

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে উদ্দেশ্য করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার বলেছেন, ‘আপনি উত্তরপাড়ার এক্সপার্ট, আমরা দক্ষিণপাড়ার এক্সপার্ট। তার পরবর্তী জেরা অনুষ্ঠিত হবে ৩ মার্চ।’
রোববার (০১ মার্চ) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একমাত্র আসামি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের জেরা চলাকালীন সময়ে ট্রাইব্যুনাল এ মন্তব্য করেন তিনি।
জেরায় জিয়াউল আহসানের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো তাকে সেনাবাহিনীর আবাসন প্রকল্প ‘জলসিঁড়ি’ নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করেন। জবাবে ইকবাল করিম বলেন, ‘তিনি ওই প্রকল্পের প্রধান ছিলেন। রূপগঞ্জের ২৪টি মৌজায় জমি কেনা নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।’
তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী ক্যাম্পে আক্রমণ ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় আত্মরক্ষার্থে সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছিল। ঘটনার সময় জেনারেল মুবিন সেনাপ্রধান ছিলেন এবং অপারেশন পরিদপ্তর এটি নিয়ন্ত্রণ করেছিল।’
জেরার একপর্যায়ে সাবেক সেনাপ্রধানের দীর্ঘ ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনাকে এত ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আপনি উত্তরপাড়ার এক্সপার্ট আর আমরা দক্ষিণপাড়ার এক্সপার্ট।’
জমির মূল্য নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইকবাল করিম বলেন, বিঘাপ্রতি জমি ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকায় কেনা হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি তার এখতিয়ারে ছিল না বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারি’ করা হয়নি বলেও তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান।
পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক প্রকল্পের সঙ্গে সেনাবাহিনী যুক্ত ছিল। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা তার মনে নেই। এসব প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই বলে উল্লেখ করেন।
জেরার একপর্যায়ে কর্মকর্তাদের পোস্টিং নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান গোলাম মর্তূজা তাকে সতর্ক করে বলেন, ‘এটা সর্বোচ্চ আদালত। আপনি সাবধানে কথা বলবেন। কারণ আপনারও ক্ষতি হতে পারে, মামলাও হতে পারে।’
জেরায় সাবেক সেনাপ্রধান আরও বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে কতজন গুম হয়েছিল, তার সঠিক হিসাব বলতে পারব না। যারা গুম হয়েছিল তাদের কাউকে আমি উদ্ধারের চেষ্টা করিনি। কারণ এটা আমার দায়িত্বাধীন ছিল না এবং আমি জানতাম না, কে কখন কোথায় গুম হয়েছে।’
এ সময় তিনি আরও যোগ করেন, ‘কে বা কারা গুম হচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তর (এমআই) কোনো তথ্য দিতে পারে নাই। তবে গুম হচ্ছে মর্মে তারা আমাকে জানিয়েছে।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনির জেরায় সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, গুমের সংস্কৃতি প্রতিরোধ করতে আমি অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এ মর্মে দালিলিক কোনো প্রমাণপত্র দাখিল করিনি। দালিলিক কোনো প্রমাণ নেই। গুম প্রতিরোধের জন্য সুপার চিফ বা প্রধানমন্ত্রী বরাবরে চিঠি পাঠাইনি বা তাকে লিখিতভাবে জানাইনি।
ইকবাল করিম আরও বলেন, ‘যে কনিষ্ঠ অফিসার র্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমার অফিসে আসেন, তার নাম স্মরণ নেই। কত তারিখ তিনি আমার কাছে এসেছিলেন, স্মরণ নেই। এই কনিষ্ঠ অফিসার দুজনকে হত্যা করেছেন মর্মে আমার কাছে স্বীকার করার পরিপ্রেক্ষিতে আমি তার বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিনি। এই মর্মে কোন সাক্ষী বা আলামত ছিল না। তার এ রূপ স্বীকারোক্তি আমি রেকর্ড করিনি। তিনি প্রতিটি হত্যার জন্য প্রাপ্ত যে ১০ হাজার টাকা মসজিদে দান করেছেন, সেজন্য তাকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়নি।’
মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
এদিন জেরা শুরুর আগে নতুন চিফ প্রসিকিউটর প্রথমবার ট্রাইব্যুনালে এলে তাকে অভিনন্দন জানান ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারকরা। এ সময় আগের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে এক হাত দেন জিয়াউল আহসানের বোন আইনজীবী নাজনীন নাহার।
তিনি বলেন, ‘জিয়াউল আহসানের বিচার নিয়ে একটা ফিকশন তৈরি করা হতো। অতীতে এমন কিছু ফেস করেছি, যাচ্ছেতাইভাবে আসামিকে উপস্থাপন করা হতো।’
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘এমন কিছু সুবিধা প্রসিকিউশন টিম পায় না যে আপনারা এভাবে বলবেন।’
পরে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বলেন, সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া হবে।
এর আগে সকালে কারাগার থেকে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে। তার উপস্থিতিতেই জেরা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দিনের জেরায় সাবেক সেনাপ্রধানকে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে ফেলেন আসামিপক্ষের এই আইনজীবী। প্রথম দিন তথা ১৮ ফেব্রুয়ারিও তিনি জেরা করেন।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। জবানবন্দিতে তিনি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। সেনাবাহিনী ও র্যাবের কর্মকাণ্ড এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সংশ্লিষ্টতা নিয়েও তিনি ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন।