

রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনা, কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ, দ্বিপক্ষীয় শুল্ক ও কৃষিপণ্য নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েন—এসব নানা মতবিরোধ সত্ত্বেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে যাচ্ছে। এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের চুক্তি এবং কৃষিপণ্যে শুল্ক ছাড়ের মাধ্যমে দুই দেশ নিজেদের কৌশলগত অংশীদারত্ব ধরে রাখতে চায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারত সরকার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় দেশটি এক বছরে ২২ লাখ টন এলপিজি আমদানি করবে, যা ভারতের মোট বার্ষিক আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ।
ভারতের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি জানান, ‘এটি ভারতের বাজারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কাঠামোবদ্ধ এলপিজি চুক্তি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের জনগণের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এলপিজি নিশ্চিত করতে আমরা উৎসের বৈচিত্র্যে জোর দিচ্ছি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুতবর্ধনশীল এলপিজি বাজার এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত হলো।’
এ চুক্তি এমন একসময় সই হলো, যখন ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নানা ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে, রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থায়নের অভিযোগে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রুশ তেলের আমদানি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
এমন উত্তেজনার মধ্যেও চলমান বাণিজ্য আলোচনা এবং এলপিজি চুক্তি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় কৃষিপণ্যের ওপর আরোপিত শতাধিক খাদ্যপণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে ভারত থেকে চা, কফি, মশলা ও কাজুবাদাম রপ্তানিতে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতের ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনের মহাপরিচালক অজয় সাহাই বলেন, ‘এ শুল্ক ছাড়ের ফলে ২৫০ কোটি থেকে ৩০০ কোটি ডলারের রপ্তানি সুবিধা পাবে ভারত।’
তিনি বলেন, ‘এটি প্রিমিয়াম ও বিশেষায়িত কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়াবে। উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে রপ্তানিকারীরা ঝুঁকলেও তারা মূল্যচাপে পড়বে না এবং চাহিদার বাজারে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে পারবে।’
সরকারি সূত্র বলছে, এ ছাড় চলমান বাণিজ্য আলোচনার জন্য ইতিবাচক বার্তা এবং অতিরিক্ত চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
যদিও সব কৃষিপণ্যে বড় ধরনের সুবিধা মিলবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষক অজয় শ্রীবাস্তব। তিনি বলেন, ‘ভারতের রপ্তানি মূলত কিছু নির্দিষ্ট মশলা ও ছোট পরিসরের পণ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে সীমিত পরিমাণেই সুফল মিলবে।’
তবে তিনি মনে করেন, ‘মশলা ও উচ্চ মূল্যের কৃষিপণ্যে ভারতের অবস্থান কিছুটা শক্ত হবে এবং মার্কিন বাজারে হারানো চাহিদা ফিরে পেতে সহায়ক হতে পারে।’
একই সঙ্গে রপ্তানিকারীরা আশঙ্কা করছেন, অন্যান্য বাধা যেমন উচ্চ পরিবহন খরচ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ—এ সুবিধাকে কিছুটা সীমিত করতে পারে।
একজন রপ্তানিকারক বলেন, ‘শুল্ক ছাড় গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাজার ফিরে পেতে দরকার হবে সঠিক দামে পণ্য সরবরাহ ও লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করা।’
সব মিলিয়ে, উত্তেজনার মধ্যেও এই দুই পদক্ষেপ—এলপিজি চুক্তি ও কৃষিপণ্যে শুল্ক ছাড়—ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মাঝে একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা ও কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও জোরদার করতে পারে বলে আশা বিশ্লেষকদের।