবে পড়তে পারছি না।
ত্রিশাল উপজেলার ভন্ডোখোলা গ্রামের মাছ চাষী হারেজ আলী বলেন, বৈশাখ মাসে পুকুরে সারাক্ষণ পানি দিতে হয়। দিনের বড় একটা সময় লোডশেডিং থাকায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ থাকছে, এতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যারা মাছের রেনু বা পোনা উৎপাদনের ব্যবসা করেন, তাদের ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত রায় জানান, ময়মনসিংহ জোনে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফ-পিক আওয়ারে ৪৫০ থেকে ৪৬০ মেগাওয়াট, পিক-আওয়ারে ৫০০থেকে ৫২০মেগাওয়াট এবং দিনের অন্য সময়ে ৪৩০থেকে ৪৫০মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট ঘাটতি থেকে যায়। ফলে লোডশেডিং করতে হয়। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর জেনারেল ম্যানেজার মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, এই সমিতির এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ৭০ থেকে ৮০ মেগাওয়াট। পিক-আওয়ারে বেশি গরমে ২০ থেকে ২৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার মো. আলী জানান, এই সমিতির অধিননে এলাকায় ১৬০ থেকে ১৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকে। আমরা ৮০ থেকে ১শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাই। ফলে আমাদের বাধ্য হয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হয়।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর ডিজিএম টেকনিক্যাল আব্দুল মজিদ বলেন, এই সমিতির অধিনে এলাকায় ৩শ মেগাওয়াটের উপরে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। আমরা পিক ও অফপিক মিলিয়ে ৩০ থেকে ৫০ ভাগ লোডশেডিং করতে হয়।