জাকির হোসেন লিটন
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

গণভোটের প্রচার নিয়ে বিভ্রান্তি

জনমনে আস্থার সংকটের শঙ্কা
ছবি : কালবেলা
ছবি : কালবেলা

আসন্ন গণভোটকে কেন্দ্র করে সরকারের অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারমূলক ব্যানার-ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রচারে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই বিপরীতমুখী অবস্থানে ভোটের প্রচার, ভোটার ও প্রশাসনের ভেতরে তৈরি হয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, গণভোটের মতো বিষয়ে প্রচার চালানোর অধিকার সরকারের থাকলেও সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার এবং কর্মকর্তাদের ওপর বিধিনিষেধের এই ভারসাম্যহীনতা জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। এতে ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থেকে যায়।

এবারের গণভোটে চারটি প্রশ্নে ভোটগ্রহণ করা হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই এ ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা, আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে, সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে এবং জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে। এসব প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে একটি মাত্র প্রশ্নে অর্থাৎ এসব প্রস্তাবের পক্ষে থাকলে ‘হ্যাঁ’ এবং বিপেক্ষ থাকলে ‘না’ এভাবে ভোটগ্রহণ করা হবে।

নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করেছে। বর্তমানে প্রার্থীদের প্রচারে মুখর হয়ে উঠেছে সারা দেশ। জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোটের জন্য আলাদা ব্যালট পেপার তৈরি করে রেখেছে কমিশন।

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর সচিবালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরগুলোতে ভোটকেন্দ্রিক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটক বা সীমানা প্রাচীরে শোভা পাচ্ছে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বড় বড় ডিজিটাল ব্যানার ও সচেতনতামূলক ফেস্টুন। এসব ব্যানারে জুলাই সনদের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও কোথাও গণভোটের প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছে সরকার। আবার কোথাও ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে ভোটারদের কেন্দ্রে গিয়ে ‘হ্যাঁ’ চিহ্নে ভোট দেওয়ার আহবান জানানো হচ্ছে।

শুধু সরকারি দপ্তরগুলোই নয়, সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টারাও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দেশের বিভিন্ন এলাকা সফর করে ভোট চেয়েছেন। ১৮ জানুয়ারি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে বিভাগীয় কর্মকর্তা-প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আলী রীয়াজ এ কথা বলেন।

তবে ভোটের পক্ষে-বিপক্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচার নিয়ে সরকারের অবস্থানের কথা আলোচনায় এলে নড়েচড়ে বসে নির্বাচন কমিশন। গত ২৭ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নির্বাচনী কর্মকর্তারা গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। শুধু গণভোটে ভোট দেওয়ার কথা বলতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা সবাইকে গণভোটে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করছি। নির্বাচনী দায়িত্বে যারা থাকবেন, তারা আইনগতভাবে কোনো পক্ষে কাজ করবেন না। এটি রিটার্নিং কর্মকর্তা (জেলা প্রশাসক), সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং অন্যান্য যারা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন, তারা গণভোটের প্রচার করবেন; কিন্তু পক্ষে-বিপক্ষে যাবেন না।

এর এক দিন পর ২৯ জানুয়ারি আসন্ন গণভোটে সরকারি চাকরিজীবীরা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না মর্মে একটি নির্দেশনা জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, উপর্যুক্ত বিষয়ে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬-এর বিধানাবলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক জানানো যাচ্ছে যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন। তবে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বা ‘না’-এর পক্ষে ভোট প্রদানের জন্য জনগণকে কোনোভাবে আহ্বান জানাতে পারবেন না।

এতে আরও বলা হয়, এ ধরনের কার্যক্রম গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে, যা গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এ বিধান অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

পরে দাপ্তরিকভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন এই প্রচারে কোনোভাবেই অংশ না নেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মৌখিকভাবে এবং কিছু ক্ষেত্রে লিখিতভাবে কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে যাতে তারা গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো মন্তব্য বা কার্যক্রমে লিপ্ত না হন।

একদিকে দেশজুড়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনে টাঙানো এসব ব্যানারের খরচ কে বহন করছে, তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফলে গণভোটকে কেন্দ্র করে সরকারের প্রচার কৌশলে এক অদ্ভুত ও বৈপরীত্যময় চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে জনমনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে সরকারের কর্মকর্তাদের মধ্যেও। সরকারের এই দ্বিমুখী অবস্থানে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—প্রতিষ্ঠান যদি প্রচার চালায়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা কেন নীরব?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র সহকারী সচিব কালবেলাকে বলেন, ‘ভবনের বাইরে যখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিশাল ব্যানার ঝোলে, তখন সাধারণ মানুষ মনে করে আমরাও এর অংশ। অথচ আমাদের বলা হয়েছে নিরপেক্ষ থাকতে। এই দ্বিমুখী নীতির কারণে আমরা সাধারণ মানুষের কাছে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি, তেমনি দাপ্তরিক কাজেও অস্বস্তি বোধ করছি।’

ভোট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রতিষ্ঠানের গায়ে প্রচারের ছাপ থাকলে ভোটের দিন নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হবে। সেজন্য নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো পক্ষেই প্রচার সুযোগ রাখা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আব্দুল আলীম কালবেলাকে বলেন, এ সরকারের মূল এজেন্ডাই ছিল সংস্কার। সেজন্য সংস্কারের পক্ষে হওয়া গণভোটে সরকার এবং সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই ভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালানো অস্বাভাবিক নয়। কারণ, বাংলাদেশে এর আগে অনুষ্ঠিত হওয়া ৭৭ সালের গণভোটে জিয়াউর রহমান সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালায়। ’৮৫ সালে এরশাদ সরকার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালায় এবং বাক্সে তার ছবিও লাগিয়ে দেয়। আর ’৯১ সালে সব দলই সংসদীয় পদ্ধতি চালুর গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালায়। গণভোটের প্রচার তো সরকারই করবে। সেজন্য গণহারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচারে বিধি-নিষেধ আরোপ করা যুক্তিসংগত নয়। এতে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। শুধু ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর গণভোটের প্রচার থেকে বিরত রাখা উচিত ছিল।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আসছে শৈত্যপ্রবাহ, তাপমাত্রা নামতে পারে ৮ ডিগ্রিতে

সংকট ও সৃজনশীলতা : গাজার তরুণদের বেঁচে থাকার লড়াই

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন স্বতন্ত্র প্রার্থী

অনার্স ভর্তি আবেদনের সময় বাড়াল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

সেনাবাহিনীর অভিযানে দুই মাদক ব্যবসায়ী আটক

ভারত ম্যাচ বয়কটে কী শাস্তি পেতে পারে পাকিস্তান 

নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন আনছে ইতালি

ফেব্রুয়ারিতে এলপি গ্যাসের দাম বাড়বে না কমবে, জানা যাবে আজ

৫৪ বছর পর সংসদ নির্বাচনে ২ নারী প্রার্থী

ব্যাংক এশিয়ায় চাকরি, আবেদনে নেই বয়সসীমা

১০

আজ খুলনা-যশোরে যাচ্ছেন তারেক রহমান

১১

আগুনে পুড়ল বিদ্যালয়

১২

শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও অর্থ পরিশোধে নতুন নির্দেশনা

১৩

সুইজারল্যান্ডে বারে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বেড়ে ৪১

১৪

নির্বাচিত হলে ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে বিএনপি : আমীর খসরু

১৫

হরমুজ প্রণালিতে মহড়া নিয়ে নতুন তথ্য দিল ইরান

১৬

সকাল থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায় 

১৭

ঢাকার শীত নিয়ে আবহাওয়া অফিসের নতুন বার্তা

১৮

সীমান্তে বিজিবির ওপর হামলা

১৯

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন হলে যেসব নম্বরে অভিযোগ

২০
X