

গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে জোরালো আন্দোলন গড়ে উঠেছে ইরানে। সরকার আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন ২ হাজার ২ শতাধিক। এরই মধ্যে গতকাল দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, ‘আন্দোলনকারীরা নাশকতা চালানো ব্যক্তি।
সরকার একচুলও পিছু হটবে না।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘এই আন্দোলন বিদেশি ষড়যন্ত্রে প্ররোচিত।’
খামেনি বলেন, ‘প্রতিবাদকারীরা নিজেদের রাস্তাঘাট ধ্বংস করছে শুধু যেন অন্য দেশের প্রেসিডেন্ট খুশি হয়। কারণ, সে বলেছে সাহায্য করবে।’ এ মন্তব্যে তিনি পরোক্ষভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করেন।
এই উত্তেজনার মধ্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আবারও ইরানের জনগণের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে।’
এর কয়েক ঘণ্টা আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের নেতৃত্বকে নতুন করে হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘গুলি চালানো শুরু না করাটাই আপনাদের জন্য মঙ্গলজনক। কারণ আপনারা শুরু করলে আমরাও গুলি চালাব।’
এই হুমকির পর দেশটির সেনাবাহিনীও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সেনাবাহিনী বলেছে, তারা কৌশলগত অবকাঠামো ও জনসম্পত্তি সুরক্ষায় সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ‘শত্রুর ষড়যন্ত্র’ নস্যাতে ইরানের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, ‘ইসরায়েল ও কিছু শত্রুভাবাপন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দেশের জননিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।’
আন্দোলনের সূত্রপাত হয় মুদ্রার মূল্যে ধস নামার পর। তবে খুব দ্রুতই তা রাজনৈতিক সংস্কার ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয় এবং গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন এলাকার আন্দোলনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুক্রবার তেহরানের সাদাতাবাদ এলাকায় মানুষ হাততালি দেয় এবং হাড়ি-পাতিল বাজিয়ে ‘খামেনি নিপাত যাক’ স্লোগান দেয়।
এই আন্দোলনকে ২০২২-২৩ সালের বৃহৎ বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা বলছেন অনেকে। সে সময় মাশা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কারণ, অর্থনৈতিক সংকট ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার ফলে সরকার আরও দুর্বল এখন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘খামেনি এখন পালানোর পথ খুঁজছে। অবস্থা ভয়াবহ।’ এদিকে ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মহসেনি এজেই হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ করা হবে।’
ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছে। তারা বলেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর তারা নিন্দা করছেন। তারা বলেন, ইরানি জনগণের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
ইরানের বেলুচ-সংখ্যাগরিষ্ঠ জাহেদানে শুক্রবার নামাজের পর বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। মানবাধিকার সংস্থা হেংগাও জানিয়েছে, এতে অনেকেই আহত হন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ইন্টারনেট বন্ধ করে আসল সত্য গোপন করার চেষ্টা করছে ইরান সরকার। ৩৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ আছে বলে জানিয়েছে নেটব্লকস।
নরওয়েভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস বলছে, এ পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৬২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জন শিশু। বৃহস্পতিবার তেহরানের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। সরকারি সম্প্রচার কেন্দ্রের একটি ভবনে আগুন দেয়। তারা পুরোনো আমলের ইরানি পতাকা (সিংহ-সূর্য চিহ্নযুক্ত) উড়িয়ে বিক্ষোভ করেন।
এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে রাজপথে নেমেছেন নির্বাসিত যুবরাজ রেজা সিরি পাহলাভি। বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাত ৮টায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘খামেনি এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ব্যবহার করে সাহসী তরুণদের হত্যা করতে চায়।’
রেজা সিরি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে আছেন। তিনি ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের যুবরাজ ছিলেন। তখন তাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি দেশ ছেড়ে যান। সেই থেকে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন এবং বিভিন্ন সময় ইরানি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করে আসছেন।
তেহরানের ২৫ বছর বয়সী শিল্পী মরিয়ম জানান, পুলিশ আর মিলিশিয়া মোটরসাইকেলে জনতার মধ্যে ঢুকে পড়ে। চোখ লক্ষ্য করে গুলি চালায়।’ তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট কখন যে কেটে যাবে জানি না। কিন্তু আমরা হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়, আমি ভয় পাচ্ছি আগামীকাল অনেকের লাশ দেখতে হতে পারে।’
শুক্রবার ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রথমবারের মতো আন্দোলনের কথা স্বীকার করে, তবে একে ‘সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব’ বলে অভিহিত করে। তারা দাবি করে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টরা বিক্ষোভের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
বৈরুতে শুক্রবার, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘এই বিক্ষোভে বিদেশি হস্তক্ষেপ আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করছে।’ যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ‘বিভ্রমগ্রস্ত’।
তেহরানের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হোসেইন বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের সময় যেমন বিকল্প পন্থায় তথ্য আদান-প্রদান করতাম, এবারও সেই চেষ্টা করছি। কিছু ‘গোপন চ্যানেল’ দিয়ে আমরা এখনো বার্তা পাঠাতে পারছি, যদিও মোবাইল নেটওয়ার্কে সমস্যা হচ্ছে।’
বিক্ষোভকারীদের অনেকে রেজা পাহলাভির ডাকে সাড়া দিয়েছেন। ৪৬ বছর বয়সী আন্দোলনকারী মেহনাজ বলেন, ‘২০২২ সালে আমরা একক নেতৃত্বে একত্র হতে পারিনি, কিন্তু এবার শিখেছি। আমাদের বাঁচার জন্য পাহলাভির পেছনে একত্র হতে হবে।’
পাহলাভি বলেছেন, ‘তোমরা সবাই বৃহস্পতিবার রাতে যেভাবে রাস্তায় নেমেছিলে, আমি গর্বিত। ইন্টারনেট বন্ধ হলেও তোমরা থেমে যাবে না।’ তার সংগঠন দাবি করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর বহু সদস্য বিদ্রোহ করতে চান। তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ অনুরোধ আসছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী রাইফেল ও শটগানে ধাতব গুলি ব্যবহার করছে। ৩১ ডিসেম্বর থেকে ৩ জানুয়ারির মধ্যে কমপক্ষে ২৮ জন গুলিতে নিহত হয়েছেন।
সংগঠনের গবেষক বাহার সাবা বলেন, ‘২০১৯ সালের নভেম্বর এবং ২০২২ সালে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের সময় যেমন দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল, এবারও সেই চিত্রই আমরা দেখছি।’ ইসলামী প্রজাতন্ত্রবিরোধী ক্ষোভ সপ্তাহজুড়ে টগবগ করে ফুটছে। বুধবার গনাবাদ শহরের একটি শিয়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ঢুকে মানুষ কর্মীদের মারধর করে, ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মন্তব্য করুন