

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য ৪৭টি আসন রেখে বাকি ২৫৩ আসনে সমঝোতা হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলের মধ্যে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’। এই জোটে ইসলামী আন্দোলনকে রাখতে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে বাকি ১০ দল। চূড়ান্ত সমঝোতায় রাজি করতে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আলোচনার জন্য দলগুলোর পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হককে। এদিকে, আজ শুক্রবার পৃথক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে ২৫৩ আসনে সমঝোতা ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।
২৫৩ আসনের সমঝোতা অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলাম ১৭৯ আসন, এনসিপি ৩০ আসন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০ আসন, খেলাফত মজলিস ১০ আসন, এলডিপি ৭ আসন, এবি পার্টি ৩ আসন, নেজামে ইসলাম পার্টি ২ আসন এবং বিডিপি ২ আসনে লড়বে। এ ছাড়া সমঝোতার মধ্যে থাকলেও জাগপা এবং খেলাফত আন্দোলনের জন্য কোনো আসন রাখা হয়নি। বাকি ৪৭ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই সমঝোতায় না থাকলে এসব আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা অংশ নিতে পারেন। এ ছাড়া জাগপা এবং খেলাফত আন্দোলনও দুই থেকে তিনটি আসন পেতে পারে বলে জোট সূত্রে জানা গেছে।
সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে নানা দর্শনে বিশ্বাসী এতগুলো দল মিলে এর আগে কখনো এত বড় জোট গঠন করেনি। এটি সব মতকে ধারণ করেছে, যা জাতীয় ঐক্যের একটি মডেল এবং ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করবে। আমরা বলেছিলাম যে, ‘ওয়ান বক্স পলিসি’তে অগ্রসর হব। অর্থাৎ, এই জোটে অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর মধ্য থেকে প্রতিটি আসনে মাত্র একজন অভিন্ন প্রার্থী থাকবেন। সেই নীতি ধারণ করেই আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি।
বাকি ৪৭টি আসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাকি আসনগুলোর বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আরও যারা আছেন, আমরা আশা করি তারাও ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমাদের সঙ্গেই থাকবেন। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত বাকি আসনগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আপনাদের বিস্তারিত অবহিত করব।
এদিকে পৃথক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আজ বিকেলে পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ফজলুল করিম মারুফ। সংবাদ সম্মেলনে আসন সমঝোতার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর মগবাজার কার্যালয়ে ১০ দলের বৈঠকের পর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রাতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১ দলের সংবাদ সম্মেলনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হবে। কিন্তু রাত ৯টার পরে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলনের আমির চরমোনাই পীরের পক্ষে কেউ ছিলেন না।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তারা নিজেদের নিয়ে আরও বোঝাপড়া করছেন। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। পরে আমাদের জানাবেন। আশা করি, সামনের দিনে তারা আমাদের সঙ্গে আসবেন। জোট ভাঙবে না, জোট আছে। হয়তোবা কোনো একটি দল না থাকতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি জোট নয়, নির্বাচনী সমঝোতা। এখন বলছি নির্বাচনী ঐক্য।’
এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনের পরিবেশ নেই। সবার জন্য সমান সুযোগ নেই। এটা যদি সৃষ্টি করা না হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য নির্বাচন কমিশনাররা যেভাবে জেলে গেছেন, আপনাদেরকেও আগামী দিনে জেলে যেতে হবে।
তিনি বলেন, আপনারা এর আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসন দেখেছেন। এবার আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ—একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসন, সুশাসন এবং চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন ব্যবস্থা দেখার সুযোগ দিন। এখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে, যা অন্য কোথাও দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, এই রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হয়েছিল জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা, অভিপ্রায় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিতে দলগুলো অনেক আগেই একসঙ্গে পথচলা শুরু করে। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি বাস্তবায়নকে অভিন্ন লক্ষ্য ধরে ধাপে ধাপে আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক পথপরিক্রমার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১১টি দল এবার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
১১ দলীয় জোটের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব উল্লেখ করে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনী সমঝোতা বা ১১ দল ঐক্যবদ্ধভাবে সারা দেশে প্রার্থী দেবে। আমরা সবাই সবাইকে সহযোগিতা করব এবং আমাদের যে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ, সেটার বাস্তবায়ন ঘটবে। জনগণের পক্ষে এবং আজাদির পক্ষে এই নির্বাচনের ফল ঘরে তুলব—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মন্তব্য করুন