ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে ভিপি (সহসভাপতি) পদে লড়ছেন উমামা ফাতেমা। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণ, ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তার পরিকল্পনা এবং বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সামগ্রিক ভাবনাসহ নানা বিষয়ে কালবেলার নিজস্ব প্রতিবেদক আমজাদ হোসেন হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এই মুখপাত্র
আপনি স্বতন্ত্র প্যানেলে কেন নির্বাচন করছেন এবং নিজেদের প্যানেল পর্যালোচনা কীভাবে করবেন?
উমামা ফাতেমা: স্বতন্ত্র প্যানেলে নির্বাচন করার প্রধান কারণ হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি দেখা বা সংস্কার আসলে কেমন হবে—তা নিয়ে সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কোনোভাবে সম্ভব হচ্ছিল না। আর ৫ আগস্ট-পরবর্তী একটি নতুন বাংলাদেশে আমরা আগের ছাত্ররাজনীতির ব্যবস্থার মধ্যে যেতে চাই না। সে কথা চিন্তা করেই নতুন একটি প্যানেলের কথা আমরা ভেবেছিলাম, যার মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতির প্রশ্নে আমার একটি নতুন ভিউ পয়েন্ট হাজির করতে পারব। ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়া, যারা কোনো ছাত্র
সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন; কিন্তু যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তায় এগিয়ে। বিভিন্ন বিষয়ে এক্সপার্ট এবং রাজনৈতিক দলের প্যানেলে যেতে চান না—এমন শিক্ষার্থীদের নিয়েই আমরা প্যানেলটি নির্বাচন করেছি।
কালবেলা: শিক্ষার্থীরা আপনাদের প্যানেলকে কেন বেছে নেবে?
উমামা ফাতেমা: আমরা মনে করি ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে ছাত্ররা নতুন কিছু দেখতে চায়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিয়ে চিন্তা করে, একাডেমিক এক্সিলেন্স নিয়ে চিন্তা করে এবং শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে দেখতে চায়। এজন্য আমরা আমাদের প্যানেল নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী, কারণ যারা বিশ্ববিদ্যালয়কে তার মূল রূপে দেখতে চান এবং বাস্তবিক পরিবর্তন চান, তারা এ প্যানেলকে সমর্থন করবেন। আমাদের প্যানেলকে বেছে নেওয়ার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে—আমাদের প্যানেলে যে শিক্ষার্থীরা আছেন, নিজ নিজ জায়গায় তাদের নিজস্বতা আছে, দক্ষতা আছে এবং সবসময় দেখা যাচ্ছে, ক্যাম্পাসের অন্যায়-অনিয়ম নিয়ে সবসময় তারা কথা বলছেন। যারা রাজনৈতিক ব্যক্তি তৈরির কারখানায় হিসেবে দেখতে চায় না তারা আসলে আমাদের প্যানেলকে বেছে নেবে।
কালবেলা: বর্তমানে ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে কী বলবেন?
উমামা ফাতেমা: এখন পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে। কিন্তু অনেক প্রার্থীই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। সে বিষয়ে প্রশাসন যথেষ্ট পরিমাণ সোচ্চার নয় বরং নীরব ভূমিকা পালন করছে। আমরা আশা করব—প্রশাসন এ বিষয়ে আরও বেশি ভূমিকা পালন করবে।
কালবেলা: আপনি নারী প্রার্থী হিসেবে নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনে কী কী করবেন?
উমামা ফাতেমা: এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের যে আবাসন সংকট, তা নিরসনে আমি সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করব। এক হলের ছাত্রীরা যাতে আরেক হলে প্রবেশ করতে পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি কাজ করব। এ ছাড়া ফ্যাকাল্টিভিত্তিক ডে-কেয়ার স্থাপন করায় মনোযোগ দেব আমি। কেননা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক নারী শিক্ষার্থীকে তাদের সন্তানদের দেখাশোনা এবং একাডেমিক পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে যেতে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। তাদের শিক্ষাজীবন মসৃণ করার লক্ষ্যে ফ্যাকাল্টিভিত্তিক ডে-কেয়ার সেন্টার চালু করতে হবে। এটি চালু করলে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষার পাশাপাশি একাডেমিক লাইফে চাপ কিছুটা প্রশমিত হবে। এ ছাড়া হলের খাদ্য সমস্যা নিরসন করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য। ক্যাম্পাসে বহিরাগত, ভবঘুরের মাধ্যমে নিজ ক্যাম্পাসেই ছাত্রীরা হেনস্তার শিকার হন, সেটা পুরোপুরি নির্মূল করে একটি নারীবান্ধব ক্যাম্পাস গঠনে আমি বা আমাদের প্যানেল কাজ করবে।
কালবেলা: এবারের নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি। ফলাফলে নারীরা কেমন করতে পারে?
উমামা ফাতেমা: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে ক্যাম্পাসের নারী শিক্ষার্থীরা। গত কয়েক বছর নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। নারী ভোটাররা যেমনভাবে গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে শামিল ছিল, তেমনি নেতৃত্বও দেবে। আশা করি এবারের ডাকসুতে সর্বোচ্চ নারী প্রতিনিধিত্ব আমরা দেখতে পাব।
কালবেলা: নির্বাচিত হলে সার্বিকভাবে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
উমামা ফাতেমা: নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে একাডেমিক ক্যাম্পাসে রূপান্তরিত করার জন্য আমি কাজ করব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যে অবস্থা বিরাজ করছে, তা পরিবর্তনে বড় ধরনের একাডেমিক সংস্কার প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় যেন শিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত না হয়, সেজন্য শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও ক্যারিয়ার প্রস্তুতিতে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেমন ওপেন ক্রেডিট সিস্টেম চালু, থিসিস ও ইন্ডাস্ট্রিতে ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা, ইনোভেশন ও রিসার্চ সামিট আয়োজন, ক্যাম্পাসে ‘ইন-ক্যাম্পাস জব সুবিধা’, প্রশাসনিক সেবা ডিজিটালাইজ করা, অ্যালামনাই ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ইত্যাদি। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের সব ধরনের সমস্যা নিরসনে প্রশাসন যাতে ভূমিকা পালন করে, তার জন্য প্রশাসনিক সংস্কার আনার জন্য আমি সরব থাকব এবং সে বিষয়ে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করব। কারণ শিক্ষার্থীদের জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের, তাদের সঙ্গে দরকষাকষি এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগ করার দায়িত্ব আমাদের। প্রশাসনের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান যাতে হয় আমরা সেটা নিশ্চিত করব।
মন্তব্য করুন