ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক রদবদল চলছে। পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে সব সেক্টরেই। রাষ্ট্র সংস্কারের চলমান প্রেক্ষাপটে কেউ স্বেচ্ছায়, আবার কেউ বাধ্য হয়ে পদত্যাগপত্রে সই করছেন। এ থেকে বাদ যায়নি বিচারাঙ্গনসহ বড় বড় স্বায়ত্তশাসিত এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনের বিষয়টিও জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে।
ইসি সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মতো সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনও নিজেদের নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। যে কোনো সময় এ সংস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ আসতে পারে বলে মনে করছেন তারা। সেজন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতও রয়েছেন। আপাতত তারা সরকারের সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছেন।
একটি সূত্র জানায়, সরকার পতনের পর ছাত্র বিক্ষোভের মুখে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরাও পদত্যাগ করেছেন। এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে তারাও পদ থেকে সরে যাবেন।
২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয় কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন। সাংবিধানিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন তারা। অন্য কমিশনাররা হলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান হাবীব খান, অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ বেগম রাশিদা সুলতানা, অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সচিব আনিছুর রহমান। শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণ করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ আয়োজন করে কমিশন। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারবিরোধী জোট এই কমিশনকে শেখ হাসিনা সরকারের ‘আজ্ঞাবহ’ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের সেই সংলাপ প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলগুলো নিয়ে নানা ধরনের কটূক্তিমূলক বক্তব্য দেন কমিশনাররা। বিরোধী দলগুলোর বিরোধিতা ও বর্জন সত্ত্বেও এই কমিশনের অধীনে এই বছরের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হয়। আর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এতে আগের কমিশনের মতো এই কমিশনকেও আওয়ামী লীগ সরকারের চূড়ান্ত সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের ঝড় শুরু হয়। একে একে পদত্যাগ করেন স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা। কোনো কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিজে থেকেই গা-ঢাকা দেন। সরাসরি পদত্যাগপত্র জমা না দিয়ে ‘হোয়াটস অ্যাপ’সহ বিভিন্ন মাধ্যমে পদত্যাগপত্র জমা দেন কেউ কেউ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে বিদায় নেন আব্দুর রউফ তালুকদার। এমনকি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকেও পদত্যাগ করতে হয়। শেখ হাসিনা সরকারের নিয়োগকৃত ও সুবিধাভোগী কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে থাকতে পারবেন না বলে ঘোষণা রয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের। দেশের সব মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কমিশনের প্রধানদের আওয়ামী লীগ সরকারের ‘দোসর’ উল্লেখ করে তাদের গতকাল মঙ্গলবারের মধ্যেই অপসারণের আলটিমেটাম দিয়ে সচিবালয় ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনের সমন্বয়করা। গতকাল নিজেদের ফেসবুক পোস্টে এমন ঘোষণা দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, আইন কমিশনসহ সব কমিশনে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসররা এখনো বসে আছে। আজকের মধ্যেই সব ফ্যাসিস্ট আমলাদের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে এবং সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক আমলাদের নিয়োগ দিতে হবে।’ আরেক সমন্বয়ক সাদিক কায়েম বলেন, ‘সব সচিব এবং দপ্তর, অধিদপ্তর ও কমিশন প্রধানকে আজকের মধ্যে অপসারণ করতে হবে। না করলে প্রশাসনের ভেতরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা সরাতে সচিবালয় ঘেরাও হবে।’
এদিকে, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পরদিনই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আন্দোলনকারী বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের চাপে সংসদ বিলুপ্ত করেন। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। যদি দৈব দুর্বিপাকে তা না করা যায়, তাহলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা না থাকলেও জরুরি পরিস্থিতির প্রয়োজনে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন যে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তারা কতদিন থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে ১৯৯০, ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে আন্দোলন-অস্থিরতার মধ্যে সরকার পরিবর্তনের পর প্রথমেই নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে সিইসিসহ অন্য কমিশনারদের ওপর পদত্যাগের চাপ বাড়ছে।
৮ আগস্ট দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগের দাবিতে ইসি সচিবালয়ের মূল গেটের দুই পাশে ব্যানার টানান বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। ওই ব্যানারে লেখা রয়েছে, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা হত্যা এবং গণহত্যার দায়ে সকল নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগ করতে হবে’— ছাত্র-জনতা। তারপর থেকে হাবিবুল আউয়াল কমিশনের পদত্যাগ নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। সরকার পতনের এক সপ্তাহ পর গত সোমবার নির্বাচন ভবনে সিইসি ও সচিব শফিউল আজিমসহ সব কমিশনার বৈঠকে বসেন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকের খবর ছড়িয়ে পড়লে কমিশনের পদত্যাগের গুঞ্জন আরও ডালপালা মেলতে থাকে। তবে পরে নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন কোনো সিদ্ধান্ত তারা এখনো নেননি।
নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমানও পদত্যাগের গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘এটা সঠিক না। আমরা এ নিয়ে কিছুই আলোচনা করিনি। পদ্ধতিগত বিষয় আছে। পদ্ধতি মেনেই সব হবে।’ ‘আমরা অপেক্ষায় আছি, সামনে কিছু আসে কি না’ যোগ করেন তিনি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিইসিসহ কমিশনাররাও নিচ্ছেন মানসিক প্রস্তুতি। চলমান প্রেক্ষাপটে আগামীতে কমিশনের নেতৃত্বে কারা আসবেন, কবে নাগাদ গঠিত হবে, সেই কমিশন এসব বিষয় নিয়েই কানাঘুষা চলছে।
এর আগে ৬ আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করা হলে সেদিন প্রথম কার্যদিবস ও তার পরদিনও অফিস করেননি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। অন্য চার নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশিদা সুলতানা, আহসান হাবীব খান, মো. আলমগীর ও আনিছুর রহমানও ৬ আগস্ট অফিস করেননি। তবে ৭ আগস্ট অফিস করেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবীব খান ও মো. আলমগীর। এ সময় তাদের বেশ চিন্তিত দেখা যায়। এ ছাড়া প্রথম দুই দিন ইসির অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও অফিস করেননি।
গত ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তারপর থেকে সিইসিসহ নির্বাচন কমিশনারদের জন্য বরাদ্দপ্রাপ্ত বিএমডব্লিউ গাড়ি সরিয়ে নিয়ে পাজেরো গাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই দিন অন্তর্বর্তীকালীন নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলেও পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার অজুহাতে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বঙ্গভবনে যাননি কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ চার নির্বাচন কমিশনার।
বাংলাদেশের সংবিধান (১১৮ অনুচ্ছেদ) অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং চারজন নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতির আদেশে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর রাষ্ট্রের যে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায় অথবা রাষ্ট্রপতির আদেশে পদত্যাগ করবেন। নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ এসব পদে কার্যকালের মেয়াদ তাদের কার্যভার গ্রহণের দিন থেকে পাঁচ বছর।