

বিশ্বকাপে চূড়ান্ত চ্যাম্পিয়ন কে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে চাপ, ভাগ্য এবং সামান্য ব্যবধানই অনেক সময় পুরো সমীকরণ পাল্টে দেয়। তবুও ইতিহাস বলছে, এখন পর্যন্ত মাত্র আটটি দেশ বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছে। সেই সীমিত অভিজাত ক্লাবের ভেতর থেকেই এবারও নতুন চ্যাম্পিয়নের খোঁজ শুরু হচ্ছে।
টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে বিশ্লেষক, বুকমেকার এবং ফুটবল বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী ছয়টি দল সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছে—স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল এবং ব্রাজিল। প্রত্যেকেরই আছে শক্তিশালী স্কোয়াড, অভিজ্ঞতা এবং শিরোপা জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা।
স্পেন: তারুণ্যের শক্তি ও নতুন অ্যাটাকিং ফুটবল
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন বর্তমানে ফর্মের চূড়ায় অবস্থান করছে। ২০২২–২৩ নেশনস লিগ, ইউরো ২০২৪ এবং অলিম্পিক স্বর্ণপদক—সব মিলিয়ে দলটি সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে শীর্ষে উঠে এসেছে তারা এবং ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলটি এখন আর শুধু বল দখলনির্ভর ফুটবলে সীমাবদ্ধ নয়। দ্রুতগতির আক্রমণ, উইং থেকে ড্রিবলিং এবং হাই প্রেসিং—সবকিছুর সমন্বয়ে স্পেন এখন আরও আধুনিক ও কার্যকর। তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামালকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আশা, যদিও তার চোট উদ্বেগের বিষয়। পেড্রি ও নিকো উইলিয়ামস এই দলের আক্রমণভাগে ভারসাম্য ও গতি যোগ করেছেন।
তবে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক মানসিকতা মাঝে মাঝে রক্ষণভাগকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে—যা তাদের দুর্বল দিক হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ফ্রান্স: অভিজ্ঞতা, সামর্থ্য ও এমবাপ্পে ফ্যাক্টর
গত দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা ফ্রান্স আবারও শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার। ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালে রানার্স-আপ হওয়া দলটি এবার টানা তৃতীয় ফাইনালের লক্ষ্যে মাঠে নামছে—যা খুব কম দেশই করতে পেরেছে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে এখনো দলের কেন্দ্রবিন্দু। তার গতি, ফিনিশিং এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা ফ্রান্সকে সবসময় আলাদা করে রাখে। উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল অলিজের মতো খেলোয়াড়রা আক্রমণে বাড়তি শক্তি যোগ করেন।
দিদিয়ের দেশমের অভিজ্ঞতা ফ্রান্সের বড় শক্তি। দীর্ঘদিন ধরে একই কোচের অধীনে খেলার ফলে দলটি চাপের মুহূর্তেও স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে দেশম এই টুর্নামেন্টের পর দায়িত্ব ছাড়তে পারেন—যা একটি যুগের শেষও হতে পারে।
আর্জেন্টিনা: বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শিরোপা ধরে রাখার লড়াই
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার ইতিহাস গড়ার সুযোগ নিয়ে মাঠে নামছে। ইতালি ও ব্রাজিলের পর তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্য তাদের সামনে।
লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দলটি এখনও ক্ষুধার্ত ও সংগঠিত। ২০২৪ কোপা আমেরিকা জয় তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলগত বোঝাপড়া এবং ম্যাচ অনুযায়ী কৌশল বদলানোর সক্ষমতা।
গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং আক্রমণে লাউতারো মার্টিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ—সবাই মিলে দলটিকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে। তবে সবকিছুই ঘুরছে মেসির ফিটনেস ও ফর্মকে ঘিরে।
পর্তুগাল: রোনালদোর শেষ অধ্যায়ের সম্ভাব্য সোনালি সমাপ্তি
পর্তুগাল এখন সবচেয়ে পরিপূর্ণ দলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক নেশনস লিগ জয় এবং শক্তিশালী ইউরোপীয় বাছাইপর্ব তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ৪০-এর ঘরে পৌঁছালেও এখনও দলের অনুপ্রেরণা। তার সঙ্গে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা ও ভিটিনহার মতো মিডফিল্ডাররা পর্তুগালকে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করেছে। নুনো মেন্দেসের মতো ফুলব্যাক দলের আক্রমণেও বড় ভূমিকা রাখে।
রবার্তো মার্টিনেজের কৌশল বল দখল ও উচ্চ প্রেসিংয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা পর্তুগালকে আধুনিক ও গতিশীল দল হিসেবে গড়ে তুলেছে। তবে বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকতা এখনও প্রশ্নের জায়গা।
ইংল্যান্ড: প্রতিভার ভাণ্ডার, শিরোপার অপেক্ষা
ইংল্যান্ড বরাবরই ফেবারিট হিসেবে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তবে এবার বাছাইপর্বে তাদের পারফরম্যান্স নিখুঁত—আট ম্যাচে আট জয় এবং কোনো গোল হজম না করা।
হ্যারি কেইন এখনো দলের প্রধান ভরসা। তার সঙ্গে বুকায়ো সাকা ও জুড বেলিংহাম ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগকে ভয়ংকর করে তুলেছে। সেট-পিস ও এরিয়াল খেলায় ইংল্যান্ড বরাবরই শক্তিশালী।
থমাস টুখেলের অধীনে দলটি আরও সংগঠিত হলেও সমস্যা হলো অতিরিক্ত নির্ভরতা—কেইন ভালো না খেললে বিকল্প পরিকল্পনা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্রাজিল: পরিবর্তনের মধ্যেও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন
ব্রাজিল এবার কিছুটা অনিশ্চয়তা নিয়ে বিশ্বকাপে আসছে। কোচ পরিবর্তনের পর পরিবর্তন এসেছে কৌশল ও দলগত কাঠামোতেও। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলটি এখন আরও সংগঠিত হতে চাইছে।
ভিনিসিউস জুনিয়র এখন ব্রাজিলের প্রধান তারকা। তার সঙ্গে রাফিনহা ও তরুণ এন্ড্রিক আক্রমণে সম্ভাবনা তৈরি করছেন। তবে নেইমারের ফিটনেস এখনও বড় প্রশ্ন।
ঐতিহ্যগতভাবে ব্রাজিল আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য পরিচিত হলেও এবার তারা বেশি ব্যালান্সড এবং রক্ষণাত্মকভাবে স্থিতিশীল থাকার চেষ্টা করছে।
সবশেষে বলতে হয় ফুটবলে ফেবারিট থাকা মানেই শিরোপা নিশ্চিত নয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বিশ্বকাপে চূড়ান্ত জয় নির্ধারণ করে মুহূর্ত, মানসিকতা এবং ভাগ্য। স্পেনের তরুণ গতি, ফ্রান্সের গভীরতা, আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন মানসিকতা, ইংল্যান্ডের শক্তিশালী স্কোয়াড, পর্তুগালের পরিপক্বতা এবং ব্রাজিলের ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে এক অনিশ্চিত কিন্তু রোমাঞ্চকর লড়াই।
সূত্র: সিএনএন