

আফগানিস্তানে শ্রেণিভিত্তিক বিচারব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিল তালেবান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার স্বাক্ষরে জারি হওয়া নতুন ফৌজদারি কার্যবিধি আফগান সমাজকে সামাজিক শ্রেণিতে ভাগ করে অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের বিধান রেখেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই আইন কার্যত আইনের চোখে সমতার নীতিকে বাতিল করে বৈষম্যকে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দিয়েছে।
ভারতের এনডিটিভি জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তালেবান শাসনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য নথিভুক্ত করছে আফগান মানবাধিকার সংস্থা রাওয়াদারি। এই সংস্থা ১০টি অধ্যায়ের ১১৯টি ধারায় বিভক্ত এই আইনের কপি সংগ্রহ করেছে। গত ৪ জানুয়ারি জারি হওয়া এই দণ্ডবিধি ইতোমধ্যে দেশটির আদালতগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
আইনটির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো ধারা ৯, যেখানে আফগান সমাজকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে— ধর্মীয় আলেম বা মোল্লা, অভিজাত শ্রেণি (আশরাফ), মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। এই বিধান অনুযায়ী, একই অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত হবে অভিযুক্ত ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে।
আইনে বলা হয়েছে, কোনো ধর্মীয় আলেম অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে কেবল ‘উপদেশ’ দেওয়া হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি অভিজাত শ্রেণির হন, তবে তাকে আদালতে তলব করে উপদেশ দেওয়া হবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্ষেত্রে একই অপরাধের শাস্তি হবে কারাদণ্ড। আর নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র শ্রেণির মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক শাস্তি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই বিধান কার্যত ধর্মীয় নেতাদের প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তি দিচ্ছে এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর কঠোর ও সহিংস শাস্তি চাপিয়ে দিচ্ছে।
রাওয়াদারি এক বিবৃতিতে বলেছে, এটি কোনো বিচারব্যবস্থা নয়; এটি বিশেষ সুবিধাভোগীদের জন্য আইনে লেখা শ্রেণিবিন্যাস। আইনের চোখে সমতার নীতি ধ্বংস করে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
নতুন আইনে আরেকটি গুরুতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ‘স্বাধীন ব্যক্তি’ ও ‘দাস’ শব্দের ব্যবহার। একাধিক ধারায় আইনটি মুক্ত মানুষ ও দাসের মধ্যে পার্থক্য টেনেছে, এমনকি শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যতামূলক নীতিমালায় দাসপ্রথা সব পরিস্থিতিতেই নিষিদ্ধ। অথচ তালেবানের আইন দাসত্বকে একটি স্বাভাবিক আইনি শ্রেণি হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
নতুন কার্যবিধিতে ন্যায়বিচারের মৌলিক সুরক্ষাগুলোকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে আসামির আইনজীবী পাওয়ার অধিকার, নীরব থাকার অধিকার কিংবা ভুল শাস্তির জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনো স্বীকৃতি নেই।
অপরাধ প্রমাণে প্রধান ভিত্তি হিসেবে রাখা হয়েছে ‘স্বীকারোক্তি’ ও ‘সাক্ষ্য’। স্বাধীন তদন্তের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশ অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বা সর্বোচ্চ শাস্তির সীমাও নির্ধারণ করা হয়নি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, এ ধরনের ব্যবস্থায় নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়ে যাবে, বিশেষ করে যখন বিচারক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কোনো জবাবদিহি নেই।
আইনটি শারীরিক শাস্তির ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। বেত্রাঘাতের পাশাপাশি ‘নাচ’, কিংবা ‘দুর্নীতিপূর্ণ সমাবেশে উপস্থিত থাকা’র মতো অস্পষ্ট অপরাধ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে বিচারকদের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সাধারণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য মানুষকে আটক ও শাস্তি দেওয়ার।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
পর্যবেক্ষকদের মতে, শ্রেণিভিত্তিক বিচারব্যবস্থার এই আনুষ্ঠানিকীকরণ স্পষ্ট করে দিয়েছে— তালেবান শুধু কঠোর আইন চাপিয়ে দিচ্ছে না, বরং পুরো আইনব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করছে আনুগত্য, ধর্মীয় পরিচয় ও ক্ষমতার ভিত্তিতে।
রাওয়াদারি বলেছে, ধর্মীয় অভিজাতদের আইনের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে তালেবান ঘোষণা দিয়েছে— কিছু মানুষ অচ্ছুত, আর বাকিরা চিরতরে ব্যবহারের যোগ্য।
সংস্থাটি নতুন আইন বাস্তবায়ন অবিলম্বে স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছে এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সব কূটনৈতিক ও আইনি উপায় ব্যবহার করে এর প্রয়োগ ঠেকানোর অনুরোধ করেছে।
মন্তব্য করুন