সানাউল হক সানী ও জাফর আহমেদ
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গরিবের আবাসনের নামে ধনীদের ফ্ল্যাট

রাজউকের গরিবের সাশ্রয়ী আবাসনের নামে বিলাসী প্রকল্প
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

রাজধানীর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন সংকট নিরসনের কথা বলে একের পর এক প্রকল্প হাতে নিচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। কাগজে-কলমে এসব প্রকল্পকে ‘সাশ্রয়ী আবাসন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গরিব ও মধ্যবিত্তদের স্বপ্ন দেখানো এসব আবাসন প্রকল্প যেন ক্রমেই রূপ নিচ্ছে বিলাসী ব্যয়ের প্রদর্শনীতে, যার সুবিধাভোগী হচ্ছে সমাজের বিত্তশালী ও ক্ষমতাবান শ্রেণি। উত্তরার ১৭ নম্বর সেক্টরে ৯৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে মাত্র ৫৯২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ তারই জলজ্যান্ত উদাহরণ। উৎসব ভাতা, সেমিনার, গাড়ি কেনা, পরামর্শ সেবা ও প্রচার ব্যয়ের নামে বিভিন্ন খাতে বাড়তি কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্প সত্যিই কাদের জন্য—সে প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ একদিকে যখন রাজধানীর নিম্ন আয়ের মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে ফিরছেন, তখন অন্যদিকে সরকারি জমিতে গড়ে তোলা কথিত এসব ‘সাশ্রয়ী’ ফ্ল্যাটের একেকটিরই গড় মূল্য দাঁড়াচ্ছে দেড় কোটি টাকার কাছাকাছি। যার নাগাল পাওয়া নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে শুধুই স্বপ্ন মাত্র।

সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজউক সর্বশেষ উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন নির্মাণ করে। ৩টি ব্লকে (এ, বি এবং সি) আবাসিক বহুতল ভবন নির্মাণের সংস্থান রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৮ নম্বর সেক্টরের ‘এ’ ব্লকে প্রতিটি ১৬ তলার ৭৯টি ভবনে মোট ৬৬৩৬টি ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন ‘বি ও সি’ ব্লকে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসিক ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। সমাপ্ত হওয়া প্রকল্প বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ১৬৫০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাটের প্রাথমিক মূল্য প্রতি বর্গফুট ৪,৮০০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার প্রতিটির মোট দাম প্রায় ৮০ লাখ টাকার কাছাকাছি। তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কথা বলে এসব ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হলেও রাজউক হেঁটেছে পুরোনো পথেই। নানা মত-পথের প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্যরাই বরাদ্দ পেয়েছেন এসব ফ্ল্যাট। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আবাসনের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা বলে প্রকল্প হাতে নিলেও শেষমেশ লাভবান হয়েছেন ধনাঢ্যরাই। তবে অনিয়মের এখানেই শেষ নয়, যেন চলছে মাছের তেলে মাছ ভাজা। বরাদ্দ পাওয়ার পর অনেকেই এসব ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিচ্ছেন চড়া দামে। বর্তমানে ১৬৫০ বর্গফুটের এসব রেডি ফ্ল্যাট একেকটি বিক্রি হচ্ছে ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকায়।

রাজউক প্রস্তাবিত এবারের কথিত ‘সাশ্রয়ী আবাসন’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে উত্তরা আবাসিক মডেল টাউন (৩য় পর্ব)-এর আওতায়। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পুরো এলাকা উত্তরা ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ নম্বর— এই চারটি সেক্টরে বিভক্ত। এর মধ্যে উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের ‘জে’ ব্লকে ৯৪০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় রাজউক। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে পাঁচ বছর, যার সম্পূর্ণ অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হবে।

এই প্রকল্পের আওতায় ছয়তলা বিশিষ্ট ছয়টি আবাসিক ভবনে মোট ৫৯২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৬০০ নেট বর্গফুটের ৩০৮টি এবং ৪০০ নেট বর্গফুটের ২৮৪টি ফ্ল্যাট থাকবে। পাশাপাশি একটি বেজমেন্টসহ ১২ তলার একটি বাণিজ্যিক ভবন এবং ছয়তলা মসজিদ ভবন নির্মাণের কথাও উল্লেখ রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি)। অবকাঠামোর অংশ হিসেবে অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও ফুটপাত, একটি পার্ক, তিনটি খেলার মাঠ, এসটিএস, পাম্প হাউস, সাবস্টেশন এবং দুটি নিরাপত্তা গেট নির্মাণ করা হবে।

ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণ করলে প্রকল্পের অস্বাভাবিক দিকগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু আবাসিক ভবন নির্মাণেই ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ভূমি উন্নয়ন, ল্যান্ডস্ক্যাপিং, আরবরিকালচার ও পার্ক নির্মাণে বরাদ্দ ১৬১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ২৫৬ কোটি টাকা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদিতে ৫৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং কেন্দ্রীয় এলপি গ্যাস সরবরাহ নেটওয়ার্কে ৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে সেমিনার ও সভা, উৎসব ভাতা, পরামর্শ সেবা, প্রচার ও বিজ্ঞাপন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং যানবাহন ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণসহ একাধিক খাতে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ।

সব মিলিয়ে সরকারি জমিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসন নির্মাণের নামে নেওয়া এই প্রকল্পে প্রতিটি ফ্ল্যাটের গড় ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। ফলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মো. গোলাম রাব্বী কালবেলাকে বলেন, ‘উত্তরায় নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। রাজউকের অধিগ্রহণ করা জমিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। নিম্নবিত্তদের জন্য এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।’

এই প্রকল্পের কিছু কিছু খাতে অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়নি, নিয়ম অনুযায়ীই ব্যয় ধরা হয়েছে।’

কালবেলা/এসওআর
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাটখিলে সাংবাদিককে হুমকি, থানায় লিখিত অভিযোগ ভুক্তভোগীর

২১ দিনে জাবির মেডিকেল সেন্টার থেকে উধাও সাড়ে ১৯ হাজার ওষুধ

প্রবাসী ছেলের জন্য ওষুধ পাঠিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না মায়ের

‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে নদীপাড়ে চলে আসেন, বাঁধ ভাঙছে’

প্রকল্পের অব্যয়িত প্রায় ৪২ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও

ভারতে পাচারের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তে ৬৫ কচ্ছপ জব্দ, সালদা নদীতে অবমুক্ত

মহাকবি কায়কোবাদ স্মরণে নবাবগঞ্জে ‘আজান’ কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা

সারাদেশে খাল খননের নামে বালু-মাটি লুটপাট করা হচ্ছে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

গোয়ালন্দে ওয়ে ব্রিজ স্কেলের গার্ডার ভেঙে বন্ধ ওজন কার্যক্রম, ভোগান্তিতে ট্রাকচালকরা

নড়াইল জেলা ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র আহ্বায়ক জাকারিয়া, সদস্যসচিব সাগর

১০

স্কুলে যাওয়ার পথে ১০ম শ্রেণির ছাত্রী অপহরণের অভিযোগ, থানায় মামলা

১১

নিখোঁজের চারদিন পর বন্ধ ঘর থেকে ববি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

১২

শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীকে মারধর, দুই ছাত্রদল নেতাকে বহিষ্কার

১৩

ডিমলায় বাড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার, উদ্বেগে অভিভাবক ও সচেতন মহল

১৪

বিকেলে বাবার দাফন, রাতে এটিএম বুথে ডিউটি, সকালে এইচএসসি পরীক্ষা

১৫

জুলাই শহীদদের স্মরণে ঢাবি কেন্দ্রীয় মসজিদে ছাত্রদলের দোয়া ও মিলাদ বুধবার

১৬

বিয়ে নিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি, জামায়াত এমপির গোমর ফাঁস করলেন কাজী  

১৭

থাইল্যান্ডে আন্তঃদেশীয় অপরাধ সম্মেলন শেষ, কর্মব্যস্ত সময় কাটালেন আইজিপি

১৮

রাজধানীতে বিএনপি কর্মীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা

১৯

আরএফএল কর্মীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার, সহকর্মী পলাতক

২০
X