

ডাকসুর পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনেও ছাত্রশিবিরের জয়জয়কার। গতকাল শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করে জাকসু নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদে শীর্ষ চার পদের তিনটিসহ মোট ২৫টি পদের মধ্যে ২০টি পদে বিজয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা। তবে ৩৩ বছর পর জাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) এসেছে স্বতন্ত্র থেকে। আর শেষ মুহূর্তে ভোট বর্জন করা ছাত্রদলের প্যানেল থেকে কেন্দ্রীয় পদে একটি জয়ও আসেনি।
জাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ছাত্রশিবির মনোনীত প্যানেলের মো. মাজহারুল ইসলাম নির্বাচিত হয়েছেন। এজিএস (পুরুষ) পদে ফেরদৌস আল হাসান ও এজিএস (নারী) পদে আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা নির্বাচিত হয়েছেন। তারা দুজনই ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী।
অন্য পদগুলোতে নির্বাচিতরা হলেন শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক আবু ওবায়দা ওসামা (শিবির প্যানেল), পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক মো. শাফায়েত মীর (শিবির), সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম (শিবির), সাংস্কৃতিক সম্পাদক মহিবুল্লাহ শেখ জিসান (স্বতন্ত্র), সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. রায়হান উদ্দীন (শিবির), নাট্য সম্পাদক মো. রুহুল ইসলাম (শিবির), ক্রীড়া সম্পাদক মাহমুদুল হাসান কিরন (স্বতন্ত্র), সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) ফারহানা আক্তার লুবনা (শিবির)।
এ ছাড়া সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (পুরুষ) মো. মাহাদী হাসান (শিবির), তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক মো. রাশেদুল ইসলাম লিখন (শিবির), সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক আহসাব লাবিব (গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-বাগছাস), সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (নারী) নিগার সুলতানা (শিবির), সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) মো. তৌহিদ হাসান (শিবির), স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক সম্পাদক হুসনী মোবারক (শিবির) এবং পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক মো. তানভীর রহমান (শিবির প্যানেল)।
আর কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে তিনজন—নাবিলা বিনতে হারুন, ফাবলিহা জাহান, নুসরাত জাহান ইমা এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে তিনজন মো. তরিকুল ইসলাম, আবু তালহা শিবির সমর্থিত প্যানেলের। বাকি মো. আলী চিশতী বাগছাসের।
গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। এরপর ভোট গণনা শেষে ফল প্রকাশ করতে সময় লেগেছে ৪৮ ঘণ্টা। এবারের জাকসু নির্বাচনে ১১ হাজার ৭৫৯ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৫টি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১৭৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ভিপি পদে ৯ জন, জিএস পদে আটজন এবং এজিএস পদে ১৬ জন প্রার্থী রয়েছেন। নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছয়।
নির্বাচনে অংশ নিয়েছে মোট আটটি পূর্ণ ও আংশিক প্যানেল। তবে ভোটগ্রহণ শুরুর পর কারচুপিসহ, নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলসহ পাঁচটি প্যানেল নির্বাচন বর্জন করে। বর্জনকারীদের মধ্যে রয়েছে প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতির ঐক্য, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফ্রন্টের ‘সংশপ্তক পর্ষদ’ এবং স্বতন্ত্রদের ‘অঙ্গীকার পরিষদ’।
হল সংসদে ভিপি-জিএস-এজিএস হলেন যারা: কেন্দ্রীয় সংসদের ফল ঘোষণার আগে হল সংসদের ফল ঘোষণা করা হয়। এতে ১৩ নম্বর (নারী) হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন নাহাদাতুন হাসানা, জিএস মোহসিনা তুবা ও এজিএস সাদিয়া মেহজাবিন। বেগম খালেদা জিয়া হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন ফারহানা রহমান, জিএস হয়েছেন ফাতেমা তুজ-জোহরা এবং এজিএস রায়হানা সরকার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন অমিত কুমার বণিক, জিএস হয়েছেন মাহমুদুল হাসান, এজিএস মির্জা আদনান ইসলাম (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা)। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন সিফাত উল্লাহ, জিএস মাহমুদুল হাসান ও এজিএস তারিক আহমেদ।
ফজিলতুন নেছা হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন ঐশী সরকার (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা), জিএস ফারজানা তাবাসসুম ও এজিএস প্রমা রাহা। শহীদ রফিক-জব্বার হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন মেহেদি হাসান, জিএস শরিফুল ইসলাম ও এজিএস আরিফুল ইসলাম। ২১ নম্বর (পুরুষ) হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন ইবনে শিহাব, জিএস হয়েছেন ওলিউল্লাহ মাহাদী ও এজিএস তুষার আহমেদ। কাজী নজরুল ইসলাম হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন রাকিবুল ইসলাম, জিএস আলী আহমেদ ও এজিএস সামিন ইয়াসির। আ ফ ম কামাল উদ্দিন হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন জিএমএম রায়হান কবীর, জিএস আবরার শাহরিয়ার ও এজিএস রিপন মণ্ডল (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা)।
মীর মশাররফ হোসেন হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন খালেদ জুবায়ের, জিএস শাহরিয়ার নাজিম ও এজিএস আরাফাত হোসেন। মওলানা ভাসানী হল সংসদের ভিপি হয়েছেন আবদুল হাই স্বপন, জিএস হৃদয় পোদ্দার ও এজিএস রাকিব হাসান। শহীদ সালাম-বরকত সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন মারুফ হোসেন, জিএস মাসুদ রানা ও এজিএস আবরার আজিম ভূঁইয়া। আলবেরুনী হলের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন রিফাত আহমেদ শাকিল, জিএস মুনতাসির বিল্লাহ খান ও এজিএস সাদমান হাসান খান। নওয়াব ফয়জুন্নেসা হলের ভিপি হয়েছেন বুবলী আহমেদ (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা), জিএস সুমাইয়া খানম (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা) ও এজিএস প্রার্থী নেই। ১০ নম্বর (পুরুষ) হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন আসিফ মিয়া, জিএস মেহেদী হাসান ও এজিএস নাদিম মাহমুদ। ১৫ নম্বর (নারী) হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন শারমীন খাতুন (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা), জিএস মেহনাজ মোহনা ও এজিএস শাহানা আক্তার।
ভোটের দুদিন পরও কমিশনারের পদত্যাগ: গতকাল দুপুরে জাকসুর নির্বাচন কমিশনের আরেক সদস্য ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা পদত্যাগ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের সমাজবিজ্ঞান ভবন কমিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিনিধি ছিলেন। আগের দিন শুক্রবার রাতে নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার পদত্যাগ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি এবং ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষক। পদত্যাগের পর রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে আমরা যা বুঝি নির্বাচনে সেটি ছিল না। আমি যাতে পদত্যাগ না করি, সেজন্য গতকাল থেকেই আমার ওপর চাপ ছিল, তবু আমি পদত্যাগ করছি।’
এদিকে ভোট গণনা দেরি হওয়ার সম্পর্কে সাংবাদিকদের নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক সুলতানা আক্তার বলেন, ‘হল সংসদে একটি মাত্র ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সংসদের ব্যালট তিন পৃষ্ঠার। অর্থাৎ প্রদত্ত ভোট যদি প্রায় ৮ হাজার হয়, তাহলে শুধু কেন্দ্রীয় সংসদে ২৪ হাজার কাউন্ট (গণনা) করতে হবে।’
এর আগে ভোট গণনার ওএমআর মেশিন নিয়ে কয়েকটি প্যানেল আপত্তি তোলে। পরে সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে ভোট গণনার ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন। তখন বলা হয়, হাতে গণনা করা হবে।