মো. শামীম, রাজশাহী
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম
আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

বরেন্দ্রজুড়ে তীব্র পানি সংকট, সবচেয়ে ঝুঁকিতে তানোর-গোদাগাড়ী

রাজশাহীর খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
রাজশাহীর খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত

রাজশাহীর খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত পাঁচ দশকে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় জেলার তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর, পবা, বাগমারা, দুর্গাপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষি, জনজীবন ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে।

নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক গবেষণা সাময়িকী Cleaner Water-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। গবেষণাটি রাজশাহী জেলার ১৪টি উপজেলার তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে, যেখানে বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানি ব্যবহারের ধরন মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৩২ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র পানি সংকট স্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলায় সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃষ্টিপাত কমেছে এক-তৃতীয়াংশ

গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৮-১৯৯০ সময়ে রাজশাহীতে বর্ষাকালে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। ২০১১-২০২৪ সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ কয়েক দশকে বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু ও শক্ত মাটিতে এমনিতেই পানি ধরে রাখার সক্ষমতা কম। ফলে বৃষ্টি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুকুর, খাল ও জলাশয় দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে এবং কৃষিজমিতে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

তানোর-গোদাগাড়ীতে বাড়ছে সংকট

রাজশাহীর তানোর ও গোদাগাড়ী দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। গ্রীষ্ম মৌসুমে অনেক স্থানে নলকূপে পানি ওঠে না, পুকুর ও জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যায় এবং গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে কৃষি।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কয়েক বছর আগেও যে গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, এখন তার চেয়ে আরও নিচে নেমে গেছে পানির স্তর। ফলে সেচ ব্যয় বেড়েছে, উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমেছে প্রায় ৪ মিটার

গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ৩৫ বছরে রাজশাহীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩ দশমিক ৭৮ মিটার নিচে নেমে গেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে গড় গভীরতা ছিল ১১ দশমিক ৬৬ মিটার, সেখানে ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৪৪ মিটারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া, প্রাকৃতিকভাবে পানি পুনর্ভরণ কমে যাওয়া এবং সেচের জন্য অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বরেন্দ্র এলাকায় বোরো চাষের বিস্তারও পানির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

তাপমাত্রা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে

গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে বরেন্দ্র অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। শতাব্দীর শেষ নাগাদ কয়েক দফা সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে এবং ২০৮৮ সালের মধ্যে তা ৪৭ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে বছরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা থাকা দিনের সংখ্যা ২০১৮ সালের ১৩ দিন থেকে বেড়ে ২০৭৮ সালে প্রায় ১৯৫ দিনে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষি ও জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব

রাজশাহীর ১৪টি উপজেলার ৩৮৫টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশের বেশি মানুষ জানিয়েছেন পানির সংকটে তাদের আয় ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৯৫ শতাংশের বেশি মানুষ শুধু পানি সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৩ শতাংশ মানুষ দৈনন্দিন ব্যবহার ও কৃষিকাজের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। শতভাগ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা নিজেরাই পানির স্তর নিচে নেমে যেতে দেখেছেন।

দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ পানি সংকটের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করলেও প্রায় ৭৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, পানি ব্যবস্থাপনায় তারা কোনো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাননি।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ : গবেষকরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা-ভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে।

> পানি-সাশ্রয়ী আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি

> বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ব্যবস্থা চালু করা

> ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ

> খরা-সহনশীল ও স্বল্প পানি প্রয়োজন এমন ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ

> অতিরিক্ত পানি-নির্ভর বোরো চাষ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা

> কৃষি, পানি উন্নয়ন ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা

পরিবেশবিদদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল, বিশেষ করে তানোর ও গোদাগাড়ীতে পানির সংকট আরও তীব্র হবে। এর প্রভাব শুধু কৃষি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; নিরাপদ পানীয় পানি, খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের ১৪টি উপজেলার বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করে পরিচালিত এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে আগামী বছরগুলোতে রাজশাহীর পানি সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে। ফলে এখনই সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা ও বসতি সম্প্রসারণের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এর কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, মাটির আর্দ্রতা ও সবুজায়ন কমছে এবং অনেক এলাকায় তীব্র পানিসংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অন্যের কাছ থেকে পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা তাদের আয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

উন্নয়ন সংস্থা পরিবর্তনের প্রধান নির্বাহী রাশেদ রিপন বলেন, স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন উন্নয়ন, জলাশয় ভরাট এবং নগরায়ণের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট আরও তীব্র হয়েছে। বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সংকট মোকাবিলায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ জলাশয় রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল

বাজেটে মূল্য কমবে যেসব পণ্যের

শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে এনসিপি নেতা অবরুদ্ধ 

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি স্কোয়াড ঘোষণা, দলে ৩ পরিবর্তন

বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে জখম

কয়লা আমদানিতে বাড়তে পারে শুল্কছাড়ের মেয়াদ

মুখে ঘা হয় কেন, এটি কি কোনো ভয়াবহ রোগের ইঙ্গিত?

চবিতে শিক্ষার্থীদের জন্য আবার ‘জোবাইক’ সেবা চালু

বিশ্বকাপের দিনে অস্ট্রেলিয়াকে যেভাবে লজ্জা দিল বাংলাদেশ

বাজেটে যাদের জন্য ট্রেন ভাড়া সম্পূর্ণ ফ্রি

১০

সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী

১১

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকার বরাদ্দের প্রস্তাব

১২

বরেন্দ্রজুড়ে তীব্র পানি সংকট, সবচেয়ে ঝুঁকিতে তানোর-গোদাগাড়ী

১৩

ইরান থেকে ছোড়া ২০ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত

১৪

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব

১৫

জুলাই শহীদ পরিবারকে মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার প্রস্তাব

১৬

থানায় রক্ষা পেলেও ডিসি অফিসে মার খেলেন বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহাদী

১৭

ওমান উপসাগরে ইরানি কার্গো বার্জে হামলা

১৮

নতুন ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা স্থগিত করল মালয়েশিয়ার বিমান সংস্থা

১৯

বড় কয়েকটি খাতে আসতে পারে বড় কর ছাড়ের প্রস্তাব

২০
X