

চট্টগ্রামে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মোছাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে নগরীর জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও গণজমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
রোববার (১৭ মে) দিবাগত রাতের উত্তপ্ত পরিস্থিতির পর সোমবার (১৮ মে) সকালে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এতে বলা হয়, জনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় কোনো ধরনের জনসমাবেশ, মিছিল, মিটিং বা বিক্ষোভ কর্মসূচি করা যাবে না।
গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৩০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জিইসি মোড় হতে দেওয়ানহাট পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও আশপাশ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। একইসঙ্গে নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
সিএমপির এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আগের রাতের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। রোববার (১৭ মে) রাত ১১টার দিকে নগরীর টাইগারপাস এলাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয়মুখী সড়কে বিএনপি ও এনসিপির নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি স্লোগান, উত্তেজনা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হলে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সম্প্রতি ওয়াসা মোড় থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত ফ্লাইওভারের বিভিন্ন পিলারে আঁকা জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত কয়েকটি গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে রোববার সন্ধ্যা থেকে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপি ‘জুলাই গ্রাফিতি আঁকা’ কর্মসূচি পালন শুরু করে।
সন্ধ্যা ৭টার পর দলটির নেতাকর্মীরা টাইগারপাস, লালখান বাজার ও সিটি করপোরেশন সড়ক এলাকায় নতুন করে বিভিন্ন দেয়াল ও স্থাপনায় গ্রাফিতি আঁকতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেনকে দায়ী করে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান লিখতে থাকেন।
এরপর ছাত্রদল ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে এসব স্লোগান মুছে ফেলতে শুরু করেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরে তা পাল্টাপাল্টি স্লোগান ও মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নেয়। কিছু সময়ের জন্য পুরো টাইগারপাস এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নেয়। পরে পুলিশ উভয়পক্ষকে সরিয়ে দিলে তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’
ঘটনার আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, নগরীর কোথাও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত কোনো গ্রাফিতি মুছে ফেলার নির্দেশ মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দেননি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘চট্টগ্রামকে ক্লিন, গ্রিন ও হেলদি সিটি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মেয়র বরাবরই নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ দিয়ে আসছেন। কোনো শিল্পকর্ম, শিক্ষামূলক বা সামাজিক সচেতনতামূলক গ্রাফিতি অপসারণের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’
এতে আরও বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি অপসারণের প্রশ্নই আসে না এবং এ বিষয়ে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
রোববার (১৭ মে) রাতে লালখান বাজার এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আরিফ মঈনুদ্দিন একজন বিতর্কিত নেতা। আমার বক্তব্য দেখার পরও তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই কর্মসূচি করেছেন শহরকে অস্থিতিশীল করার জন্য। গ্রাফিতিগুলো আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে আরও নান্দনিকভাবে পুনরায় অঙ্কন করা হবে। প্রয়োজনে চসিক অর্থায়ন না করলে ব্যক্তিগতভাবে আমি খরচ বহন করব।’
একইসঙ্গে মেয়র দাবি করেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কোনো বিভাগ বা শাখা গ্রাফিতি মোছার সঙ্গে জড়িত নয়।
অন্যদিকে এনসিপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত এলাকায় গ্রাফিতি আঁকার সময় মেয়রপন্থি কর্মীরা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। দলটির দাবি, বিএনপি ও মেয়রের অনুসারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এনসিপির একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, সিটি করপোরেশন সড়ক ও লালখান বাজার এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক লোক অবস্থান নেয়। যদিও এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, ‘ফ্লাইওভারটি সিডিএর করা। সেখানে সিটি করপোরেশন বিজ্ঞাপন লাগানোর জন্য গ্রাফিতিগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দ্রুত নির্বাচন দিন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছেই আমরা জুলাইয়ের দাবি-দাওয়া নিয়ে যাব।’