

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চরম উত্তেজনা এবং পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরী মোতায়েনের ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইরান যে কোনো মার্কিন হামলাকে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বহর মধ্যপ্রাচ্য অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। তেহরানে হামলার প্রস্তুতি চলছে বলে খবর দিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম। এর মধ্যে ইরানের মিত্র ইরাকের কাতাইব হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী হুমকি দিয়ে বলেছে যে, তেহরানে হামলা হলে তারা একে আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, ইরানে যে কোনো মার্কিন হামলা আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে।
আলজাজিরা বলেছে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুত উপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন রণতরী ‘আর্মাদা’ উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে।
ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতির অংশ হিসেবে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি, প্যাট্রিয়ট, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানি দরপতনের প্রেক্ষাপটে বিক্ষোভ শুরু হয় তেহরানে। পরে দ্রুত সেই কর্মসূচি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। সেই বিক্ষোভ দমনে কঠোর হয় প্রশাসন। এতে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন বলে ইরানের সরকারি সূত্র জানায়। তবে গতকাল যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যালনালের সম্পাদকীয় বোর্ডের পর্যালোচনা করা নথিতে বলা হয়েছে, গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি দেশব্যাপী বিক্ষোভে দমন-পীড়নে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে সাড়ে ৩৬ হাজারের বেশি ইরানি নিহত হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমটি মাঠ প্রতিবেদন, চিকিৎসাকর্মী, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনার নিহতের এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এদিকে ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে দেশটিতে ইন্টারনেট বন্ধ করা হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণরূপে চালু হয়নি। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসুফ পেজেশকিয়ান দ্রুত কর্তৃপক্ষকে ইন্টারনেট সচল করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ আন্দোলন শুরুর পর থেকে এতে সমর্থন দিয়েছে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এ আন্দোলনকে তাদের ষড়যন্ত্র বলে আসছিল তেহরান। এর মধ্যে ইরানকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প।
তেহরান সতর্ক করেছে যে, তাদের ভূখণ্ড বা স্বার্থে যে কোনো হামলা হলে তা ‘সবচেয়ে কঠিন জবাব’ পাবে। একে তারা আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আকাশপথের যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে।
ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ইরানের মিত্র কাতাইব হিজবুল্লাহ ইরানের বিরুদ্ধে হামলাকে ‘পূর্ণ যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করবে। গোষ্ঠীর প্রধান আবু হুসাইন আল হামিদাওয়ি গত রোববার রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, যোদ্ধাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমরা শত্রুদের নিশ্চিত করছি যে ইরানে হামলা কেবল পার্কে হাঁটার মতো মামুলি বিষয় নয়। বরং তারা মৃত্যুর তিক্ততম রূপের স্বাদ গ্রহণ করবে এবং এ অঞ্চলে তোমার কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
এর মধ্যে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর করিডোর দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজে নতুন করে আক্রমণের হুমকি দিয়েছে। ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি দেওয়ার পর গতকাল সোমবা এ হুমকি দেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের কারণ হতে পারে।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, ছোটখাটো ভুল গণনা বা উস্কানিও ভয়াবহ সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে।
মন্তব্য করুন