কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৩১ এএম
আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৫, ১০:৪১ এএম
অনলাইন সংস্করণ

শেখ হাসিনার যত ভুল

শেখ হাসিনা। ছবি : সংগৃহীত
শেখ হাসিনা। ছবি : সংগৃহীত

গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তৎকালীন পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন ট্রাইব্যুনাল। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর থেকেই শেখ হাসিনার উত্থানপতন ও তার শাসনামল নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শেখ হাসিনার কোন সিদ্ধান্তের কারণে তার এই পরিণতি হয়েছে। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পতনের ঘণ্টা বাজে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে।

বিদায়ঘণ্টা এর আগের বেজে উঠলেও ছাত্রজনতার তোপের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সেই সময় ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আশ্রয় নেন ভারতের দিল্লিতে । এর মধ্যে দিয়ে শেখ হাসিনা এবং আ.লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরেরও বেশি শাসনামলের ইতি ঘটে।

শেখ হাসিনা সর্বমোট ক্ষমতায় ছিলেন ৫ হাজার ৬৯০ দিন। তার এই দীর্ঘ শাসনামলে রয়েছে ভালোমন্দ সব কাজই। তবে তার বেশিরভাগ কাজই ছিল জনস্বার্থবিরোধী। জনমতের পরোয়া না করেই তিনি নিজের মতো দেশ শাসন করতে চেয়েছেন। শুধু চাননি বরং নিজের মতো করেই দেশ শাসন করেছেন। যে কারণে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন প্রতাপশালী স্বৈরশাসক। শেখ হাসিনার পতনের পরও তিনি রয়েছেন আলোচনায়। পতনের এক বছরেরও বেশি সময়জুড়ে শেখ হাসিনার ভুলগুলো নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামল মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা। এর মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে প্রতিষ্ঠিত একটি সর্বজনগ্রাহ্য ব্যবস্থার ইতি টানেন। সেই সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে কখনো রাতের ভোট, কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার একতরফা নির্বাচনের মতো বিতর্কিত প্রক্রিয়া চালু রেখে তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে থাকেন।

বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমনে শেখ হাসিনা নজিরবিহীন উদাহরণ গড়ে তোলেন। সামাজিক মাধ্যমেও তার সমালোচনা করলে গ্রেপ্তারসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ছিল তার শাসনামলের এক ভয়াবহ বাস্তবতা। অনেকের মতে, শেখ হাসিনার আরেকটি বড় ভুল ছিল তার নিয়ন্ত্রণহীন বক্তব্য। তিনি প্রায়ই অপমানজনক, তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করতেন এবং সৌজন্য বোধের অভাব প্রকাশ পেত কথাবার্তায়। রাজাকার, জঙ্গি বা দেশবিরোধী—এ ধরনের শব্দ উচ্চারণ তার কাছে যেন ছিল দৈনন্দিন রাজনৈতিক ভাষার অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা শুধু গণতন্ত্রকে দুর্বল করা ও ভিন্নমত দমনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তার দীর্ঘ শাসনামলে তিনি রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করেন। নিজের ও পরিবারের দুর্নীতিতে জড়ানো, ঘনিষ্ঠজন ও বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া—এসব অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ওঠে। পাশাপাশি ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ভারসাম্যের নামে কূটনৈতিক সম্পর্ক দুর্বল করা এবং দেশের নিয়ন্ত্রণ বহিরাগত শক্তির প্রভাবে ঠেলে দেওয়া—এসব সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত তার নিজের জন্যও ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রচার–প্রচারণা দেশের মানুষের কাছে অনেক সময়ই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। তিনি শেখ মুজিবকে পারিবারিক সম্পদে রূপান্তরিত করেন। পরিবারকেন্দ্রিকতা এতটাই প্রবল ছিল যে পরিবারের বাইরে কাউকে সহজে বিশ্বাস করতেন না। এ ছাড়া অকারণে বিদেশকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দেওয়া, সরকার ও দলকে এক করে ফেলা, ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের উপেক্ষা করা এবং হাইব্রিড নেতৃত্বের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়াও তার বড় ভুল হিসেবে দেখা হয়।

এ ছাড়া বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাষ্ট্রের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ছাত্রলীগ–যুবলীগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারাও শেখ হাসিনার জন্য বিপদ ডেকে আনে। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে যারা তাকে তোষামোদ করত, তাদের বিভিন্ন সুবিধা দিতেন—আর সেই সুযোগেই নিজের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা চলত।

ছাত্র–যুবক ও তরুণদের কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিকে অগ্রাহ্য করাই শেখ হাসিনার পতনের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে দেখা হয়। এই দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন দমাতে তিনি কঠোর দমনপীড়ন ও ভয়াবহ সহিংসতার পথ বেছে নেন। শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি–পুতি’ বলে অপমান করায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। মুহূর্তেই দেশজুড়ে ফুঁসে ওঠে সাধারণ মানুষ। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী এবং অভিভাবকরাও যুক্ত হন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একত্র আন্দোলনে। সবাই রাজপথে নেমে আসার সেই ঢেউই শেষ পর্যন্ত তার বিদায়ের পথ তৈরি করে।

সূত্র : দৈনিক যুগান্তর

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গার্মেন্টস শ্রমিকদের রহস্যজনক অসুস্থতা, হাসপাতালে শতাধিক

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুখ খুলল রাশিয়া

ইরানের এ অবস্থার জন্য ‘দায়ী যুক্তরাষ্ট্র’

ইরানে বিক্ষোভে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় মার্কিন হামলার শঙ্কা

সরকারি কর্মচারীদের জন্য মহার্ঘ ভাতা : কোন গ্রেডে কত

দেশে কত দামে স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে আজ

ঢাকায় ফিফা বিশ্বকাপের মূল ট্রফি

মমতাজের ১১ কোটি টাকার সম্পদ জব্দের নির্দেশ

ঘুম থেকে ওঠার পরই সারা শরীরে ব্যথা হয়? ভয়াবহ রোগের লক্ষণ নয় তো

তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রির ঘরে

১০

ঢাকায় বিশ্বকাপ ট্রফি, ছবি তুলতে মানতে হবে যেসব নিয়ম

১১

‘উত্তপ্ত’ বিসিবি-আইসিসির ভিডিও কনফারেন্স, কী ঘটেছিল সেদিন

১২

কত টাকা চুক্তিতে খুন করা হয় বিএনপি নেতাকে

১৩

আজ ঢাকার তিন জায়গায় অবরোধ ঘোষণা

১৪

বিদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদানে নতুন নির্দেশনা

১৫

ছবিতে প্রথমে কী দেখতে পাচ্ছেন, উত্তরই বলে দেবে কেমন মানুষ

১৬

বায়ুদূষণে শীর্ষে দিল্লি, ঢাকার খবর কী 

১৭

চুরির শাস্তি শীতের রাতে পুকুরে কান ধরে ২০ ডুব

১৮

মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের তিন শাখায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

১৯

এবার ইরান ছাড়তে জরুরি সতর্কতা দিল ফ্রান্স ও কানাডা

২০
X