বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:২১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেভাবে যুদ্ধে চাল দিয়েছে ইরান-চীন

দ্য ক্রেডলের বিশ্লেষণ
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স
ছবি : কালবেলা গ্রাফিক্স

যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান ও চীন যেন নীরব কিন্তু সুপরিকল্পিত এক দাবাড় বোর্ড সাজিয়েছে। এ বোর্ডে প্রতিটি চাল হিসাব করে দেওয়া, যার প্রতিটি অবস্থান দীর্ঘমেয়াদি। আর প্রতিটি বার্তা একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিবেচনা করে দেওয়া হচ্ছে।

ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে চীন কেবল যুদ্ধ হিসেবে দেখছে না। তারা এটিকে দেখছে একটি বহুমাত্রিক সংঘর্ষ হিসেবে। একদিকে কূটনৈতিক ভাষ্য, অন্যদিকে সামরিক সতর্কতা। চীনের সামরিক মুখপাত্র সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধই যেন তাদের স্বাভাবিক অবস্থা।

অন্যদিকে, চীনের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সূক্ষ্ম। তারা নৈতিকতার প্রশ্ন তুলছে। বলছে, এটি এমন এক শক্তির আগ্রাসন, যারা নিজেদের নৈতিক দিকনির্দেশনা হারিয়েছে। এই বার্তা বিশেষভাবে লক্ষ্য করে পাঠানো হচ্ছে গ্লোবাল সাউথের দিকে—যেখানে পশ্চিমা আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে।

যুদ্ধে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাও বদলাচ্ছে দ্রুত। ইরান এখন প্রযুক্তিগতভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম। তাদের কৌশলগত নেটওয়ার্ক চীনা স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এর ফলে লক্ষ্যভেদ আরও নিখুঁত হয়েছে। শত্রুপক্ষের জ্যামিং প্রতিরোধ করার সক্ষমতাও বেড়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই সময় এখন ইরানের হাতে কম লাগছে।

চীন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে ইরানকে উন্নত রাডার প্রযুক্তি দিয়েছে। এই প্রযুক্তি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সমন্বিত। ফলে নজরদারি ও প্রতিক্রিয়া—দুটোই দ্রুত। অন্যদিকে রাশিয়া তাদের যুদ্ধ অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কীভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করতে হয়—সেই কৌশল এখন ইরানের হাতে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই সমন্বয় যুদ্ধের চরিত্রই বদলে দিয়েছে। এটি আর শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়। এটি প্রযুক্তি, তথ্য ও কৌশলের সমন্বিত প্রয়োগ।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালটি এসেছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্র থেকে। হরমুজ প্রণালি—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ—এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণে নতুনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, কেবল সেই ট্যাংকার চলাচল করতে পারবে, যেগুলোর লেনদেন ইউয়ানে সম্পন্ন হয়েছে।

এটি একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি আর্থিক বার্তা। ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

দশকের পর দশক ধরে তেল বাণিজ্য ডলারের ওপর নির্ভরশীল। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু এখন সেই কাঠামোতে ফাটল ধরছে। ইরান সেই ফাটলকে বড় করছে। চীন সেই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে।

এরই মধ্যে ইরানের তেল রপ্তানির বড় অংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে। বিকল্প আন্তঃব্যাংক ব্যবস্থা ব্যবহার করে তারা ডলারকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি দেশের সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি মডেল, যা অন্য দেশগুলোও অনুসরণ করতে পারে।

চীন এই পরিবর্তনের জন্য বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং গবেষণা—সবকিছু একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ। তারা ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। শুধু ২০৩০ নয়, বরং আরও অনেক দূরের জন্য।

এ পরিকল্পনায় রয়েছে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। প্রতিটি খাত অন্যটির সঙ্গে যুক্ত। যেন একটি জীবন্ত দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

এ প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির সিদ্ধান্তটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি সামরিক অবরোধ নয়। বরং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। বাস্তব সময়েই বাণিজ্য পথকে ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে রূপ দেওয়া হচ্ছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এ কৌশলকে আরও শাণিত করেছে। তারা প্রাচীন রণকৌশলকে আধুনিক বাস্তবতায় প্রয়োগ করছে। সরাসরি সংঘর্ষের বদলে নিয়ন্ত্রণ, চাপ এবং ধৈর্যের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এই পুরো পরিস্থিতিকে বোঝাতে অনেকেই দাবার উদাহরণ দিচ্ছেন। তবে এটি শুধু দাবা নয়। এর মধ্যে রয়েছে আরেকটি খেলার উপাদান—যেখানে ধীরে ধীরে অবস্থান তৈরি করা হয়, ঘিরে ফেলা হয়, এবং শেষে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

চীন দীর্ঘদিন ধরে সেই খেলাই খেলছে। তারা একের পর এক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। আঞ্চলিক জোট গড়ে তুলেছে। নতুন বাণিজ্য পথ নির্মাণ করেছে। বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সবকিছুই ধীরে, কিন্তু স্থিরভাবে।

এখন সেই প্রস্তুতির ফল দেখা যাচ্ছে। সংঘাতের মধ্যেই তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি যুদ্ধের গল্প নয়। এটি একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত। যেখানে শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে।

এই দাবাড় বোর্ডে শেষ চাল এখনো বাকি। কিন্তু বোর্ডটি এরই মধ্যে সাজানো। আর খেলোয়াড়রা—তারা জানে, প্রতিটি চালের মূল্য কতটা গভীর।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোহাম্মদপুরে অভিযান, বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ৬

এবার কন্যাসন্তানের বাবা হলেন শাকিব খান

রাতে মাঠে নামছে বাংলাদেশ-সান মারিনো, আলোচিত ম্যাচের ১০ তথ্য

হোমিওপ্যাথির পক্ষে পোস্ট করে তোপের মুখে আনুশকা শর্মা

ভারতকে হারিয়ে হ্যাটট্রিক শিরোপা জিততে মরিয়া বাংলাদেশ

দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১

পানির লাইন মেরামতের সময় বিদ্যুৎস্পর্শে বাবা-ছেলের মৃত্যু

হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভাসানী জনশক্তি পার্টির বিবৃতি

তরুণকে বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষককে গণপিটুনি

১০

‘রকস্টার’ উন্মাদনার মাঝেই ‘সোলজার’ নিয়ে শাকিবের নতুন চমক

১১

পুতিনকে বৈঠকের প্রস্তাব জেলেনস্কির, কী বলছে ক্রেমলিন

১২

ফ্রান্সের পরাজয়ে বড় সুখবরের সঙ্গে দুঃসংবাদও পেল আর্জেন্টিনা

১৩

বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় টেইলর সুইফট, সম্পদ ছাড়াল ২ বিলিয়ন ডলার

১৪

ভাঙা স্লিপারের ওপর দিয়েই ছুটছে ট্রেন

১৫

২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর তিন দফায় হামলা চালাল লেবাননের যোদ্ধারা

১৬

দেশের সংখ্যালঘুরা বিএনপির আমলেই সবচেয়ে নিরাপদে বসবাস করে : হুইপ দুলু

১৭

পঞ্চগড় সীমান্তে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধা

১৮

বিয়ে করলেন দীপ্তি চৌধুরী, পাত্র কে?

১৯

পাপারাজ্জি দেখে ইব্রাহিমের লুকোচুরি, কথিত প্রেমিকাকে আড়ালের চেষ্টা

২০
X