মুখের ভেতরে ছোট কোনো ক্ষত বা ঘা অনেক সময় আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তোলে। কথা বলা থেকে শুরু করে খাবার চিবানো: সবকিছুতেই যেন এক যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির সৃষ্টি হয়। আমাদের অনেকেরই ধারণা, মুখে ঘা হওয়া মানেই কেবল ভিটামিনের অভাব। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই সাধারণ সমস্যাটি মাঝে মাঝে বড় কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকির আগাম সতর্কবার্তাও হতে পারে।
কেন হয় মুখে ঘা?
মুখে ঘা হওয়ার পেছনে অসংখ্য কারণ থাকতে পারে, যার কিছু অত্যন্ত সাধারণ আবার কিছু বেশ জটিল।
- আঘাতজনিত কারণ: অসাবধানতাবশত গালে বা জিভে কামড় লাগা, খুব শক্ত ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজা, অতিরিক্ত গরম খাবার বা পানীয়তে মুখ পুড়ে যাওয়া কিংবা দাঁতের ব্রেস বা কৃত্রিম দাঁতের ঘর্ষণ থেকে ঘা হতে পারে।
- পুষ্টির অভাব: শরীরে ভিটামিন বি১২ , ফোলেট (B9) বা আয়রনের অভাব থাকলে ঘন ঘন মুখে ঘা দেখা দেয়।
- সংক্রমণ: হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের কারণে হওয়া কোল্ড সোর, ছত্রাকজনিত ওরাল থ্রাশ কিংবা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ফলেও এই সমস্যা হয়।
- মানসিক চাপ ও জীবনযাত্রা: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিদ্রা এবং ধুমপান বা তামাক সেবনের অভ্যাস মুখে ঘা হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এটি কি কোনো ভয়াবহ রোগের ইঙ্গিত?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুখের ঘা ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী বা জটিল রোগের লক্ষণ হতে পারে:
- মুখের ক্যান্সার : যদি মুখে সাদা বা লালচে দাগ দেখা দেয় এবং দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই ক্ষত না সারে, তবে তা ক্যান্সারের লক্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- অটোইমিউন রোগ: পেমফিগাস ভালগারিস বা ওরাল লাইকেন প্ল্যানাসের মতো জটিল অটোইমিউন রোগে মুখের ভেতর যন্ত্রণাদায়ক ব্লিস্টার বা জালের মতো সাদা দাগ হতে পারে।
- পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা: বারবার মুখে ঘা হওয়া ক্রোনস ডিজিজ বা সিলিয়াক ডিজিজের মতো অন্ত্রের রোগের ইঙ্গিত দিতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
সাধারণ ঘা ভেবে অবহেলা না করে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত:
- যদি ঘা আকারে আধা ইঞ্চির বেশি বড় হয়।
- যদি ঘা ২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় এবং কোনোভাবেই না সারে।
- ঘায়ের সাথে যদি তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া বা জয়েন্টে ব্যথা থাকে।
- যদি গালের ভেতরে কোনো পিণ্ড বা শক্ত চাকা অনুভব করেন।
প্রতিকার ও প্রতিরোধে করণীয়
মুখের ঘা থেকে মুক্তি পেতে এবং এটি প্রতিরোধ করতে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা জরুরি:
- খাবারে সতর্কতা: অতিরিক্ত ঝাল, নোনতা বা অ্যাসিডিক খাবার (যেমন লেবু) এড়িয়ে চলুন। পরিবর্তে প্রচুর পানি পান করুন এবং সুষম খাবার খান।
- মুখের পরিচ্ছন্নতা: নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত মুখ পরিষ্কার রাখুন ।
- ঘরোয়া টোটকা: ব্যথানাশক হিসেবে হালকা গরম লবণ পানি দিয়ে কুলকুচি করা বা বেকিং সোডার পেস্ট ঘায়ের স্থানে লাগানো যেতে পারে।
- ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বি-কমপ্লেক্স বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন।
মুখে ঘা হওয়া মানেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে শরীর যখন বারবার এই সংকেত দেয়, তখন সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস আর নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপ আপনার হাসি বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
তথ্যসূত্র: হেলথ লাইন