

সিলেটের ওসমানীনগরে বনফুল অ্যান্ড কোম্পানির একটি শোরুমে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি গণমাধ্যমে ‘আপা’ সম্বোধনের কারণে অর্থদণ্ড দেওয়ার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
তাদের দাবি, জরিমানার কারণ ছিল বাসি ও নিম্নমানের মিষ্টি বিক্রি, খাদ্যপণ্যে অনিয়ম এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম চলাকালে এক কর্মচারীর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা।
এদিকে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, আমার দেশের ওসমানীনগর প্রতিনিধি নুরুল ইসলাম নেফুল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ না পাওয়ায় ‘আপা’ সম্বোধনের কারণে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে এমন সংবাদ প্রকাশের পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৯ মে ঈদের ২ দিন বিকেলে ওসমানীনগর উপজেলার তাজপুর বাজারে নিজের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ ক্রেতার বেশে তাজপুর বনফুল শাখায় যান ইউএনও মুনমুন নাহার আশা। সেখানে তিনি প্রথমে চকলেট আইসক্রিম কিনতে চান। আইসক্রিম না থাকায় পরে মিষ্টির কাউন্টারে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির দাম ও মান সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। পরবর্তীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয়।
ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে ওসমানীনগর উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুনমুন নাহার আশা।
তিনি জানান, তাজপুর বাজারে অবস্থিত বনফুল অ্যান্ড কোম্পানিতে বাসি মিষ্টি বিক্রির অভিযোগ বেশ কয়েকদিন ধরেই আসছিল। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে গত ২৯ মে ঈদের পরদিন তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিম বাইরে রেখে সাধারণ ক্রেতার বেশে দোকানে প্রবেশ করেন।
ইউএনও বলেন, আমি ক্রেতা সেজে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির বিষয়ে জানতে চাই। তখন কর্মচারীরা জানান, কিছু মিষ্টি অনেক আগের। কেউ বলেন ঈদের তিন দিন আগের, আবার কেউ বলেন ঈদের আগের দিনের। পরে চালান দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। আদালতের টিমকে ডাকার পর তারা চালান দেখালেও চালানের সঙ্গে বিক্রির জন্য রাখা মিষ্টির কোনো মিল পাওয়া যায়নি। কর্মচারীরা পরে স্বীকার করেন যে পুরোনো মিষ্টি নতুন মিষ্টির সঙ্গে রাখা হয়েছিল। এ সময় তারা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
তিনি আরও বলেন, ম্যানেজারকে ডাকার জন্য বলা হলে এক কর্মচারী দোকান থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি এবং নিজের মোবাইল ফোনও বন্ধ করে রাখেন। পরে ম্যানেজার উপস্থিত হলে তাকে জানানো হয় যে অপরাধ সরাসরি উদঘাটিত হয়েছে এবং অভিযুক্ত কর্মচারী পালিয়ে যাওয়ায় মামলা দায়েরের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। পরবর্তীতে ওই কর্মচারীকে নিয়ে আসার পর প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
‘আপা’ সম্বোধনের প্রসঙ্গে মুনমুন নাহার আশা বলেন, আমি যত সময় সেখানে ছিলাম, তত সময় অনেকেই আমাকে আপা বলে সম্বোধন করেছেন। এটা কোনো বিষয় নয়। একপর্যায়ে তারা আপা বলে হাত-পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে চাইলে আমি বলেছি, আমি এখানে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে এসেছি। এই কথাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্যের নির্দেশে খোঁজখবর নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও দয়ামীর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসটিএম ফখর উদ্দিন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি কোনো পক্ষ বা বিপক্ষে নন। সিলেট ২ আসনের সংসদ সদস্যের নির্দেশে ঘটনার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বনফুলের এক কর্মচারী চাকরি হারানোর পর সংসদ সদস্যের কাছে অভিযোগ দেন। পরে ইউএনও ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বক্তব্য শোনা হয়।
তিনি জানান, ইউএনও তাকে বলেছেন যে পচা মিষ্টি বিক্রির অভিযোগ পেয়ে তিনি বনফুলে যান। সেখানে মিষ্টি পরীক্ষা করে তা নিম্নমানের ও পুরোনো বলে সন্দেহ হলে কর্মচারী আব্দুল মান্নান ও তায়েফের কাছে জানতে চান।
কর্মচারী জানান, মিষ্টিগুলো ঈদের আগের এবং কোম্পানি ব্যবস্থা না নেওয়ায় সেগুলো রাখা হয়েছিল। একপর্যায়ে ওই কর্মচারী ইউএনওর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে সেখান থেকে চলে যান। পরে ম্যানেজারকে ডেকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়।
এসটিএম ফখর উদ্দিন বলেন, ইউএনওর দাবি অনুযায়ী তিনি কোনো কর্মচারীর চাকরি খাননি, চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানি। আমরা মানবিক কারণে আমরা বনফুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্মচারীটির চাকরি পুনর্বহালের অনুরোধ করেছেন। পরে বনফুল কর্তৃপক্ষ আব্দুল মান্নানকে চাকরি ফিরে দিয়েছেন।
তবে ঘটনার বিস্তারিত ও চূড়ান্ত তথ্য ইউএনও এবং বনফুল কর্তৃপক্ষই দিতে পারবেন।
এ বিষয়ে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনমুন নাহার আশা কালবেলাকে বলেন, 'আপা' বলার জন্য তো জরিমানা করা যায় না। বনফুলে বাসি মিষ্টি পাওয়া গেছে বলেই জরিমানা করা হয়েছে। এ বিষয়ে শুধু সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিযোগ করেননি, স্থানীয় অনেক মানুষও এর আগে থেকে আমার কাছে অভিযোগ করেছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রমাণিত হওয়ার পর আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হয়েছে।
‘আপা’ সম্বোধনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপা তো আগেও ডেকেছে, পরেও ডেকেছে। এটা কোনো বিষয় নয়। যে সাংবাদিক সংবাদটি করেছেন, তিনি ভাইরাল হওয়ার জন্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। মূল ঘটনা হলো বাসি মিষ্টি বিক্রির অভিযোগ।
সাংবাদিকের সঙ্গে সিসি ক্যামেরা সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, নির্বাচনের সময় সাবেক চেয়ারম্যান কবির সাহেব ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সিসি ক্যামেরা সংক্রান্ত একটি কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনকালীন সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছিল, এ ধরনের কাজ কোনো ব্যক্তি বিশেষকে দিয়ে করানোর সুযোগ নেই। অফিসিয়াল প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করতে হবে। ওই বিষয়টি নিয়ে 'আমার দেশ' পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি একটু অসন্তুষ্ট।
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম কালবেলাকে বলেন, বনফুলকে জরিমানার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘আপা’ সম্বোধনের কারণে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে এমন সংবাদ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
তিনি জানান, স্থানীয় মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে গত ২৯ মে বনফুলকে জরিমানা করা হয়। জরিমানার সময় প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মচারী ইউএনওকে ‘আপা, মাফ করে দেন’ বললে তিনি জবাবে বলেন, ‘আমি আপা হিসেবে আসিনি, ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে এসেছি।’ তবে এর আগেই জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
জেলা প্রশাসক দাবি করেন, 'আমার দেশ' পত্রিকার ওসমানীনগর প্রতিনিধি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সিসি ক্যামেরা সংক্রান্ত একটি কাজ না পাওয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। এ বিষয়ে আমার সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগ করেছিলেন। সেই ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরেই কয়েকদিন পর ‘আপা’ ইস্যুতে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে ইউএনওর কোনো বিরোধ নেই এবং তার নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্যে মুনমুন নাহার আশা একজন দক্ষ ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি অনলাইন মাধ্যমে দাবি করা হয় বনফুলের এক কর্মচারী ইউএনওকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ‘আপা’ সম্বোধনের সঙ্গে জরিমানার কোনো সম্পর্ক নেই; খাদ্যপণ্যে অনিয়ম, বাসি মিষ্টি সংরক্ষণ ও বিক্রির অভিযোগ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে অসহযোগিতার কারণেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।