

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আজ শুক্রবার সড়কপথে কলকাতা থেকে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাবেন বলে কালবেলাকে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা৷
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় বেনাপোল সীমান্তে পৌঁছাবেন। তাঁর সঙ্গে থাকবেন স্ত্রী মিনাল ত্রিবেদী। তাঁর আগমন উপলক্ষে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রোটোকল ব্যবস্থা ইতিমধ্যে নেয়া হয়েছে৷
এদিকে বাংলাদেশে দীনেশ ত্রিবেদীর আগমনের আগেই দু দেশের টানাপোড়েন কাটিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সু সম্পর্কের বার্তা দেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার কলকাতায় নেতাজি ভবন পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত এই নতুন হাইকমিশনার। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত যেমন অভিন্ন, তেমনি স্বপ্নও অভিন্ন- তাই ভালোবাসা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাই-বোন। আমি আগেই বলেছি, আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য সীমান্ত নয়, স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নও অভিন্ন। (বাংলায় তিনি বলেন) একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের নয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। আমাদের স্বপ্ন অভিন্ন। গণতন্ত্রের স্বপ্ন আমাদের সবার। তাই আমি শুধু ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের কথা বলছি না; এর সঙ্গে বাংলাদেশের আরও ২০ কোটি মানুষকে যোগ করছি। এই ১৬০ কোটি মানুষ, যারা আমাদের ভাই-বোন ও মা—তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিশ্চিত, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর আশীর্বাদ, ভারতের মানুষের শুভকামনা এবং বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন আমাকে সাহায্য করবে, যাতে আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারি এবং আমাদের লক্ষ্য অর্জনে সফল হতে পারি। একে অপরের মঙ্গল কামনা করার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না।’
নেতাজি ভবন পরিদর্শনের সুযোগ পাওয়ায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিজেপি নেতা বলেন, ‘আসলে আমি নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করি। কারণ, আমি এই এলাকাতেই বড় হয়েছি। এখান থেকে প্রায় ৪০০ গজ দূরে আমার বাড়ি, যেখানে আমি শৈশব কাটিয়েছি। তাই নেতাজিকে ঘিরে যে আবেগ, তা নিয়ে আমরা বড় হয়েছি। আমরা যে মূল্যবোধগুলো ধারণ করেছি, তার জন্য নেতাজির প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না যে দায়িত্ব নেওয়ার আগে নেতাজি ভবনে এসে তার থেকে প্রেরণা গ্রহণ করছি এবং গণতন্ত্রের সেই মূল্যবোধগুলো ধারণ করছি, যার জন্য নেতাজি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আমি নেতাজির আশীর্বাদ নিয়ে এমন এক দায়িত্ব পালনে যাচ্ছি, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং এ দেশের জনগণ আমাকে দিয়েছেন। আমাদের সব মহান নেতা—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ, স্বামী বিবেকানন্দ—সবার আশীর্বাদ আমার সঙ্গে রয়েছে।’
গত ৫ জুন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে লেটার্স অব ক্রিডেনশিয়ালস (পত্রাধিকার) গ্রহণ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পালনের আইনি ও কূটনৈতিক অনুমোদন লাভ করেন। এপ্রিল মাসে নিয়োগ ঘোষণার পর থেকে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং এখন ঢাকায় এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে ক্রিডেনশিয়ালস উপস্থাপন করে আনুষ্ঠানিকভাবে মিশন শুরু করবেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক নেতাকে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানো দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা করে। তিনি ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট প্রণয় কুমার ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। এটি একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক নিয়োগ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রিবেদী যেহেতু বাংলা ভাষায় সাবলীল এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও সংস্কৃতির গভীর জ্ঞান রাখেন। তাই বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মোদি সরকার দীনেশকেই ঢাকায় পাঠাচ্ছে। ত্রিবেদীর পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং বাংলা ভাষার দক্ষতা এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নিয়োগের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে, দুদেশের সম্পর্ককে আরও গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত করতে চায় দিল্লি।