

দীর্ঘ ৫৮ বছর পর অবশেষে নিজের জন্মপরিচয়, পরিবার ও শেকড়ের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন দেলোয়ার হোসেন দুলাল চৌধুরী। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল ইউনিয়নের কালিপুর চৌধুরী বাড়িতে ঘটেছে এই অবিশ্বাস্য ও আবেগঘন ঘটনা। ১৯৬৯ সালে শৈশবে নিখোঁজ হওয়া দুলাল চৌধুরী এত বছর পর নিজ পরিবারে ফিরে এসেছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ১৯৬৯ সালের দিকে মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন দুলাল। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জ হয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকায় একটি পালক পরিবারের আশ্রয়ে বড় হন। সেখানে স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হলেও নিজের প্রকৃত পরিচয় ও মা-বাবার স্মৃতি সবসময় তাকে তাড়িয়ে বেড়াত।
বহু বছর পর বাবার এই পরিচয়হীনতার কষ্ট দূর করতে অনুসন্ধানে নামেন দুলালের ছেলে ইমাম হোসাইন আকিব। সামাজিক বাস্তবতা ও পরিচয় সংকট থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই মূলত এই খোঁজ শুরু হয়। একপর্যায়ে গত কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পারিবারিক আলোচনার সময় দুলাল চৌধুরীর শৈশব স্মৃতি থেকে কিছু অস্পষ্ট সূত্র বেরিয়ে আসে। যার মধ্যে ছিল নদী, লঞ্চঘাট, কালিপুর বাজার এবং একটি নির্দিষ্ট নাম।
বাবার দেওয়া সেই অস্পষ্ট সূত্র ধরেই শুরু হয় দীর্ঘ অনুসন্ধান। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় গুগল ম্যাপ, স্থানীয় ইতিহাস এবং এলাকাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে মেঘনা নদীর তীরবর্তী চাঁদপুর অঞ্চলের একটি এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়। পরে স্থানীয় সাংবাদিক ও গবেষকদের সহায়তায় কালিপুর চৌধুরী বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন আকিব।
অবশেষে দুলাল চৌধুরী কালিপুরে পৌঁছালে তার শৈশব স্মৃতির সঙ্গে এলাকার পুরোনো নিদর্শনগুলোর হুবহু মিল পাওয়া যেতে থাকে। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা নিশ্চিত করেন যে, বাড়ির পুরোনো গেট, খালপথ, আমগাছ এবং ‘লবণ তোলা ঘাট’ নামে পরিচিত একটি স্থান বহু বছর আগে সত্যিই সেখানে ছিল। একই সঙ্গে তারা স্মরণ করেন, প্রায় ৫৮ বছর আগে এই বাড়ি থেকে দুলাল নামের একটি শিশু নিখোঁজ হয়েছিল, যার আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
এরপর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। জীবিত ভাই মুকুল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হতেই কান্না ও আনন্দে ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। চেহারার অবয়ব ও স্মৃতির মিল দেখে রক্তের সম্পর্ক নিশ্চিত করেন স্বজনরা। দীর্ঘ ৫৮ বছরের বিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে দেলোয়ার হোসেন দুলাল চৌধুরী এখন তার নিজ পরিবারে ফিরে এসেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনরা ঘটনাটিকে দেখছেন এক বিস্ময়কর মানবিক পুনর্মিলন হিসেবে।
দুলার চৌধুরীর ছেলে ইমাম হোসাইন আকিব আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, কোনো ডিএনএ টেস্ট ছাড়াই আমরা আমাদের আপনজন ও রক্তের আত্মীয়দের সন্ধান পেয়েছি। এতদিন পর বাবার আসল পরিচয় মেলাতে পেরে এখন মনে খুব শান্তি লাগছে।