

আলুর দরপতনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জয়পুরহাটের কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এদিকে হিমাগারে মজুত রাখা আলু নিতে আসছেন না কেউ। ফলে বিপাকে পড়েছেন হিমাগার মালিকরাও। বাজারে আলুর দাম এতটাই কমে গেছে যে, এখন এটি মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি গরুর খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
খড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা বিকল্প হিসেবে গরুকে আলু সিদ্ধ করে খাওয়াচ্ছেন। তারা বলছেন, এখন ৯-১০ মণ আলু বিক্রি করে মাত্র এক কেজি গরুর মাংস কেনা যায়। বাজারে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। অথচ আলুর দাম এমন পর্যায়ে নেমেছে যে বিক্রি করেও লোকসান গুনতে হচ্ছে।
চলতি বছরের আলু উৎপাদন থেকে বাজারে বিক্রি পর্যন্ত আলু চাষিরা লোকসান গুনে এসেছেন। ভালো দাম পাওয়ার আশায় আবাদি আলু হিমাগারেও রাখেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। লোকসানে পড়ে তাদের এখন মাথায় হাত।
জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষক, ব্যবসায়ী ও গরু পালনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হিমাগারে রাখা আলুর দাম না থাকায় তা গরুর খাদ্যে পরিণত হয়েছে। গরু পালনকারীরা বলছেন, খড়ের তুলনায় আলু খাওয়ানো সাশ্রয়ী এবং এতে গরুর স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।
ক্ষেতলাল উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামের গরু পালনকারী জামাল উদ্দীন বলেন, খড়ের দাম এত বেড়েছে যে গরু খাওয়ানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আমার আটটি গরুকে প্রতিদিন দুই কেজি করে আলু সিদ্ধ করে ধানের কুঁড়ার সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াই। এতে গরুর ওজনও ভালো বাড়ছে। তিনি জানান, বর্তমানে শুকনা খড় প্রতি আঁটি ৭ টাকা এবং নতুন ধানের কাঁচা খড় প্রতি আঁটি ৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাই খড়ের ব্যবহার কমিয়ে আলুর ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।
সদর উপজেলার হানাইল গ্রামের কৃষক ও ব্যবসায়ী ফিরোজ হোসেন বলেন, আমি ১০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। এর মধ্যে ৫ বস্তা তুলেছি, কিন্তু বাজারে বিক্রি না করে গরুকেই খাওয়াচ্ছি। খড়ের দামও বেশি, তাই এখন আলু সিদ্ধ করেই গরুকে খাওয়াই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে জয়পুরহাটে ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। ওই জমি থেকে উৎপাদন হয় প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন আলু। জেলার ২১টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন আলু। কিন্তু দাম না থাকায় এখনো কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সেই আলু তুলছেন না। ফলে হিমাগারগুলোতে জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে।
কোমর গ্রামের আলু ব্যবসায়ী দিলবর হোসেন ও কৃষক আবুজার রহমান বলেন, এখন হিমাগার থেকে আলু তুলে বিক্রি করে বড় লোকসান গুনতে হচ্ছে। ৬০ কেজি ওজনের ৬ বস্তা (প্রায় ৯ মণ) আলু বিক্রি করে এক কেজি গরুর মাংস কেনা যায়। হিমাগারে এক বস্তা আলু সংরক্ষণের ভাড়া ৪০০ টাকা, কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০ টাকায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাদিকুল ইসলাম বলেন, যে বছর যে ফসলের দাম ভালো পায়, পরের বছর কৃষক সেই ফসলেই ঝুঁকে পড়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জয়পুরহাটে ব্যাপক আলু চাষ হয়েছে। ফলে এ বছর দাম পড়ে গেছে এবং লোকসানের পরিমাণও বেশি। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৩৯ হাজার হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকদের সরিষা ও গম চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।